PTI-কে দেওয়া বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পূর্ণাঙ্গ সাক্ষাৎকার
প্রশ্ন ১: গত প্রায় দুই বছরে বাংলাদেশে বড় ধরনের রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটেছে। ঢাকা ছাড়ার পর দেশের রাজনীতিতে নানা মোড় এসেছে এবং আওয়ামী লীগ কঠোর বিধিনিষেধের মুখে পড়েছে। আপনি কি দেশে ফেরার পরিকল্পনা করছেন? আপনার প্রত্যাবর্তন দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে কতটা গুরুত্বপূর্ণ হবে?
শেখ হাসিনা: বাংলাদেশ এখন গভীর জাতীয় সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। গণতান্ত্রিক পরিসর সংকুচিত হয়েছে, বিচারব্যবস্থাকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সীমিত হয়েছে এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। উগ্রবাদী শক্তিগুলো আবারও নিজেদের অবস্থান শক্ত করার সুযোগ পেয়েছে। অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, কারখানা বন্ধ হচ্ছে, বেকারত্ব বাড়ছে, বিনিয়োগ কমেছে। দ্রব্যমূল্যের চাপে সাধারণ মানুষ বিপর্যস্ত। বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংকটও ফিরে এসেছে।
এটি এখন আর শুধু আওয়ামী লীগের সমস্যা নয়; এটি সমগ্র দেশের সংকট। দেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। দলটির নেতাদের অনেকে কারাগারে, আবার অনেকে আত্মগোপনে থাকতে বাধ্য হয়েছেন। লাখ লাখ সমর্থককে স্বাভাবিক রাজনৈতিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষকে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার বাইরে রেখে কোনোভাবেই স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়।
দেশের সর্বত্র মানুষ দুর্ভোগের শিকার হলেও আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের ওপর নজিরবিহীন রাজনৈতিক নিপীড়ন চালানো হয়েছে। হাজার হাজার মানুষ কারাবন্দি, অনেকে আত্মগোপনে। রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে বহু পরিবার হারিয়েছে তাদের বাড়িঘর, চাকরি, ব্যবসা ও জীবিকার অবলম্বন।
আমার দেশে ফেরা গণতন্ত্র, ভোটাধিকার ও আইনের শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠার সংগ্রামের অংশ। আমি বাংলাদেশের মানুষের পাশে দাঁড়াতে চাই, তাদের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে অংশ নিতে চাই এবং দেশে গণতন্ত্র, নিরাপত্তা ও উন্নয়নের ধারা ফিরিয়ে আনতে চাই।
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার জনগণের। অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের মাধ্যমে মানুষকে নিজেদের ভবিষ্যৎ বেছে নেওয়ার সুযোগ দিতে হবে। এ কারণেই আমার প্রত্যাবর্তন গুরুত্বপূর্ণ। এটি বাংলাদেশকে আবারও তার জনগণের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার পথে একটি পদক্ষেপ হবে।
প্রশ্ন ২: বাংলাদেশের একটি আদালত আপনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। দেশে ফিরে সম্ভাব্য প্রতিকূল পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়ার আশঙ্কা কি আপনাকে ভীত করে? বিদেশে চলে যাওয়া আওয়ামী লীগের নেতারাও কি আপনার সঙ্গে দেশে ফিরবেন?
শেখ হাসিনা: ঝুঁকিগুলো আমার কাছে স্পষ্ট। দেশে ফিরলে গ্রেপ্তার, কারাবাস, এমনকি জীবননাশের আশঙ্কাও থাকতে পারে। কিন্তু ভয় কখনো আমার দায়িত্ব ও কর্তব্য নির্ধারণ করতে পারে না।
এ ধরনের বিপদের মুখোমুখি আমি এই প্রথম হচ্ছি না। ১৯৭৫ সালে আমার বাবা, মা, ভাইসহ পরিবারের প্রায় সব সদস্যকে হত্যা করা হয়েছিল। ১৯৮১ সালে সামরিক শাসন ও নানা ভয়ভীতি উপেক্ষা করেই আমি দেশে ফিরেছিলাম। ২১ আগস্ট ২০০৪ সালের গ্রেনেড হামলাসহ একাধিকবার আমাকে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে। কারাবাস, ষড়যন্ত্র ও রাজনৈতিক নিপীড়নেরও শিকার হয়েছি।
আমার ব্যক্তিগত নিরাপত্তার চেয়েও বড় উদ্বেগ হলো বাংলাদেশে ন্যায়বিচারের কাঠামো ধ্বংস হয়ে যাওয়া। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রক্রিয়ায়, আত্মপক্ষ সমর্থনের যথাযথ সুযোগ না দিয়ে দেওয়া কোনো মৃত্যুদণ্ডকে প্রকৃত বিচার বলা যায় না।
আওয়ামী লীগের নেতাদের প্রসঙ্গে বলতে চাই, অনেকেই স্বেচ্ছায় দেশ ছাড়েননি। জীবন বাঁচানোর তাগিদে তারা দেশত্যাগে বাধ্য হয়েছেন। আবার অনেকে দেশে থেকেই প্রতিনিয়ত চাপ ও হয়রানির মুখে রয়েছেন। তবে আমাদের অবস্থান পরিষ্কার—আওয়ামী লীগ বাংলাদেশ, দেশের মানুষ কিংবা তার রাজনৈতিক আন্দোলনকে কখনো পরিত্যাগ করবে না। জনগণের সঙ্গে এবং জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্যই আমাদের সংগ্রাম।
প্রশ্ন ৩: আপনার দেশে ফেরা কি আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের নতুন করে উজ্জীবিত করবে? ভবিষ্যতে আপনাদের রাজনৈতিক কর্মপরিকল্পনা কী? আপনি কি আবারও রাষ্ট্রক্ষমতায় যেতে চান?
শেখ হাসিনা: আওয়ামী লীগ এখনো জীবন্ত এবং সক্রিয়। দলটি শুধু কোনো কার্যালয় কিংবা কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ নয়। বাংলাদেশের প্রতিটি বিভাগ, জেলা, অঞ্চল, গ্রাম ও জনপদে এর সাংগঠনিক শিকড় রয়েছে। নিষেধাজ্ঞা, মিথ্যা মামলা কিংবা রাজনৈতিক ভয়ভীতি দেখিয়ে মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দেওয়া এবং আধুনিক বাংলাদেশের নির্মাণে ভূমিকা রাখা একটি দলকে নিশ্চিহ্ন করা যায় না।
চরম প্রতিকূলতার মধ্যেও আমাদের নেতা-কর্মীরা মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রেখেছেন। হাজার হাজার নেতা-কর্মী কারাগারে, লাখ লাখ মানুষ আত্মগোপনে থাকতে বাধ্য হয়েছেন। অনেকে বাড়িঘর, চাকরি ও ব্যবসা হারিয়েছেন। কিন্তু তাদের মনোবল ভেঙে দেওয়া সম্ভব হয়নি। আমার প্রত্যাবর্তন তাদের উৎসাহিত করবে, তবে আওয়ামী লীগের প্রকৃত শক্তি তার ইতিহাস, সাংগঠনিক ভিত্তি, আত্মত্যাগ এবং জনগণের সঙ্গে গভীর সম্পর্কের মধ্যে নিহিত।
আমাদের ভবিষ্যৎ কর্মপথ সুস্পষ্ট। দেশে গণতন্ত্র ও আইনের শাসন ফিরিয়ে আনতে হবে। রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তি দিতে হবে, মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করতে হবে, সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে এবং উগ্রবাদ মোকাবিলা করতে হবে। একই সঙ্গে অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করে বাংলাদেশকে আবারও উন্নয়নের ধারায় ফিরিয়ে নিতে হবে।
গণতন্ত্রে রাষ্ট্রক্ষমতার উৎস কেবল জনগণের ভোট। অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনে জনগণ যদি আওয়ামী লীগকে বেছে নেয়, আমরা তাদের সেবা করব। অন্য কাউকে নির্বাচিত করলে জনগণের সেই রায়ও মেনে নিতে হবে। জোরজবরদস্তি কিংবা ভয় দেখিয়ে নয়, জনগণই ঠিক করবে বাংলাদেশ কে পরিচালনা করবে।
প্রশ্ন ৪: ঢাকা ছাড়ার পর বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের মধ্যে উল্লেখযোগ্য টানাপোড়েন দেখা দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বেইজিং সফর এবং নয়াদিল্লি সফর না করায় বাংলাদেশের চীনমুখী হওয়ার প্রবণতা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। বর্তমান বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক এবং তারেক রহমানের পররাষ্ট্রনীতির অগ্রাধিকারকে কীভাবে দেখছেন?
শেখ হাসিনা: বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি হতে হবে স্বাধীন, ভারসাম্যপূর্ণ এবং জাতীয় স্বার্থনির্ভর। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দেওয়া নীতি—‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়’—এখনো বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে কার্যকর পথনির্দেশনা।
ভারত বাংলাদেশের নিকটতম প্রতিবেশী এবং মহান মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক বন্ধু। চীনও বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন সহযোগী। পাশাপাশি জাপান, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, আসিয়ান এবং মুসলিম বিশ্বের দেশগুলোর সঙ্গেও বাংলাদেশের সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ। চীন বা অন্য কোনো দেশের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলাই সমস্যা নয়। সমস্যা তৈরি হয় যখন একটি দেশের সঙ্গে সম্পর্ককে অন্য দেশের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হয়, অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ভারতবিরোধী বক্তব্যকে উসকে দেওয়া হয় কিংবা স্বচ্ছতা ছাড়া গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
আমাদের সরকারের সময় বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থ অক্ষুণ্ন রেখে সব অংশীদারের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা হয়েছিল। ভারতের সঙ্গে নিরাপত্তা, যোগাযোগ, জ্বালানি, বাণিজ্য ও সীমান্তসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা গভীর হয়েছে। একই সময়ে চীন, জাপান, যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য দেশের সঙ্গেও সম্পর্ক সম্প্রসারিত হয়েছে।
দীর্ঘদিনের বেশ কিছু অমীমাংসিত সমস্যার সমাধান হয়েছে পারস্পরিক আলোচনা ও আস্থার ভিত্তিতে। গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তির ফলে ভারত থেকে প্রায় ৬৪ হাজার শরণার্থীর প্রত্যাবর্তনের পথ তৈরি হয়েছিল। স্থলসীমান্ত চুক্তি এবং ছিটমহল বিনিময়ের মাধ্যমে দুই প্রতিবেশী দেশ সংঘাত ছাড়াই জটিল সমস্যার সমাধানের একটি আন্তর্জাতিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
আঞ্চলিক যোগাযোগ ব্যবস্থাও সম্প্রসারিত হয়েছিল। কলকাতা, ঢাকা ও আগরতলার মধ্যে বাস চলাচল শুরু হয়। মৈত্রী এক্সপ্রেস রেল যোগাযোগকে আরও শক্তিশালী করে। চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর আঞ্চলিক ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। বাংলাদেশ এমন যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তোলে, যার সুফল ভারত, নেপাল ও ভুটানও পেতে পারে।
জ্বালানি সহযোগিতার ক্ষেত্রেও অগ্রগতি হয়েছিল। পাইপলাইনের মাধ্যমে ভারত থেকে ডিজেল আসা শুরু হয়। একই সঙ্গে ভারতীয় গ্রিড ব্যবহার করে নেপাল থেকে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ আমদানির ব্যবস্থাও গড়ে ওঠে, যেখানে ভারত প্রয়োজনীয় ট্রানজিট সুবিধা দেয়।
এসব উদ্যোগ বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ রক্ষার পাশাপাশি সমগ্র অঞ্চলের জন্য নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছিল। আমাদের ভারসাম্যপূর্ণ কূটনৈতিক অবস্থান বাংলাদেশের জন্য সুফল বয়ে এনেছিল। সেই অবস্থান থেকে সরে গেলে বাংলাদেশ ও পুরো অঞ্চলের জন্য অপ্রয়োজনীয় ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
প্রশ্ন ৫: বাংলাদেশ ও চীন তিস্তা নদী সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্প বাস্তবায়নে নতুন করে গতি এনেছে। এ নিয়ে ভারতের কিছু উদ্বেগ রয়েছে। আন্তঃসীমান্ত নদীর পানি বণ্টনে ঢাকা-নয়াদিল্লির দীর্ঘদিনের সহযোগিতার প্রেক্ষাপটে বিষয়টিকে কীভাবে দেখছেন?
শেখ হাসিনা: তিস্তা কেবল একটি অবকাঠামো প্রকল্পের বিষয় নয়। এর সঙ্গে পানি, কৃষি, পরিবেশ, মানুষের জীবিকা এবং বাংলাদেশ-ভারতের পারস্পরিক আস্থার প্রশ্ন জড়িত।
বাংলাদেশের উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণের অধিকার রয়েছে। তবে আন্তঃসীমান্ত নদী নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা থাকতে হবে। প্রকল্পগুলো হতে হবে কারিগরিভাবে যথাযথ, পরিবেশের জন্য দায়িত্বশীল এবং বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
নদী মানুষের জীবন, কৃষক, পরিবেশব্যবস্থা এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর সম্পর্ককে প্রভাবিত করে। তাই আঞ্চলিক সংবেদনশীলতাকে গুরুত্ব দিতে হবে। একটি নদীকে শুধু প্রকৌশলগত প্রকল্প হিসেবে বিবেচনা করা যায় না; এটি মানুষের জীবন এবং প্রতিবেশীদের মধ্যে আস্থার বিষয়ও।
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে পানিবণ্টনের প্রশ্নে সব সময় ধৈর্য, আলোচনা ও পারস্পরিক সম্মান প্রয়োজন হয়েছে। তিস্তার পানিতে বাংলাদেশের ন্যায্য হিস্যা আদায়ের দাবি সব সময়ই ছিল এবং এখনো রয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের ক্ষেত্রেও একইভাবে আলোচনা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার নীতি অনুসরণ করা উচিত।
প্রশ্ন ৬: বাংলাদেশে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য বন্ধুরাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর কাছ থেকে কী ধরনের সহযোগিতা প্রত্যাশা করেন?
শেখ হাসিনা: বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার একমাত্র এ দেশের জনগণের। গণতন্ত্র, মানবাধিকার, আইনের যথাযথ প্রয়োগ এবং রাজনৈতিক অংশগ্রহণ সর্বজনীন নীতি। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দায়িত্বশীল সদস্যদের এসব নীতির পক্ষে ধারাবাহিকভাবে অবস্থান নেওয়া উচিত।
দেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করে অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ গড়া সম্ভব নয়। রাজনৈতিক নেতাদের কারাবন্দি করে, গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধ করে এবং লাখ লাখ নাগরিককে রাজনীতির বাইরে রেখে প্রকৃত অন্তর্ভুক্তি প্রতিষ্ঠা করা যায় না। অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজের অর্থ হলো সবার রাজনৈতিক অধিকার নিশ্চিত করা, সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা দেওয়া, নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, স্বাধীন বিচারব্যবস্থা ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা বজায় রাখা এবং এমন একটি বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন আয়োজন করা, যেখানে সব রাজনৈতিক দল অংশ নিতে পারে।
বাংলাদেশের মানুষের দুর্ভোগের কথা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের শোনা উচিত। একই সঙ্গে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের ওপর যে কঠিন পরিস্থিতি নেমে এসেছে, সেটিও উপলব্ধি করা প্রয়োজন। বহু পরিবার স্বজন হারিয়েছে, কর্মীরা চাকরি হারিয়েছেন, সংখ্যালঘুরা নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছেন এবং সাংবাদিকেরা চাপের মুখে কাজ করছেন। আওয়ামী লীগের বহু নেতা-কর্মী কারাবন্দি, আত্মগোপনে কিংবা জীবিকা ও সম্পদ হারানোর পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছেন বলে আমরা অভিযোগ করছি।
আমরা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে গণতন্ত্র, আইনের শাসন, মানবাধিকার এবং অংশগ্রহণমূলক রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার পক্ষে সহযোগিতা চাই। বাংলাদেশের জনগণ যেন স্বাধীনভাবে নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে পারে, সেটিই আমাদের প্রত্যাশা।
প্রশ্ন ৭: আপনার প্রধানমন্ত্রীত্বের সময় বাংলাদেশের অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি দেখা গিয়েছিল। বর্তমান অর্থনৈতিক মন্দাকে কীভাবে মূল্যায়ন করছেন?
শেখ হাসিনা: বর্তমান অর্থনৈতিক অবস্থা অত্যন্ত বেদনাদায়ক। কারণ আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বাংলাদেশ উন্নয়নের একটি শক্তিশালী ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পথে এগিয়ে যাচ্ছিল। আমরা শুধু উন্নয়নের কথা বলিনি, বাস্তবেও তা অর্জন করেছি।
আমাদের সময় বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের স্বীকৃতি অর্জনের পথে এগিয়েছে। দেশের অর্থনীতির আকার প্রায় ৭০ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ৪৫০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছিল। মাথাপিছু আয় ৪৮২ ডলার থেকে বেড়ে ২ হাজার ৭৮৪ ডলারে উন্নীত হয়েছিল। দারিদ্র্যের হার ৪১ শতাংশ থেকে কমে ১৮ দশমিক ৬ শতাংশে নেমেছিল। চরম দারিদ্র্যের হার ২৫ দশমিক ১ শতাংশ থেকে কমে ৫ দশমিক ৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছিল। বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ৩ হাজার ৭৮২ মেগাওয়াট থেকে বেড়ে ২৮ হাজার মেগাওয়াটেরও বেশি হয়েছিল। দেশের সব অঞ্চলে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়া হয়েছিল।
নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণ করেছি। মেট্রোরেল, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, মাতারবাড়ী প্রকল্প, কর্ণফুলী টানেল, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট, সড়ক, সেতু, বন্দর, ডিজিটাল অবকাঠামো, অর্থনৈতিক অঞ্চল, কমিউনিটি ক্লিনিক এবং ভূমিহীন মানুষের জন্য ঘর নির্মাণ করেছি। শিক্ষা, নারীর ক্ষমতায়ন, সামাজিক নিরাপত্তা, কৃষি সহায়তা ও ডিজিটাল সেবার পরিসরও বিস্তৃত করেছি। বাংলাদেশ আত্মবিশ্বাসী একটি দেশে পরিণত হয়েছিল।
এখন দেশের পরিস্থিতির দিকে তাকান। আমাদের সময়ের অর্জিত অগ্রগতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং এর মূল্য দিতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল ৬ দশমিক ৮০ শতাংশ, যা বর্তমানে কমে ২ দশমিক ২২ শতাংশে নেমেছে বলে আমি উল্লেখ করছি। শিল্প উৎপাদনে বড় ধরনের পতন হয়েছে এবং দেশের ৫৪ বছরের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো শিল্প খাতে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা দিয়েছে। ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের হার ১৩ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪৭ শতাংশে পৌঁছেছে বলে জানানো হচ্ছে, যা বিশ্বের সর্বোচ্চ। দারিদ্র্যের হার ১৮ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪৬ দশমিক ৮ শতাংশ হয়েছে বলে আমার বক্তব্য।
বিনিয়োগ নেতিবাচক অবস্থায় চলে গেছে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি কার্যত ভেঙে পড়েছে। নতুন করে দুই কোটিরও বেশি মানুষ বেকারত্বের শিকার হয়েছেন এবং পাঁচ শতাধিক শিল্পকারখানা বন্ধ হয়েছে। শিল্পপতি ও ব্যবসায়ীদের অর্ধেকেরও বেশি কারাগারে অথবা আত্মগোপনে রয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। সরকার প্রতিদিন ব্যাংক থেকে ৭০০ থেকে ৯০০ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে পরিচালিত হচ্ছে, অন্যদিকে বিভিন্ন প্রকল্পের ব্যয় ৫০ থেকে ২৫০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।
এই অর্থনৈতিক পতন রাজনৈতিক সংকট থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই সহিংসতার ঘটনা তদন্তের জন্য একটি বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন গঠন করা হয়েছিল। ইউনূস ক্ষমতায় আসার পর সেই তদন্ত বন্ধ করে দেন। জুলাই আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীদের আইনি সুরক্ষা দেওয়া হয়, অন্যদিকে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে ব্যাপক মামলা করা হয়। দেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
সাধারণ মানুষের জন্য এর অর্থ হলো চাকরি হারানো, মূল্যস্ফীতির চাপ এবং অনিশ্চয়তা। আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের ক্ষেত্রে এসব দুর্ভোগের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কারাবাস, মামলা, হামলা, বাড়িঘর ও ব্যবসা হারানো এবং গ্রেপ্তারের আতঙ্ক। আইনের শাসন দুর্বল হলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা নষ্ট হয়, শিল্প খাত ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়ে। গণতন্ত্র, স্থিতিশীলতা ও আইনের সমান সুরক্ষা ছাড়া অর্থনীতির পুনরুদ্ধার সম্ভব নয়।
প্রশ্ন ৮: ২০১৬ সালের অক্টোবরে ভারতে অনুষ্ঠিত ব্রিকস সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আপনার অংশগ্রহণ দুই দেশের মধ্যে ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি করেছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক ব্রিকস সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আপনার অনলাইন সংবাদ ব্রিফিংয়ের কারণে ভারতে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে আলোচনা হচ্ছে। এ সিদ্ধান্ত দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক ও বাংলাদেশের ওপর কী প্রভাব ফেলতে পারে?
শেখ হাসিনা: বাংলাদেশের সম্মেলনে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্তটি অত্যন্ত দুঃখজনক। আমার বিবেচনায় এটি অপরিণত সিদ্ধান্ত এবং বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থের অনুকূলে যায়নি।
ব্রিকস কেবল একটি কূটনৈতিক সম্মেলন নয়। এখানে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ উদীয়মান অর্থনীতিগুলো একত্রিত হয় এবং বাণিজ্য, বিনিয়োগ, অবকাঠামো, প্রযুক্তি ও উন্নয়ন সহযোগিতার নতুন সুযোগ সৃষ্টি হয়। বাংলাদেশ অংশগ্রহণ করলে মূল্যবান অভিজ্ঞতা অর্জনের পাশাপাশি অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের জন্য নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারত। সেই সুযোগ হাতছাড়া হয়েছে।
ব্যক্তিগত প্রতিক্রিয়া কিংবা স্বল্পমেয়াদি রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ দিয়ে পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা করা যায় না। ভারত আমাদের নিকটতম প্রতিবেশী ও ঐতিহাসিক অংশীদার। একই সঙ্গে ব্রিকসে অংশগ্রহণের বিষয়টি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের নিজস্ব অবস্থান ও স্বার্থের সঙ্গেও জড়িত।
এখানে একটি ঐতিহাসিক বিষয় স্মরণ করিয়ে দিতে চাই। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং আমার পরিবারের সদস্যদের হত্যার পর ৩ নভেম্বর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে চার জাতীয় নেতাকে হত্যা করা হয়। এরপর জিয়াউর রহমান অসাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় ক্ষমতায় আসেন। কিন্তু তিনি যখন ১৯৭৯ সালে দিল্লি সফর করেন, তখন আমি দিল্লিতে বসবাস করছিলাম। ১৯৮০ সালে তিনি লন্ডন সফর করার সময়ও আমি লন্ডনে ছিলাম। আমার সেখানে উপস্থিতি তাঁর সফরে কোনো বাধা সৃষ্টি করেনি।
তাহলে আজ আমার দিল্লিতে অবস্থান তারেক রহমানের ভারতে যাওয়ার পথে বাধা হবে কেন? এ ধরনের সিদ্ধান্তের প্রকৃত কারণ কী? দুই দেশের সম্পর্ক কোনো ব্যক্তিকে ঘিরে ব্যক্তিগত বিবেচনা কিংবা রাজনৈতিক সংবেদনশীলতার ওপর নির্ভর করতে পারে না।
আমাদের সরকারের সময় ভারতসহ চীন, রাশিয়া, জাপান, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ এবং বিশ্বের অন্যান্য অংশীদারের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করা হয়েছিল। একটি দেশের সঙ্গে বন্ধুত্ব বজায় রাখতে অন্য দেশের সঙ্গে বৈরিতা তৈরির প্রয়োজন হয় না। বাংলাদেশের প্রয়োজন পরিণত, ভারসাম্যপূর্ণ ও আত্মবিশ্বাসী পররাষ্ট্রনীতি। দায়িত্বশীল সরকার দেশের জন্য নতুন দরজা খুলবে, বন্ধ করবে না।
প্রশ্ন ৯: প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আপনার শেষ কয়েক বছরে আপনি নানা সমালোচনার মুখোমুখি হয়েছিলেন। তবে আপনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও অর্জন করেছে। বর্তমানে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও বিভিন্ন সূচকের অবনতি এবং হামজনিত রোগে প্রায় এক হাজার শিশুর মৃত্যুর ঘটনাকে কীভাবে দেখছেন?
শেখ হাসিনা: আমার রাজনৈতিক জীবনের পুরো সময়জুড়েই সমালোচনার মুখোমুখি হয়েছি। বিশেষ করে যারা বাংলাদেশের অগ্রগতিতে বিশ্বাস করে না, তাদের কাছ থেকে। একই সঙ্গে ব্যক্তিগত জীবনে ট্র্যাজেডি, নিপীড়ন এবং জনগণের সেবা করার পথ বন্ধ করতে বারবার হত্যাচেষ্টার মুখোমুখি হয়েছি।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, আমার মা, তিন ভাই, দুই ভাবি এবং পরিবারের অন্য সদস্যদের নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। হত্যাকারীদের দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছিল এবং কূটনৈতিক পদে পুরস্কৃত করা হয়েছিল। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। আমাকে ছয় বছর নিজের দেশে ফিরতে দেওয়া হয়নি।
১৯৮১ সালের ১৭ মে দেশে ফেরার পরও প্রতিটি পর্যায়ে বাধার সম্মুখীন হয়েছি। কিন্তু সংগ্রাম থেমে থাকেনি। জনগণ আমাদের ভোট দিয়ে দায়িত্ব দিয়েছে এবং বাংলাদেশ সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে পরিবর্তিত হয়েছে। দারিদ্র্য কমেছে, বিদ্যুৎ সুবিধা বিস্তৃত হয়েছে, কৃষি শক্তিশালী হয়েছে, অবকাঠামো নির্মিত হয়েছে এবং শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার উন্নতি হয়েছে। নারীর ক্ষমতায়ন জাতীয় অগ্রাধিকারে পরিণত হয়েছিল। শিশু ও মাতৃমৃত্যুর হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হয়েছিল। মেয়েদের শিক্ষার সুযোগ বেড়েছে, কর্মক্ষেত্র ও জনজীবনে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি শক্তিশালী হয়েছে।
কমিউনিটি ক্লিনিক কর্মসূচির মাধ্যমে গ্রামীণ মানুষের দোরগোড়ায় প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া হয়েছিল। হাজার হাজার কমিউনিটি ক্লিনিকে মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্যসেবা, টিকাদান, পরিবার পরিকল্পনা এবং প্রাথমিক ওষুধ সরবরাহের ব্যবস্থা ছিল। বাংলাদেশ আত্মবিশ্বাসী অর্থনীতি ও সমাজ হিসেবে গড়ে উঠেছিল। সে কারণেই বর্তমান অবনতি আরও বেশি বেদনাদায়ক। এই পরিস্থিতি অনিবার্য ছিল না; এটি দুর্বল শাসনব্যবস্থা, অস্থিতিশীলতা ও অবহেলার ফল।
হামজনিত শিশু মৃত্যুর ঘটনা সবচেয়ে হৃদয়বিদারক উদাহরণগুলোর একটি। আওয়ামী লীগ সরকার একটি প্রতিষ্ঠিত টিকাদানব্যবস্থা গড়ে তুলেছিল। ইউনিসেফের সঙ্গে আমাদের ব্যবস্থা ছিল এবং বাজেটে প্রয়োজনীয় অর্থও বরাদ্দ রাখা হয়েছিল। টিকার সংকটের বিষয়ে মুহাম্মদ ইউনূসকে বারবার সতর্ক করা হয়েছিল, কিন্তু সময়মতো টিকা সংগ্রহ করা হয়নি। তারেক রহমান ক্ষমতায় আসার পরও বিষয়টিকে প্রয়োজনীয় গুরুত্ব দিয়ে মোকাবিলা করা হয়নি। এর ফলে এক হাজারেরও বেশি শিশুর মৃত্যু হয়েছে বলে আমি উল্লেখ করছি।
এসব মৃত্যু প্রতিরোধ করা সম্ভব ছিল। কোনো সরকার যদি শিশুদের সুরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা, অর্থায়ন ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো পেয়েও যথাসময়ে পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়, তাহলে সেটিকে কেবল প্রশাসনিক ভুল বলে এড়িয়ে যাওয়া যায় না। এটি দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা। এ জন্য মুহাম্মদ ইউনূস ও তারেক রহমানকে জবাবদিহি করতে হবে। শেষ পর্যন্ত একটি সরকারকে বিচার করা হয়—সে তার জনগণের জীবন ও জীবিকা কতটা সুরক্ষিত রাখতে পেরেছে, তার ভিত্তিতে।
প্রশ্ন ১০: শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের কারণে আপনাকে দেশ ছাড়তে হয়েছিল। এখন পেছনে ফিরে তাকালে আন্দোলন মোকাবিলার ক্ষেত্রে এমন কিছু কি মনে হয়, যা ভিন্নভাবে করা যেত?
শেখ হাসিনা: সরকার শুরু থেকেই কোটা সমস্যা শান্তিপূর্ণভাবে সমাধানের চেষ্টা করেছিল। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনা করা হয়েছিল এবং তাদের দাবির বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। প্রকৃতপক্ষে, ২০১৮ সালের আগের ছাত্র আন্দোলনের পরই কোটা ব্যবস্থা বাতিল করা হয়েছিল।
কিন্তু ২০২৪ সালে পরিস্থিতি ভিন্ন রূপ নেয়। মূল দাবিগুলোর সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হলেও নতুন নতুন দাবি সামনে আসতে থাকে। আন্দোলন থামেনি; বরং তা সংঘাত, সহিংসতা এবং শেষ পর্যন্ত সরকার পতনের দাবিতে রূপ নেয়। এখানেই মূল প্রশ্নটি রয়েছে।
মুহাম্মদ ইউনূস পরবর্তী সময়ে নিজেই এ বিষয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। ক্লিনটন ফাউন্ডেশনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি অনুষ্ঠানে তিনি বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া ঘটনাকে ‘সুনিপুণভাবে পরিকল্পিত’ বলে উল্লেখ করেন এবং এর পেছনে একজন নেপথ্য পরিকল্পনাকারীর কথা বলেন। তাঁর নিজের বক্তব্যগুলো গুরুত্বের সঙ্গে পরীক্ষা করা দরকার।
আন্দোলনটি যদি কেবল কোটা সংস্কারের দাবিতে হয়ে থাকে, তাহলে সেই দাবি সমাধানের উদ্যোগ নেওয়ার পরও আন্দোলন চলতে থাকল কেন? শিক্ষার্থীদের একটি দাবি কীভাবে নির্বাচিত সরকারকে উৎখাতের আন্দোলনে পরিণত হলো? এই রূপান্তরের পরিকল্পনা কারা করেছিল? সহিংসতা কারা শুরু করেছিল? কারা অর্থায়ন ও সংগঠনের দায়িত্বে ছিল? এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো পাওয়া যায়নি।
এ কারণেই ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই একটি বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন গঠন করা হয়েছিল। প্রতিটি মৃত্যু, অগ্নিসংযোগ, হামলা ও সহিংসতার ঘটনা তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন ছিল। কিন্তু ইউনূস ক্ষমতা গ্রহণের পর সেই কমিশন বাতিল করা হয়। সত্য উদ্ঘাটনের উদ্দেশ্য থাকলে একটি স্বাধীন বিচার বিভাগীয় তদন্ত বন্ধ করা হলো কেন?
এরপর আরও গুরুতর প্রশ্ন সামনে আসে। ইউনূস প্রশাসন জুলাই আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীদের রাজনৈতিক প্রতিরোধের নামে সংঘটিত কর্মকাণ্ডের জন্য ফৌজদারি দায় থেকে সুরক্ষা দেওয়ার আইনি কাঠামো তৈরি করে। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের বিরুদ্ধে ব্যাপক মামলা, গ্রেপ্তার ও কারাবাসের ঘটনা ঘটে।
এক পক্ষের জন্য এক ধরনের বিচার এবং আওয়ামী লীগের জন্য আরেক ধরনের বিচার—এটি কীভাবে ন্যায়সংগত হতে পারে? যারা সহিংসতা, অগ্নিসংযোগ কিংবা হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে অভিযুক্ত, তাদের আইনি সুরক্ষা দেওয়া হলে এবং অন্যদিকে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে গণহারে মামলা করা হলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে—কর্তৃপক্ষ কাদের রক্ষা করছে এবং কেন?
ইউনূস সরকারের সময় যা ঘটেছে, তা পরবর্তী রাজনৈতিক ব্যবস্থার সঙ্গে বিচ্ছিন্নভাবে দেখা যায় না। তারেক রহমানের সরকারও আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিকভাবে বাইরে রাখা এবং দলটির নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা ও বিচারিক প্রক্রিয়া চালিয়ে যাওয়ার পথ অব্যাহত রেখেছে। অন্যদিকে শফিকুর রহমানের নেতৃত্বাধীন জামায়াত পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিবেশের অন্যতম সুবিধাভোগী শক্তি হিসেবে উঠে এসেছে। আমার দৃষ্টিতে, ইউনূস, তারেক রহমান এবং শফিকুর রহমানের নেতৃত্বাধীন জামায়াত—তিন পক্ষই ভিন্ন ভিন্নভাবে দায়মুক্তি, রাজনৈতিক বর্জন ও নিপীড়নের পরিবেশ টিকিয়ে রাখতে ভূমিকা রেখেছে।
এগুলো অত্যন্ত গুরুতর বিষয়। পাল্টাপাল্টি অভিযোগের মাধ্যমে এসবের নিষ্পত্তি হওয়া উচিত নয়। প্রকৃত স্বাধীন তদন্তের মাধ্যমে প্রমাণ সামনে আনতে হবে। কার নির্দেশে হত্যাকাণ্ড ঘটেছে, কারা অগ্নিসংযোগ করেছে, কারা সহিংসতা সংগঠিত করেছে, কারা অর্থায়ন করেছে, কারা এর সুবিধা পেয়েছে এবং পরবর্তী সময়ে দায়ীদের সুরক্ষা দেওয়া হলো কেন—সবকিছু তদন্তের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। সত্য উদ্ঘাটনের পথ এটাই।
প্রশ্ন ১১: ২০২৪ সালের সংসদ নির্বাচনে বিএনপিকে অংশগ্রহণে উৎসাহিত করার জন্য আপনার সরকার কি আরও কিছু করতে পারত? বিএনপি ও অন্য দলগুলোর বর্জনের কারণে নির্বাচন গ্রহণযোগ্যতা হারিয়েছিল এবং অনেক রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকের মতে, সেটিই আপনার সরকারের বিরুদ্ধে জনঅসন্তোষের সূচনা করেছিল।
শেখ হাসিনা: বিএনপিকে নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় আনার জন্য বারবার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। খালেদা জিয়াকে ব্যক্তিগতভাবে চায়ের টেবিলে বসে নির্বাচন নিয়ে আলোচনা করার আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। নির্বাচনের সময় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিদের সরকারে অন্তর্ভুক্ত করে নির্বাচন পরিচালনার প্রক্রিয়ায় যৌথ দায়িত্ব দেওয়ার প্রস্তাবও করা হয়েছিল। তারা এসব সুযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। তাই নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি—এমন দাবি সঠিক নয়। বরং প্রশ্ন হলো, বিএনপি কেন বারবার নির্বাচনে অংশ নেওয়ার পরিবর্তে বর্জন ও সংঘাতের পথ বেছে নিয়েছে?
এই প্রবণতা ২০২৪ সালে শুরু হয়নি। ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে আমরা সরকার গঠনের পর থেকেই প্রশাসনকে অস্থিতিশীল করার নানা চেষ্টা হয়েছে। কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই ২৫ ফেব্রুয়ারি বিডিআর বিদ্রোহের ঘটনা ঘটে। পরবর্তী বছরগুলোতেও সরকার পতনের নামে বিভিন্ন সময় সহিংস আন্দোলন হয়েছে।
২০১২ সালের অগ্নিসংযোগের ঘটনায় হাজার হাজার যানবাহনে হামলা ও অগ্নিসংযোগ করা হয়েছিল। আমাদের নথি অনুযায়ী, ৩ হাজার ৪৮২টি গাড়ি, বাস ও ট্রাক, ১২টি ট্রেন এবং ৯টি লঞ্চসহ অন্যান্য যানবাহনে হামলার ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনায় ৫৪৩ জন নিহত হন বলে আমাদের হিসাব। ওই সময় প্রায় ২৫ হাজার গাছও কেটে ফেলা হয়েছিল। ২০১৩ সালে শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশের সময় ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। খালেদা জিয়াও প্রকাশ্যে ওই আন্দোলনের সমর্থন জানিয়ে সরকারকে ক্ষমতা থেকে সরানোর আহ্বান জানিয়েছিলেন।
এরপর ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে বিএনপি-জামায়াত জোট নির্বাচন প্রতিহত করার ঘোষণা দেয়। প্রায় ৫০০টি স্কুলে আগুন দেওয়া হয়, ভোটকেন্দ্রে হামলা চালানো হয় এবং নির্বাচন কর্মকর্তা ও সাধারণ নাগরিকদের হত্যা করা হয়। অন্য নাগরিকদের ভোট দেওয়ার সুযোগ বন্ধ করতে সহিংসতার আশ্রয় নেওয়া হয়েছিল।
এই সময় বাংলাদেশকে উগ্রবাদী হুমকিরও মোকাবিলা করতে হয়েছে। ২০১৬ সালে হলি আর্টিজানে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলা সেই পরিস্থিতির একটি মর্মান্তিক পরিণতি ছিল। রাজনৈতিক সহিংসতা ও সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলার পাশাপাশি গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো সুরক্ষিত রাখাও তখন সরকারের জন্য বড় দায়িত্ব ছিল।
বিএনপি যখনই নির্বাচনে অংশ নিতে চেয়েছে, তখনই সেই সুযোগ ছিল। ২০১৮ সালে বিএনপিসহ সব বড় রাজনৈতিক দল নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল। শুরু থেকে নির্বাচন বর্জন না করে তারা ভোটের দিন বর্জনের ঘোষণা দেয়। দলটির ভেতরেও তখন নানা সমস্যা ছিল। একাধিক আসনে একাধিক প্রার্থী মনোনয়ন দেওয়ার কারণে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছিল, যা তাদের নিজস্ব নির্বাচনী প্রচারকে দুর্বল করে দেয়।
আরেকটি ঐতিহাসিক তথ্যও ভুলে যাওয়া উচিত নয়। ২০০৮ সালের বহুল আলোচিত নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ২৫৯টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ২২৯টিতে জয়লাভ করেছিল। বিএনপি-জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট পেয়েছিল মাত্র ২৯টি আসন। এটি বিএনপির জন্য বড় রাজনৈতিক পরাজয় ছিল। আমার মতে, এই ফলাফল পরবর্তী নির্বাচনে জনগণের মুখোমুখি হওয়ার ক্ষেত্রে তাদের দ্বিধা বাড়িয়ে দিয়েছিল।
সুতরাং ২০২৪ সালের নির্বাচন নিয়ে গ্রহণযোগ্যতার সংকটের জন্য আওয়ামী লীগ বিএনপিকে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ দেয়নি—এমন বক্তব্য সঠিক নয়। তাদের বারবার আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল, কিন্তু তারা অংশগ্রহণ না করে নির্বাচন বর্জনের পথ বেছে নিয়েছে। প্রশ্ন হলো, তারা কেন এমন পথ বেছে নিয়েছিল এবং কার পরামর্শ বা রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশে সেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল?
গণতন্ত্রের জন্য রাজনৈতিক সাহস ও দায়িত্বশীলতা প্রয়োজন। রাজনৈতিক দলগুলোকে নির্বাচনে অংশ নিতে হবে, জনগণের সামনে নিজেদের কর্মসূচি তুলে ধরতে হবে এবং ভোটারদের রায় মেনে নিতে হবে। নির্বাচন বর্জন, সহিংসতার আশ্রয় নেওয়া এবং পরে বাইরে থেকে নির্বাচনের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা কখনোই গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণের বিকল্প হতে পারে না।