Menu
Back to timeline

বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষতার আড়ালে বাড়ছে উদ্বেগ: ইউনূস সরকারের সময়কার নিরাপত্তাশূন্যতা থেকে বিএনপি আমলে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির বিস্তার

বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষতার আড়ালে বাড়ছে উদ্বেগ: ইউনূস সরকারের সময়কার নিরাপত্তাশূন্যতা থেকে বিএনপি আমলে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির বিস্তার

সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা, উগ্রবাদ মোকাবিলা এবং সমান নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি অন্তর্বর্তী সরকারের সময় পূরণ হয়নি—এখন বিএনপি সরকারের সামনে বড় পরীক্ষা হলো, রাষ্ট্র পরিচালনায় ধর্মীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে নাগরিকের সমান অধিকার প্রতিষ্ঠা করা।

দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক মহলে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ একটি ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। স্বাধীনতার পর অসাম্প্রদায়িক চেতনা, ধর্মীয় সহাবস্থান এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ বাংলাদেশের রাষ্ট্রদর্শনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। কিন্তু সংবিধানের বিভিন্ন বিধানের মধ্যে বিদ্যমান টানাপোড়েন, রাজনৈতিক স্বার্থে ধর্মের ব্যবহার এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা রয়েছে।

বর্তমানে বাংলাদেশের সামনে নতুন করে যে প্রশ্নগুলো উঠে এসেছে, তার মধ্যে অন্যতম হলো—দেশে ধর্মীয় উগ্রবাদী নেটওয়ার্কগুলোর তৎপরতা কতটা বিস্তৃত হচ্ছে এবং রাষ্ট্র সেগুলো মোকাবিলায় কতটা কার্যকর ভূমিকা পালন করছে। ইসলামিক স্টেট খোরাসান (আইএসকে) এবং আল-কায়েদা ইন দ্য ইন্ডিয়ান সাবকন্টিনেন্ট (একিউআইএস)-এর মতো আন্তর্জাতিক উগ্রবাদী সংগঠনের সম্ভাব্য যোগাযোগ ও তৎপরতা নিয়ে নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের উদ্বেগ রয়েছে। তবে এসব সংগঠনের উপস্থিতি, সাংগঠনিক সক্ষমতা এবং কার্যক্রমের ব্যাপ্তি নির্ধারণে নির্ভরযোগ্য গোয়েন্দা ও তদন্ত-তথ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার এবং পরবর্তী বিএনপি সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সমালোচকদের অভিযোগ, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় উগ্রবাদ মোকাবিলায় কার্যকর উদ্যোগের ঘাটতি ছিল। অন্যদিকে বিএনপি সরকারের সময় ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক শক্তির প্রভাব ও উগ্রবাদী নেটওয়ার্কের সম্ভাব্য বিস্তার নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এসব অভিযোগের যথার্থতা যাচাইয়ের জন্য রাজনৈতিক বক্তব্যের পাশাপাশি স্বাধীন তদন্ত ও প্রামাণ্য তথ্যের প্রয়োজন রয়েছে।

সংবিধানের দুই ধরনের বার্তা: ধর্মনিরপেক্ষতা ও রাষ্ট্রধর্ম

বাংলাদেশের সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা এবং রাষ্ট্রধর্ম—দুটি বিষয়ই অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। সংবিধানের ১২ অনুচ্ছেদে ধর্মনিরপেক্ষতার নীতি, সাম্প্রদায়িকতা দূরীকরণ এবং ধর্মের রাজনৈতিক অপব্যবহার প্রতিরোধের কথা বলা হয়েছে। অন্যদিকে ২(ক) অনুচ্ছেদে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।

এই দুই বিধানের সহাবস্থান বাংলাদেশের সাংবিধানিক কাঠামো নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে, রাষ্ট্র যখন একটি ধর্মকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিশেষ মর্যাদা দেয়, তখন অন্য ধর্মাবলম্বী নাগরিকদের সমান অধিকার ও রাষ্ট্রের প্রতি সমান মালিকানাবোধ কীভাবে নিশ্চিত করা হবে?

বাংলাদেশের সামনে ইসলাম ও গণতন্ত্রের মধ্যে কোনো একটি বেছে নেওয়ার প্রশ্ন নেই। বরং নিশ্চিত করতে হবে, রাষ্ট্রধর্মের স্বীকৃতি যেন কখনো অন্য ধর্মের মানুষের নাগরিক অধিকার সীমিত করার যুক্তি হিসেবে ব্যবহৃত না হয়। ধর্মীয় বিশ্বাস ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে, কিন্তু রাষ্ট্রের আইন ও প্রশাসনের কাছে সব নাগরিকের মর্যাদা সমান হওয়া জরুরি।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময় নিরাপত্তা ও উগ্রবাদ নিয়ে উদ্বেগ

২০২৪ সালের আগস্টে মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসে। জামায়াতে ইসলামীর ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, বিভিন্ন মামলায় অভিযুক্ত ব্যক্তিদের মুক্তি এবং নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম ও নেতৃত্বে পরিবর্তন নিয়ে রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিসরে আলোচনা শুরু হয়।

সমালোচকদের একটি অংশের দাবি, এসব পরিবর্তনের ফলে আগে নিয়ন্ত্রণে থাকা কিছু উগ্রবাদী গোষ্ঠী নতুন করে সক্রিয় হওয়ার সুযোগ পায়। তবে কোনো ব্যক্তির মুক্তি বা রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারকে এককভাবে উগ্রবাদ বৃদ্ধির প্রমাণ বলা যায় না। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, আদালতের সিদ্ধান্ত এবং পরবর্তী কার্যক্রম আলাদাভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও দেশীয় সংস্থা। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের World Report 2026-এ আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য উদ্ধৃত করে ২০২৫ সালের জুন থেকে আগস্টের মধ্যে সংঘবদ্ধ জনতার হামলায় অন্তত ১২৪ জন নিহত হওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। একই প্রতিবেদনে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা এবং ধর্মীয় কট্টরপন্থী গোষ্ঠীর চাপ নিয়েও উদ্বেগ তুলে ধরা হয়েছে।

সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমেও প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। বিশেষ করে হিন্দু সম্প্রদায়ের বিভিন্ন এলাকায় হামলা, মন্দির ভাঙচুর, বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ এবং ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে লুটপাটের অভিযোগ জনমনে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।

লেখাটিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত হিন্দু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে ৩ হাজার ২০০টিরও বেশি হামলার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এসব ঘটনার প্রকৃতি, সংখ্যা, উদ্দেশ্য এবং সংশ্লিষ্ট অপরাধীদের পরিচয় স্বাধীনভাবে যাচাই করা জরুরি। কারণ সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রশ্নটি রাজনৈতিক বিতর্কের ঊর্ধ্বে একটি মৌলিক মানবাধিকার ও নাগরিক অধিকারের বিষয়।

ধর্মীয় উগ্রবাদী তৎপরতা ও সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার প্রশ্ন

লেখাটিতে দাবি করা হয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় কিছু ধর্মীয় কট্টরপন্থী গোষ্ঠী প্রকাশ্যে রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মসূচি পরিচালনার সুযোগ পেয়েছে। হিজবুত তাহরীরের খেলাফত প্রতিষ্ঠার দাবিতে মিছিল, বিভিন্ন উগ্রবাদী সংগঠনের প্রচার এবং কিছু সমাবেশে চরমপন্থী প্রতীক ব্যবহারের অভিযোগও তুলে ধরা হয়েছে।

ঢাকার আশপাশের কিছু মাদ্রাসায় ইসলামিক স্টেট-সংশ্লিষ্ট নেটওয়ার্কের বোমা তৈরির কার্যক্রম পরিচালনার অভিযোগও লেখায় উল্লেখ রয়েছে। এসব গুরুতর নিরাপত্তা-সংক্রান্ত দাবি নিশ্চিত করতে তদন্ত প্রতিবেদন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য এবং আদালতের নথি প্রয়োজন। অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময় নারী অধিকার, সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা এবং ধর্মীয় সহনশীলতা নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়। নারী অধিকারবিষয়ক কিছু সংস্কার প্রস্তাবের বিরুদ্ধে হেফাজতে ইসলামের মতো সংগঠনের আন্দোলন ও চাপের কথা আলোচনায় এসেছে। বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বাধাগ্রস্ত হওয়া এবং সংখ্যালঘুদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি বৃদ্ধির অভিযোগও সামনে এসেছে।

এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি: বাংলাদেশের সমাজে ধর্মীয় রক্ষণশীলতা নতুন কোনো ঘটনা নয়। তবে রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো, কোনো গোষ্ঠী যেন ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে অন্য নাগরিকের অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কিংবা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণ করতে না পারে।

বিএনপি সরকারের সময় ধর্মভিত্তিক রাজনীতির প্রভাব নিয়ে নতুন বিতর্ক

অন্তর্বর্তী সরকারের সময় তৈরি হওয়া রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাগত পরিস্থিতির ধারাবাহিকতা বিএনপি সরকারের আমলেও আলোচনায় রয়েছে। সমালোচকদের অভিযোগ, ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে সমঝোতা এবং রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তির নামে কিছু বিতর্কিত ব্যক্তিকে স্থানীয় প্রশাসন বা রাজনৈতিক কাঠামোতে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে।

এই অভিযোগের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে।

১. উগ্রবাদী গোষ্ঠীর রাজনৈতিক স্বাভাবিকীকরণের আশঙ্কা

লেখাটিতে দাবি করা হয়েছে, নিষিদ্ধ বা চরমপন্থী সংগঠনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ রয়েছে—এমন কিছু ব্যক্তি রাজনৈতিক জোট ও স্থানীয় প্রশাসনিক কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। গণতান্ত্রিক অন্তর্ভুক্তি অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু এর অর্থ হতে পারে না যে সহিংসতা বা সন্ত্রাসবাদে জড়িত থাকার বিশ্বাসযোগ্য অভিযোগ উপেক্ষা করা হবে। একইভাবে অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে অপরাধী ঘোষণা করাও ন্যায়বিচারের নীতির পরিপন্থী।

২. সীমান্ত ও আন্তর্জাতিক উগ্রবাদী নেটওয়ার্কের ঝুঁকি

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্ত এবং রোহিঙ্গা শরণার্থীশিবিরের নিরাপত্তা পরিস্থিতি দীর্ঘদিন ধরেই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। লেখাটিতে অভিযোগ করা হয়েছে, আন্তর্জাতিক উগ্রবাদী নেটওয়ার্ক, আইএস-সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠী এবং রোহিঙ্গা সশস্ত্র সংগঠনগুলো সীমান্তের দুর্বলতা কাজে লাগিয়ে সদস্য সংগ্রহ, অবৈধ অস্ত্র পাচার এবং অর্থায়নের কার্যক্রম চালানোর চেষ্টা করছে।

এসব অভিযোগের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সংগঠন, অর্থায়নের উৎস, অস্ত্রের গতিপথ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য থাকা জরুরি। কারণ শরণার্থী জনগোষ্ঠীর সামগ্রিক পরিচয়কে নিরাপত্তা ঝুঁকির সঙ্গে এক করে দেখা উচিত নয়। অপরাধে জড়িত নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে, কিন্তু সাধারণ শরণার্থীদের অধিকার ও নিরাপত্তাও নিশ্চিত করতে হবে।

৩. সন্ত্রাসবিরোধী সক্ষমতা ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতা

বাংলাদেশ পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটসহ বিশেষায়িত নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে লেখাটি। ইউনিটগুলোর জনবল, নেতৃত্ব, তদন্ত সক্ষমতা এবং অগ্রাধিকার পরিবর্তনের ফলে সন্ত্রাসবিরোধী কার্যক্রম দুর্বল হয়েছে কি না, তা স্বাধীনভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

জঙ্গিবাদ মোকাবিলায় শুধু অভিযান পরিচালনা যথেষ্ট নয়। গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, আন্তঃদেশীয় সহযোগিতা, আর্থিক লেনদেন পর্যবেক্ষণ, অনলাইন উগ্রবাদী প্রচার প্রতিরোধ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পেশাদারিত্ব নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

আন্তর্জাতিক উদাসীনতার মূল্য দিতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে

ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা, নারীর অধিকার এবং সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার প্রশ্নগুলো বাংলাদেশের সামাজিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ, যারা দেশের মোট জনসংখ্যার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ, তাদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি তৈরি হলে তা শুধু একটি সম্প্রদায়ের সমস্যা থাকে না; এটি রাষ্ট্রের সামগ্রিক নাগরিক অধিকার রক্ষার সক্ষমতার প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়।

নারীদের সামাজিক ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার ওপর চাপ সৃষ্টি হলে দেশের শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও উন্নয়নও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একইভাবে ধর্মনিরপেক্ষ সাংস্কৃতিক পরিসর সংকুচিত হলে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও সামাজিক বহুত্ববাদ দুর্বল হয়।

২০২৫ সালের ডিসেম্বরে কেরানীগঞ্জের একটি মাদ্রাসায় বিস্ফোরণের ঘটনাকে লেখাটিতে উগ্রবাদী নেটওয়ার্ক পুনর্গঠনের সম্ভাব্য সতর্কসংকেত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ঘটনাটির সঙ্গে ইসলামিক স্টেট-সংশ্লিষ্ট নেটওয়ার্কের যোগাযোগ এবং আল আমিন নামের এক ব্যক্তির কথিত জঙ্গি-সম্পৃক্ততা তদন্তের বিষয় হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। তবে তদন্তের চূড়ান্ত ফলাফল ও আদালতে প্রমাণিত তথ্য ছাড়া এসব অভিযোগকে নিশ্চিত সিদ্ধান্ত হিসেবে উপস্থাপন করা উচিত নয়।

বাংলাদেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতি শুধু দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়। ভারতসহ প্রতিবেশী দেশ, দক্ষিণ এশিয়া এবং বৃহত্তর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্যও এর তাৎপর্য রয়েছে। একটি দেশে উগ্রবাদী নেটওয়ার্ক সক্রিয় হলে তা সীমান্ত নিরাপত্তা, আঞ্চলিক সহযোগিতা এবং আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবিরোধী উদ্যোগকে প্রভাবিত করতে পারে।

বাংলাদেশের সামনে এখন কোন পথ?

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কার নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক পরিবর্তন এবং বিএনপি সরকারের বর্তমান নীতিগত অবস্থান—দুটিই স্বাধীনভাবে পর্যালোচনা করা জরুরি। এক সরকারের সময় তৈরি হওয়া সমস্যার দায় অন্য সরকারের ওপর চাপিয়ে দিলেই সমাধান হবে না। একইভাবে রাজনৈতিক সুবিধার জন্য উগ্রবাদ বা সংখ্যালঘু নির্যাতনের অভিযোগকে উপেক্ষা করাও গ্রহণযোগ্য নয়।

বাংলাদেশকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, রাষ্ট্র কি সব নাগরিকের সমান অধিকার রক্ষার প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করবে, নাকি সংখ্যাগরিষ্ঠ ধর্মীয় পরিচয়ের রাজনৈতিক প্রভাব ক্রমশ রাষ্ট্র পরিচালনায় বড় ভূমিকা নেবে।

বাংলাদেশের মানুষ ধর্ম পালন করবেন, ধর্মীয় মূল্যবোধ ধারণ করবেন—এটি তাঁদের মৌলিক অধিকার। কিন্তু সেই অধিকার অন্য নাগরিকের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা সীমিত করার অনুমতি দেয় না। ধর্মীয় বিশ্বাস এবং গণতান্ত্রিক নাগরিকত্ব পরস্পরের বিরোধী হওয়ার কথা নয়। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো উভয়ের সহাবস্থান নিশ্চিত করা।

এ জন্য কয়েকটি বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ জরুরি:

  • ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হামলার অভিযোগ দ্রুত তদন্ত ও অপরাধীদের বিচার করতে হবে।

  • সন্ত্রাসবাদ ও উগ্রবাদ মোকাবিলায় বিশেষায়িত নিরাপত্তা ইউনিটগুলোর পেশাদারিত্ব, স্বাধীনতা ও সক্ষমতা বজায় রাখতে হবে।

  • নারী অধিকার, সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা এবং মতপ্রকাশের অধিকার রক্ষায় রাষ্ট্রকে নিরপেক্ষ অবস্থান নিতে হবে।

  • সীমান্ত ও শরণার্থীশিবিরে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে, তবে সাধারণ শরণার্থীদের অধিকার ক্ষুণ্ন না করে।

  • রাজনৈতিক পরিচয় বা ধর্মীয় মতাদর্শ নির্বিশেষে আইনের সমান প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।

  • সংবিধানের ধর্মনিরপেক্ষতা, ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং সমান নাগরিকত্বের নীতির মধ্যে সামঞ্জস্য প্রতিষ্ঠায় জাতীয় আলোচনা প্রয়োজন।

বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, স্থিতিশীল ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত রাখতে হলে কথার চেয়ে কার্যকর পদক্ষেপ বেশি জরুরি। অতীতের উন্নয়ন কিংবা ভবিষ্যতের সংস্কারের প্রতিশ্রুতি—কোনোটিই বর্তমানের নাগরিক নিরাপত্তা ও অধিকার রক্ষার বিকল্প হতে পারে না।

বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে রাষ্ট্র কতটা দৃঢ়ভাবে প্রতিটি নাগরিকের সমান অধিকার রক্ষা করতে পারে তার ওপর। ধর্মীয় পরিচয় নয়, নাগরিকত্বই হবে রাষ্ট্রের কাছে মানুষের মর্যাদা ও অধিকারের ভিত্তি—এই নীতিই হওয়া উচিত বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অঙ্গীকার।

More from the timeline

View all