বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের ভার্চুয়াল সভা অনুষ্ঠিত: দেশ রক্ষায় জনগণকে সঙ্গে নিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান শেখ হাসিনার
গতকাল শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের এক ভার্চুয়াল সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সভায় সভাপতিত্ব করেন দলের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম। প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা ও জননেত্রী শেখ হাসিনা।
সভায় দলীয় সাংগঠনিক পরিস্থিতি, দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অবস্থা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং জনগণের জীবনযাত্রার সংকট নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। প্রধান অতিথির বক্তব্যে শেখ হাসিনা দেশ ও জনগণের বর্তমান পরিস্থিতি তুলে ধরার পাশাপাশি দলীয় নেতাকর্মীদের সাংগঠনিকভাবে আরও ঐক্যবদ্ধ হওয়া এবং জনগণের পাশে থাকার নির্দেশনা দেন।
তৃণমূলের সঙ্গে ধারাবাহিক আলোচনায় উঠে এসেছে দেশের প্রকৃত চিত্র
শেখ হাসিনা জানান, দেশের প্রকৃত পরিস্থিতি, সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার অবস্থা এবং দলের সাংগঠনিক অবস্থান সম্পর্কে সরাসরি ধারণা পেতে তিনি পর্যায়ক্রমে আওয়ামী লীগের ৮৩টি জেলা শাখা ও ১৬০টি নির্বাচনী এলাকার নেতাকর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময় করেছেন।
এসব আলোচনায় প্রাপ্ত তথ্য ও অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, দেশের প্রতিটি খাত ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে এবং পরিস্থিতির ক্রমাগত অবনতি ঘটছে। এই অবস্থা থেকে দেশকে রক্ষা করতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।
তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের প্রকৃত শক্তি জনগণ এবং তৃণমূলের নেতাকর্মীরা। দল জনগণ ও তৃণমূলের ওপরই আস্থা রাখে; অন্য কোনো শক্তির ওপর নির্ভর করে না।
নির্যাতিত ও নিপীড়িত নেতাকর্মীদের নেতৃত্বে অগ্রাধিকার দেওয়ার নির্দেশ
দলের সাংগঠনিক দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতাদের উদ্দেশে শেখ হাসিনা বলেন, যেসব স্থানে সাংগঠনিক শূন্যতা রয়েছে, সেখানে নেতৃত্ব নির্বাচনের ক্ষেত্রে বিগত সময়ে বিভিন্নভাবে নির্যাতন ও নিপীড়নের শিকার হওয়া নেতাকর্মীদের অগ্রাধিকার দিতে হবে।
তিনি আরও বলেন, গত প্রায় দুই বছরে রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে যারা নির্যাতন, নিপীড়ন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন, তাঁদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করতে হবে। এসব ঘটনা জনগণের সামনে তুলে ধরে সচেতনতা তৈরি করতে হবে। একই সঙ্গে নির্যাতন ও নিপীড়নের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের পরিচয় এবং কর্মকাণ্ডও জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে।
শেখ হাসিনা অভিযোগ করেন, অনেক নিরপরাধ সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তাকে মিথ্যা মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তিনি তাঁদের মুক্তি এবং হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহারের দাবি জানান।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের হত্যাকাণ্ডের বিচার নিশ্চিত করার অঙ্গীকার
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ঘটনাবলি প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, সে সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করেছিলেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ওই সময় অনেক পুলিশ সদস্য নিহত হন, তাঁদের মরদেহ পুড়িয়ে দেওয়া হয় এবং বিভিন্ন থানায় লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে।
এসব হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করে তিনি বলেন, প্রতিটি হত্যার ঘটনা বিচারিক তদন্তের মাধ্যমে উদ্ঘাটন করতে হবে এবং দায়ীদের বিচারের আওতায় আনতে হবে।
দেশজুড়ে হত্যা, ধর্ষণ, লুটপাট ও চাঁদাবাজির অভিযোগ
দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পাওয়া তথ্যের কথা উল্লেখ করে শেখ হাসিনা অভিযোগ করেন, বর্তমানে দেশ এক গভীর অন্ধকার পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। নির্বিচারে হত্যা, ধর্ষণ, লুটপাট, চাঁদাবাজি, হয়রানিমূলক মামলা এবং নানা ধরনের অনিয়ম-অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে বলে তিনি দাবি করেন।
তিনি অভিযোগ করেন, সরকার এসব কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নিয়ে অনেক ক্ষেত্রে নীরব ভূমিকা পালন করছে এবং ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের একাংশকে অন্যায় করার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে।
সরকারের সমালোচনা করে শেখ হাসিনা বলেন, মানুষের মুখে খাবার তুলে দিতে সরকার ব্যর্থ হলেও লাশ উৎপাদনে যেন তাদের কোনো ঘাটতি নেই।
দেশে ফেরার প্রত্যয়: “আমি দেশে ফিরতে আগ্রহী, অথচ সরকার বাধা সৃষ্টি করছে”
দেশের বর্তমান পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ এবং জনগণের পাশে দাঁড়ানোর প্রত্যয় পুনর্ব্যক্ত করে শেখ হাসিনা দেশে ফেরার ইচ্ছা প্রকাশ করেন।
তিনি বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, “আমি দেশে ফিরতে আগ্রহী, অথচ সরকার বাধা সৃষ্টি করছে।”
দলীয় নেতাকর্মীদের উদ্দেশে আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, যত নির্যাতনই আসুক, যত মৃত্যুদণ্ডই দেওয়া হোক না কেন, নেতাকর্মীদের জনগণের পাশে থাকতে হবে। জনগণকে সঙ্গে নিয়েই প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। জনগণের আস্থা ও সমর্থনই আওয়ামী লীগের সবচেয়ে বড় শক্তি।
সভায় নেতাদের বক্তব্য ও দেশের সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা
সভাটি সঞ্চালনা করেন আওয়ামী লীগের মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট মৃণাল কান্তি দাস।
সভায় বক্তব্য রাখেন দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া বীর বিক্রম, বীর মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর কবির নানক, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক কৃষিবিদ এ এফ এম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাংগঠনিক সম্পাদক এস এম কামাল হোসেন ও সুজিত রায় নন্দী, সদস্য অধ্যাপক মোহাম্মদ আলী আরাফাত, উপদপ্তর সম্পাদক রায়মন্ড আরেংসহ কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের অন্যান্য নেতৃবৃন্দ।
বক্তারা দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেন এবং তাঁদের পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন। সভায় কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের অন্যান্য সদস্যরাও অংশগ্রহণ করেন।
শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগ নেতাদের মৃত্যুদণ্ডের রায় বাতিলের দাবি
সভায় বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা এবং আওয়ামী লীগের অন্যান্য নেতার বিরুদ্ধে তথাকথিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের দেওয়া মৃত্যুদণ্ডের রায়কে দলটি অবৈধ ও ভিত্তিহীন বলে অভিহিত করে তা বাতিলের দাবি জানায়। একই সঙ্গে ট্রাইব্যুনালটি বিলুপ্ত করার দাবিও উত্থাপন করা হয়।
সভায় উল্লেখ করা হয়, সম্প্রতি তথাকথিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনা এবং দলের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের বিরুদ্ধে ভিত্তিহীন ও সাজানো অভিযোগে মৃত্যুদণ্ডের রায় দিয়েছে বলে আওয়ামী লীগ মনে করে।
দলটির ভাষ্য অনুযায়ী, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের মধ্যে রয়েছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক কৃষিবিদ এ এফ এম বাহাউদ্দিন নাছিম, বীর মুক্তিযোদ্ধা আসাদুজ্জামান খান কামাল, অধ্যাপক মোহাম্মদ আলী আরাফাত, বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক শেখ ফজলে শামস পরশ, সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল, বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ এনানসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ।
সভা মনে করে, সংশ্লিষ্ট ট্রাইব্যুনালের আইনগত ভিত্তি নেই। তাই এর কার্যক্রম ও রায়কে দলটি প্রত্যাখ্যান করে এবং অবিলম্বে এসব রায় বাতিলের দাবি জানায়।
দেশের আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ
সভায় দেশের চলমান আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়। বিশেষ করে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় উত্তরণের প্রক্রিয়া, তেল, গ্যাস, পানি ও বিদ্যুতের সরবরাহ ও নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি, আইনশৃঙ্খলার অবনতি এবং অর্থনৈতিক অচলাবস্থা নিয়ে আলোচনা হয়।
সভায় নেতৃবৃন্দ মনে করেন, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহের অনিশ্চয়তা, কর্মসংস্থানের সংকট এবং শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো বিষয়গুলো সাধারণ মানুষের জীবনকে আরও কঠিন করে তুলছে।
সভায় সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত দাবি ও প্রস্তাব
বিস্তারিত আলোচনা শেষে সভায় দেশের বর্তমান পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ এবং জনগণের জীবনমান উন্নয়নের লক্ষ্যে সর্বসম্মতিক্রমে কয়েকটি দাবি ও প্রস্তাব গৃহীত হয়। সেগুলো হলো—
১. নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য কমিয়ে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে আনতে হবে।
২. বিদ্যুৎ, তেল, গ্যাস ও সারের পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।
৩. কর্মহীন হয়ে পড়া শ্রমিকদের জন্য কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে।
৪. বন্ধ হয়ে যাওয়া শিল্পকারখানা ও কলকারখানা পুনরায় চালু করতে হবে।
৫. সব রাজনৈতিক বন্দির মুক্তি নিশ্চিত করতে হবে।
৬. রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করতে হবে।
৭. বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করতে হবে।
৮. বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের অন্যান্য নেতার বিরুদ্ধে তথাকথিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের দেওয়া মৃত্যুদণ্ডের রায় বাতিল করতে হবে এবং ট্রাইব্যুনালটি বিলুপ্ত করতে হবে।
৯. প্রজাতন্ত্রের নিরপরাধ সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার এবং গ্রেপ্তারকৃতদের মুক্তি নিশ্চিত করতে হবে।
জনগণের পাশে থাকার আহ্বান
সভায় আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার বক্তব্য এবং নেতৃবৃন্দের আলোচনায় দলের সাংগঠনিক ঐক্য, তৃণমূলের শক্তি এবং জনগণের পাশে থাকার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পায়।
দলীয় নেতাকর্মীদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, প্রতিকূলতা, নির্যাতন কিংবা বিচারিক চাপ—কোনো পরিস্থিতিতেই জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া যাবে না। জনগণের অধিকার, নিরাপত্তা ও জীবনযাত্রার সংকট নিয়ে কথা বলতে হবে এবং জনগণকে সঙ্গে নিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।
সভায় গৃহীত প্রস্তাব ও দাবিগুলোর মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ দেশের বর্তমান রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতি সম্পর্কে তাদের অবস্থান তুলে ধরে এবং দলটির ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা, নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা ও ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিষয়ে নিজেদের আপত্তি পুনর্ব্যক্ত করে।