ক্রসফায়ারের হুমকি, চাঁদাবাজি ও হেফাজতে মৃত্যু: বিএনপি সরকারের আমলে পুলিশের জবাবদিহি কোথায়?
চাঁদাবাজির অভিযোগ, মাদক আত্মসাতের ঘটনা, পুলিশ হেফাজতে এক তরুণের মৃত্যু এবং ‘ক্রসফায়ার’ নিয়ে পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তার বক্তব্য—একটির পর একটি ঘটনা বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিরপেক্ষতা, সততা ও জবাবদিহি নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করছে। তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের কাছে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—পুলিশকে আইনের রক্ষক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা, নাকি বাহিনীর ভেতরে ক্ষমতার অপব্যবহার ও দায়মুক্তির সংস্কৃতি চলতে দেওয়া।
বাংলাদেশের পুলিশ বাহিনী বর্তমানে আস্থার সংকটের মুখোমুখি। পুলিশের বিরুদ্ধে হেফাজতে নির্যাতন, চাঁদাবাজি, মাদক সংশ্লিষ্ট অনিয়ম, বেছে বেছে গ্রেপ্তার এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের পক্ষে ব্যবহৃত ভাষা ফিরে আসার মতো একাধিক অভিযোগ সামনে এসেছে। এসব ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন কিছু অনিয়ম হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং প্রতিটি ঘটনা একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে নিয়ে আসে—যাদের হাতে আইন প্রয়োগের দায়িত্ব, তারাই যখন আইন ভঙ্গের অভিযোগে অভিযুক্ত হন, তখন সাধারণ মানুষ নিরাপত্তা পাবে কার কাছে?
এ কথা সত্য যে পুলিশের সব সদস্য দুর্নীতিগ্রস্ত নন। অনেক কর্মকর্তা ও সদস্য নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু বাহিনীর কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ উঠলে তার নিরপেক্ষ তদন্ত, দৃশ্যমান জবাবদিহি এবং প্রমাণের ভিত্তিতে বিচার নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব। রাজনৈতিক ক্ষমতা কিংবা প্রশাসনিক প্রভাব যেন কোনো কর্মকর্তার জন্য আইনের ঊর্ধ্বে থাকার সুযোগ তৈরি না করে।
বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার আট মাসের মাথায় পুলিশের বিরুদ্ধে একের পর এক অভিযোগ সামনে আসায় প্রশ্ন উঠছে—আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংস্কার ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি বাস্তবে কতটা কার্যকর হচ্ছে?
ক্রসফায়ারের ভাষা কি আবার ফিরছে?
২০২৬ সালের অক্টোবরের শেষ দিকে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির এক অনুষ্ঠানে বলেন, সরকার অনুমতি দিলে পুলিশ ‘ক্রসফায়ার’ করবে। দেশের পুলিশ বাহিনীর সর্বোচ্চ কর্মকর্তার মুখে এমন বক্তব্য নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
সংবাদমাধ্যম দ্য ডেইলি স্টার-এর প্রতিবেদনে বক্তব্যটি প্রকাশিত হওয়ার পর মানবাধিকারকর্মী ও অধিকার সংগঠনগুলো এর সমালোচনা করে। তাঁদের আশঙ্কা, এ ধরনের বক্তব্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভেতরে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডকে গ্রহণযোগ্য বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করার প্রবণতাকে উৎসাহিত করতে পারে।
এখানে প্রশ্নটি অত্যন্ত স্পষ্ট: কোনো অপরাধের অভিযোগ থাকলেই কি কাউকে বিচার ছাড়াই হত্যা করা যায়? রাষ্ট্রের কাজ অপরাধীকে আইনের আওতায় আনা, আদালতের বাইরে শাস্তি কার্যকর করা নয়। পুলিশের মতো একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তার বক্তব্যে এই নীতির প্রতিফলন থাকা জরুরি।
মানবাধিকার সংগঠন অধিকারের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে পাঁচটি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ নথিভুক্ত হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে, আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) দীর্ঘমেয়াদি পরিসংখ্যান উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, ২০০৪ সাল থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কথিত ‘ক্রসফায়ার’ বা বন্দুকযুদ্ধের ঘটনায় মোট ২ হাজার ৯৫৭ জন নিহত হয়েছেন। এসব মৃত্যুর প্রায় ৪৬ শতাংশের জন্য পুলিশকে দায়ী করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
অতীতের তুলনায় বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা কমে থাকলেও এ ধরনের বক্তব্যের গুরুত্ব কমে যায় না। কারণ রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তার বক্তব্য বাহিনীর সদস্যদের কাছে একটি বার্তা পৌঁছে দেয়। সেই বার্তা যদি বিচারবহির্ভূত শক্তি প্রয়োগের সম্ভাবনাকে স্বাভাবিক করে তোলে, তাহলে আইনের শাসন আরও দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
সরকারের পক্ষ থেকে পরে বক্তব্যটিকে বিব্রতকর এবং সরকারি নীতির সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলে বর্ণনা করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু শুধু বক্তব্য থেকে দূরত্ব তৈরি করলেই দায় শেষ হয় না। সরকারকে স্পষ্টভাবে জানাতে হবে—বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের কোনো অনুমোদন নেই এবং প্রতিটি মৃত্যুর ঘটনা স্বাধীন তদন্তের আওতায় আসবে।
উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার বাসায় মাদকবিরোধী অভিযান: বাহিনীর ভেতরে অপরাধী নেটওয়ার্কের অভিযোগ
পুলিশের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ শুধু মাঠপর্যায়ের সদস্যদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে।
ঢাকার পূর্বাচলে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) একটি অভিযানে পুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজি আবদুল্লাহ আল জাহিরের মালিকানাধীন একটি বিলাসবহুল ট্রিপ্লেক্সে মাদকবিরোধী অভিযান চালানোর ঘটনা সামনে আসে। নিউ এজ-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই অভিযান থেকে ৮৫ জনকে আটক করা হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, বাড়িটিতে উচ্চপর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তার আশ্রয়-প্রশ্রয়ে মাদকসংশ্লিষ্ট কার্যক্রম চলছিল।
ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর জনমনে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয় এবং সংশ্লিষ্ট অতিরিক্ত ডিআইজিকে পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
একজন উচ্চপদস্থ পুলিশ কর্মকর্তার সম্পত্তিতে যদি মাদকসংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়ে থাকে, তাহলে তা অত্যন্ত গুরুতর বিষয়। কারণ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাজ মাদক ব্যবসা প্রতিরোধ করা। সেই বাহিনীর কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মাদক কারবারে আশ্রয় বা সহযোগিতার অভিযোগ উঠলে পুরো ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে পড়ে।
এ ঘটনায় অভিযানের আগে সিসিটিভি ক্যামেরা সরিয়ে ফেলার অভিযোগও সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। ফলে অভিযান পরিচালনার প্রক্রিয়া, আলামত সংরক্ষণ এবং তদন্তের স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
৩০ হাজার ইয়াবা আটকের পর আত্মসাতের অভিযোগ
চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায় পুলিশের তিন সদস্য—একজন উপপরিদর্শক (এসআই) ও দুই কনস্টেবলের বিরুদ্ধে ৩০ হাজার ইয়াবা বড়ির একটি চালান আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে।
প্রথম আলো-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একটি ট্রাক থামিয়ে চালককে হাতকড়া পরানোর পর পুলিশ সদস্যরা মাদক সরিয়ে ফেলেন এবং সিসিটিভির মেমোরি কার্ড মুছে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনার পর সংশ্লিষ্ট তিন পুলিশ সদস্যকে দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার করা হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
অভিযোগটি সত্য প্রমাণিত হলে তা শুধু দুর্নীতি নয়, সরাসরি আইন প্রয়োগের ক্ষমতার অপব্যবহার। মাদকবিরোধী অভিযানের নামে উদ্ধার করা মাদক যদি কোনো পুলিশ সদস্যের হাতেই আত্মসাৎ হয়, তাহলে মাদকবিরোধী কার্যক্রমের বিশ্বাসযোগ্যতা কোথায় থাকে?
এ ধরনের অভিযোগের তদন্তে শুধু সংশ্লিষ্ট সদস্যদের প্রত্যাহার করাই যথেষ্ট নয়। মাদক চালানের উৎস, উদ্ধার ও জব্দের নথি, সিসিটিভি ফুটেজ, জব্দতালিকা এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভূমিকা স্বাধীনভাবে যাচাই করতে হবে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে দৃষ্টান্তমূলক আইনগত ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
সমালোচনার ক্ষেত্রে তৎপরতা, সাধারণ মানুষের অভিযোগে উদাসীনতা?
পুলিশের বিরুদ্ধে আরেকটি গুরুতর অভিযোগ হলো—সরকার ও ক্ষমতাসীনদের সমালোচনাকারীদের গ্রেপ্তারে যে তৎপরতা দেখা যাচ্ছে, সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা ও অপরাধের অভিযোগ তদন্তে সেই তৎপরতা সব সময় দেখা যাচ্ছে না।
প্রদত্ত প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে প্রধানমন্ত্রী, তাঁর পরিবার কিংবা মন্ত্রীদের সমালোচনা বা ব্যঙ্গ করার অভিযোগে প্রায় ৩০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা এবং রিমান্ডের মতো পদক্ষেপ নেওয়ার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
যদি কেবল সমালোচনা বা ব্যঙ্গের কারণে কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়ে থাকে, তাহলে তা মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও আইন প্রয়োগের নিরপেক্ষতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করে। কোনো বক্তব্যে অপরাধের উপাদান রয়েছে কি না, তা আইনি প্রক্রিয়ায় নির্ধারিত হওয়া উচিত; রাজনৈতিক অসন্তোষ বা ব্যক্তিগত অপছন্দের ভিত্তিতে গ্রেপ্তার গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
অন্যদিকে, সাধারণ মানুষ যখন চুরি, ডাকাতি, হামলা, ছিনতাই কিংবা চাঁদাবাজির শিকার হয়ে পুলিশের কাছে যান, তখন তাঁদের অভিযোগ যথাযথভাবে গ্রহণ ও তদন্ত করা পুলিশের মৌলিক দায়িত্ব।
ফরিদপুরে পুলিশ হেফাজতে আইন শিক্ষার্থীর মৃত্যু: গুরুতর অভিযোগ ও তদন্তের প্রশ্ন
২০২৬ সালের জুনে ফরিদপুরে গোয়েন্দা পুলিশের হেফাজতে আইন শিক্ষার্থী মির্জা ইশতিয়াক আহমেদ প্রান্তের মৃত্যুর ঘটনা গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করে।
পরিবারের অভিযোগ, তাঁকে নির্যাতন করা হয়েছিল এবং তাঁর কাছে অর্থ দাবি করা হয়েছিল। অন্যদিকে পুলিশের বক্তব্য ছিল, তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন।
পরবর্তী সময়ে একটি অভ্যন্তরীণ তদন্তে মাদকসংক্রান্ত অভিযোগকে চাঁদাবাজির উদ্দেশ্যে সাজানো বলে শনাক্ত করা হয়েছে এবং ১১ জন পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে বলে দ্য ডেইলি স্টার-এর প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
এই ঘটনা কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে। একজন আটক ব্যক্তির হেফাজতে থাকা অবস্থায় মৃত্যু হলে তার পূর্ণাঙ্গ ও স্বাধীন তদন্ত কীভাবে নিশ্চিত করা হবে? পরিবারের অভিযোগ কতটা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়েছে? মিথ্যা মাদক মামলার অভিযোগের পেছনে কারা জড়িত ছিল? তদন্তে যাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রমাণ পাওয়া গেছে, তাঁদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে?
হেফাজতে থাকা ব্যক্তির নিরাপত্তার দায়িত্ব সম্পূর্ণভাবে রাষ্ট্রের। কোনো ব্যক্তি অপরাধে অভিযুক্ত হলেও তাঁর জীবন, মর্যাদা ও আইনগত অধিকার অক্ষুণ্ণ রাখতে হবে। হেফাজতে মৃত্যু হলে শুধু অভ্যন্তরীণ তদন্তে সীমাবদ্ধ না থেকে প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে স্বাধীন তদন্ত এবং বিচারিক জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
চাঁদাবাজি ও ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায়ের অভিযোগ: নাগরিকের স্বাধীনতা কোথায়?
পুলিশের ক্ষমতার অপব্যবহার নিয়ে আরও কিছু ঘটনা সামনে এসেছে।
গাজীপুরে একটি দম্পতির অভিযোগ, একটি দল তাঁদের বাড়িতে ঢুকে হামলা ও লুটপাট চালায়। পরে ৯৯৯-এর মাধ্যমে খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গেলেও সিসিটিভি ফুটেজে কিছু দেখা যাচ্ছে না—এমন যুক্তিতে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গ্রহণ করেনি বলে তাঁরা দাবি করেন।
চট্টগ্রামে এক ব্যবসায়ীকে আটক করে জুয়ার মামলায় ফাঁসানোর হুমকি দিয়ে নগদ অর্থ ও ক্রিপ্টোকারেন্সি আদায়ের অভিযোগ ওঠে পুলিশের কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় দুই সহকারী উপপরিদর্শককে ক্লোজ এবং একজন সহকারী কমিশনারকে প্রত্যাহার করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
এসব অভিযোগ এখনো তদন্তাধীন। তাই তদন্ত শেষ হওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট কাউকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা উচিত নয়। তবে অভিযোগগুলোর ধরন অত্যন্ত উদ্বেগজনক। কারণ আইন প্রয়োগের ক্ষমতা যদি কাউকে ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায়ের কাজে ব্যবহৃত হয়, তাহলে সাধারণ নাগরিক ও ব্যবসায়ীরা এক ধরনের অনিরাপত্তার মধ্যে পড়েন।
আইন সবার জন্য সমান হওয়ার কথা। কিন্তু পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে সেই অভিযোগের তদন্ত যদি সংশ্লিষ্ট বাহিনীর প্রভাবমুক্ত না হয়, তাহলে ভুক্তভোগীরা ন্যায়বিচার পাওয়ার ব্যাপারে আস্থা হারাতে পারেন।
বিএনপি সরকারের সামনে পাঁচটি জরুরি প্রশ্ন
পুলিশের বিরুদ্ধে একের পর এক অভিযোগের প্রেক্ষাপটে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের কাছে কয়েকটি মৌলিক প্রশ্নের উত্তর প্রত্যাশিত।
১. হেফাজতে নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে কীভাবে?
পুলিশ হেফাজতে নির্যাতন, মিথ্যা মামলা ও মৃত্যুর অভিযোগ প্রতিরোধে কী স্বাধীন নজরদারি ব্যবস্থা নেওয়া হবে? আটক ব্যক্তির চিকিৎসা, পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ এবং আইনজীবীর সহায়তা নিশ্চিত করার ব্যবস্থা কতটা কার্যকর?
২. মাদকবিরোধী অভিযানে পুলিশের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের তদন্ত কীভাবে হবে?
পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে মাদক আত্মসাৎ বা মাদক ব্যবসায়ীদের আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ উঠলে তার তদন্ত কি বাহিনীর প্রভাবমুক্তভাবে পরিচালিত হবে? জব্দ করা মাদকের হিসাব ও আলামত সংরক্ষণে কী ধরনের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হবে?
৩. গ্রেপ্তারের ক্ষমতার অপব্যবহার বন্ধ হবে কীভাবে?
কোনো নাগরিককে রাজনৈতিক সমালোচনা, ব্যক্তিগত বিরোধ কিংবা অর্থ আদায়ের উদ্দেশ্যে গ্রেপ্তার করার অভিযোগ উঠলে তাঁর প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ কী হবে? গ্রেপ্তারের আইনি ভিত্তি ও প্রক্রিয়া যথাযথভাবে যাচাই করা হবে কি?
৪. বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে সরকারের অবস্থান কী?
সরকার কি স্পষ্টভাবে ঘোষণা করবে যে ‘ক্রসফায়ার’ বা অন্য কোনো নামে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড গ্রহণযোগ্য নয়? আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে মৃত্যুর প্রতিটি ঘটনার স্বাধীন তদন্ত নিশ্চিত করা হবে কি?
৫. শাস্তিমূলক সুপারিশ বাস্তবে কার্যকর হবে কি?
কোনো তদন্তে পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রমাণ পাওয়া গেলে ব্যবস্থা কি শুধু বদলি, প্রত্যাহার বা সাময়িক বরখাস্তের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি অপরাধের ধরন অনুযায়ী ফৌজদারি মামলা ও বিচার নিশ্চিত করা হবে?
পুলিশের সংস্কার নয়, জবাবদিহি ছাড়া আস্থা ফিরবে না
পুলিশ বাহিনীর প্রতি মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে শুধু বক্তব্য বা প্রশাসনিক রদবদল যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন কার্যকর সংস্কার, স্বচ্ছ তদন্ত এবং অপরাধ প্রমাণিত হলে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা।
প্রথমত, হেফাজতে মৃত্যু ও নির্যাতনের অভিযোগ তদন্তে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ ব্যবস্থা থাকতে হবে। দ্বিতীয়ত, পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, মাদক আত্মসাৎ কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগের তদন্তে প্রভাবমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, গ্রেপ্তার ও রিমান্ডের ক্ষমতার অপব্যবহার ঠেকাতে আইনি সুরক্ষা এবং কার্যকর নজরদারি বাড়াতে হবে। চতুর্থত, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে সরকারের অবস্থান হতে হবে দ্ব্যর্থহীন।
পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেই পুরো বাহিনীকে অপরাধী বলা যায় না। একইভাবে, বাহিনীর ভাবমূর্তি রক্ষার অজুহাতে কোনো সদস্যের অপরাধের অভিযোগ উপেক্ষা করারও সুযোগ নেই। বরং অপরাধে জড়িতদের জবাবদিহির আওতায় আনলেই সৎ ও নিষ্ঠাবান পুলিশ সদস্যদের মর্যাদা ও গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে।
তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। সরকার কি পুলিশের ক্ষমতাকে আইনের সীমার মধ্যে রাখবে, নাকি রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাবের আড়ালে অনিয়মের সুযোগ চলতে দেবে—তার উত্তর নির্ভর করবে বাস্তব পদক্ষেপের ওপর।
রাষ্ট্রের হাতে আইন প্রয়োগের ক্ষমতা আছে নাগরিককে সুরক্ষা দেওয়ার জন্য, ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায় বা বিচার ছাড়া প্রাণ কেড়ে নেওয়ার জন্য নয়। যে পুলিশ জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে, সেই পুলিশের বিরুদ্ধেই যদি মানুষ অভিযোগ জানাতে ভয় পায়, তাহলে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা অসম্ভব হয়ে পড়বে।
বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ এমন একটি পুলিশ বাহিনী চায়, যারা অপরাধীর বিরুদ্ধে কঠোর হবে, কিন্তু নিরপরাধ নাগরিকের অধিকার রক্ষা করবে; যারা ক্ষমতাবানের নির্দেশ নয়, আইন ও সংবিধান অনুসরণ করবে। আর সেই ব্যবস্থা নিশ্চিত করার চূড়ান্ত রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক দায়িত্ব সরকারেরই।
পুলিশের হাতে ক্ষমতা থাকতে পারে, কিন্তু সেই ক্ষমতার ঊর্ধ্বে কেউ নয়—না সাধারণ নাগরিক, না পুলিশ কর্মকর্তা, না সরকার।