Menu
Back to timeline

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে পরিকল্পিত স্থবিরতা ও বাস্তবতা অস্বীকারের মহোৎসব

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে পরিকল্পিত স্থবিরতা ও বাস্তবতা অস্বীকারের মহোৎসব

উচ্চ মূল্যস্ফীতি, কমতে থাকা প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থানের সংকট এবং ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা—সব মিলিয়ে কি বাংলাদেশ দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক স্থবিরতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে?

একটি দেশের অর্থনীতিতে যখন একই সঙ্গে প্রবৃদ্ধির গতি কমে যায়, দ্রব্যমূল্য উচ্চ পর্যায়ে থাকে এবং বেকারত্ব বাড়তে থাকে, তখন সেই পরিস্থিতিকে বলা হয় ‘স্ট্যাগফ্লেশন’ বা মুদ্রাস্ফীতিজনিত অর্থনৈতিক স্থবিরতা। এটি সাধারণ কোনো অর্থনৈতিক মন্দা নয়। বরং এমন একটি জটিল সংকট, যেখানে মূল্যস্ফীতি, উৎপাদন হ্রাস ও কর্মসংস্থানের অবনতি একে অপরকে আরও তীব্র করে তোলে। ফলে অর্থনীতি দীর্ঘ সময় ধরে একটি নেতিবাচক চক্রে আটকে যেতে পারে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা থেকে বোঝা যায়, এই সংকট কতটা ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। ২০২২ সালের শেষ দিকে তুরস্কে মূল্যস্ফীতি ৮৫ শতাংশে পৌঁছেছিল। ২০২৩ সালে আর্জেন্টিনায় মূল্যস্ফীতির হার ছিল প্রায় ২০০ শতাংশ। লেবাননে মূল্যস্ফীতি তিন অঙ্কের ঘরে পৌঁছানোর পাশাপাশি দেশটির মুদ্রার মূল্য প্রায় ৯৮ শতাংশ কমে যায়। ২০১৯ সালের পর থেকে দেশটির অর্থনৈতিক উৎপাদনও প্রায় ৪০ শতাংশ সংকুচিত হয়।

২০২৩ সালে পাকিস্তানে মূল্যস্ফীতি ৩৮ শতাংশে উঠেছিল। সেখানে বাংলাদেশের মতো ব্যাংকগুলো বেসরকারি উদ্যোক্তা ও উৎপাদন খাতে ঋণ দেওয়ার পরিবর্তে সরকারি খাতে অর্থ বিনিয়োগকে বেশি নিরাপদ মনে করেছিল। একই সময়ে নাইজেরিয়ায় মূল্যস্ফীতি ৩০ শতাংশ অতিক্রম করে। ২০২৩-২৪ সময়ে মিসরে তা ৩৫ শতাংশ বা তারও বেশি হয়। আর ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে শ্রীলঙ্কায় মূল্যস্ফীতি প্রায় ৭০ শতাংশে পৌঁছায়।

কিছু দেশে পরিস্থিতি আরও বিপজ্জনক হয়ে ওঠে, যখন সরকারের ঋণসংকট সরাসরি ব্যাংকিং খাতকে দুর্বল করে দেয়। ২০১০ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে গ্রিসে এমন এক আর্থিক দুষ্টচক্র তৈরি হয়, যেখানে সরকারি ঋণের ঝুঁকি ব্যাংকগুলোর আর্থিক অবস্থার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। দেশটির ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের হার একপর্যায়ে প্রায় ৪৫-৫০ শতাংশে পৌঁছেছিল। ঘানাতেও ২০২২-২৩ সময়ে প্রায় ৫৪ শতাংশ মূল্যস্ফীতির পাশাপাশি সরকারি আর্থিক সংকট ব্যাংকগুলোর ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করে।

১৯৯৭-৯৮ সালের এশীয় আর্থিক সংকট, ১৯৯৪-৯৫ সালের মেক্সিকো সংকট এবং ১৯৯৮ সালের রাশিয়ার সংকট ছিল আরও গভীর ও বহুমাত্রিক। এসব সংকটে মুদ্রাবাজার, ব্যাংকিং ব্যবস্থা এবং সামগ্রিক আর্থিক কাঠামো একযোগে বিপর্যস্ত হয়েছিল। অন্যদিকে ১৯৭৩ থেকে ১৯৯৭ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন তেলসংকটজনিত পরিস্থিতিতেও স্ট্যাগফ্লেশনের বৈশিষ্ট্য দেখা গিয়েছিল, যদিও সেগুলোর সঙ্গে একই ধরনের ব্যাংকিং খাতের বিপর্যয় যুক্ত ছিল না।

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক চাপের সূত্রপাত

কোভিড-১৯ মহামারির পর থেকেই বাংলাদেশের অর্থনীতি বৈদেশিক বাণিজ্য ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ নিয়ে চাপের মুখে পড়ে। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা এবং সরবরাহব্যবস্থার সংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। মহামারিকালীন সরবরাহ সংকটের মধ্যে আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বাণিজ্যিক দায় মেটাতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করতে হয়। এর ফলে রিজার্ভের ওপর চাপ বাড়ে।

এরপর মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার বড় ধরনের প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেয়। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) দুটি পৃথক প্রতিষ্ঠানে ভাগ করার সিদ্ধান্ত রাজস্ব আদায়ের ধারাবাহিকতা ও কার্যকারিতা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করে। সমালোচকদের মতে, এ ধরনের পুনর্গঠন অভ্যন্তরীণ রাজস্ব সংগ্রহের স্বাভাবিক প্রক্রিয়াকে দুর্বল করার ঝুঁকি তৈরি করেছিল।

রাজস্ব আদায়ের ঘাটতি সামাল দিতে সরকারকে অভ্যন্তরীণ ব্যাংকঋণের ওপর বেশি নির্ভর করতে হয়। দীর্ঘ সময় ধরে সরকারি বিল ও বন্ডের বিপরীতে ১০-১১ শতাংশের মতো উচ্চ সুদে অর্থ সংগ্রহের প্রবণতা দেখা যায় বলে লেখক উল্লেখ করেছেন। পাশাপাশি বিদেশি ঋণের ক্ষেত্রেও বাজারভিত্তিক উচ্চ সুদ এবং কঠোর শর্তের বিষয়টি সামনে এসেছে। এসব ঋণের শর্ত ও দায়বদ্ধতা কতটা স্বচ্ছ, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

অন্যদিকে সংঘবদ্ধ জনতার তাণ্ডব, অগ্নিসংযোগ ও বিভিন্ন ধরনের সহিংসতার কারণে ব্যবসা-বাণিজ্যের স্বাভাবিক পরিবেশ ব্যাহত হয়। বিনিয়োগকারীদের আস্থা দুর্বল হয় এবং উৎপাদনমুখী কার্যক্রমে অনিশ্চয়তা বাড়ে।

এই পরিস্থিতির মধ্যেই বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর বড় ধরনের গ্যাসসংকট দেখা দেয় বলে লেখাটিতে দাবি করা হয়েছে। জ্বালানির অভাবে শিল্পকারখানার উৎপাদন বন্ধ বা সীমিত হয়ে পড়ে। কৃষি ও শিল্প—উভয় খাতেই উৎপাদন ব্যাহত হয়। বিদ্যুৎ বিভ্রাট ও লোডশেডিং বেড়ে যায়, যার সরাসরি প্রভাব পড়ে ব্যবসা, কর্মসংস্থান এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায়।

এর পাশাপাশি ব্যাংকিং খাতের খেলাপি ঋণের পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়েছে বলে লেখকের দাবি। মুহাম্মদ ইউনূস দায়িত্ব নেওয়ার সময় সরকারি হিসাবে যে পরিমাণ খেলাপি ঋণের তথ্য ছিল, তার তুলনায় তা প্রায় তিন গুণে পৌঁছেছে বলে লেখায় উল্লেখ করা হয়েছে। এই প্রবণতা ব্যাংকগুলোর আর্থিক সক্ষমতা এবং দেশের সামগ্রিক ঋণব্যবস্থার জন্য বড় সতর্কসংকেত।

প্রবৃদ্ধির দাবি ও বাস্তব অর্থনৈতিক পরিস্থিতির ব্যবধান

সরকারের পক্ষ থেকে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশের বেশি বলে যে হিসাব তুলে ধরা হয়েছে, তার সঙ্গে বাস্তব অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সামঞ্জস্য নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। লেখকের মূল্যায়ন অনুযায়ী, বিএনপি সরকারের প্রথম ছয় মাসে প্রকৃত প্রবৃদ্ধি ৪ শতাংশের কাছাকাছি ছিল। সামনে জ্বালানি সংকট অব্যাহত থাকলে পরবর্তী অর্থবছরের প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনাও দুর্বল হতে পারে।

এদিকে মূল্যস্ফীতির হার দীর্ঘদিন ধরে ৮-৯ শতাংশের মধ্যে অবস্থান করছে। অর্থাৎ মানুষের আয় যে হারে বাড়ছে, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও সেবার ব্যয় তার চেয়ে দ্রুত বাড়ছে। ফলে কাগজে-কলমে আয় অপরিবর্তিত থাকলেও মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমে যাচ্ছে।

ব্যাংকিং খাতের চিত্রও আশাব্যঞ্জক নয়। লেখায় উল্লেখ করা হয়েছে, মোট ঋণের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ খেলাপি হয়ে পড়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এর প্রভাবে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে প্রায় ৪-৫ শতাংশে নেমে এসেছে। অথচ একই সময়ে ব্যাংক আমানত বাড়ছে প্রায় ১০ শতাংশ হারে।

এই পরিসংখ্যান অর্থনীতির একটি মৌলিক সমস্যাকে তুলে ধরে: ব্যাংকে অর্থ জমা হচ্ছে, কিন্তু সেই অর্থ উৎপাদন, ব্যবসা ও নতুন বিনিয়োগে যথেষ্ট পরিমাণে ব্যবহৃত হচ্ছে না। ঋণখেলাপির ঝুঁকি, ব্যবসায়িক অনিশ্চয়তা এবং উৎপাদন খাতের দুর্বল চাহিদার কারণে ব্যাংকগুলো নতুন ঋণ দিতে অনাগ্রহী হয়ে উঠছে। অন্যদিকে আমানতের বিপরীতে তারল্য ধরে রাখার খরচও বাড়ছে। ফলে ব্যাংকগুলো আমানতের সুদের হার কমানোর সিদ্ধান্ত নিতে পারে।

এ অবস্থায় সরকারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ ব্যাংকগুলোর কাছে তুলনামূলক আকর্ষণীয় বিকল্প হয়ে ওঠে। কারণ বেসরকারি খাতে ঋণ দিয়ে ঝুঁকি নেওয়ার চেয়ে সরকারকে ঋণ দেওয়া অনেক ক্ষেত্রে নিরাপদ মনে হতে পারে। কিন্তু এর ফলে উৎপাদনশীল খাত প্রয়োজনীয় অর্থায়ন থেকে বঞ্চিত হয়। নতুন শিল্প স্থাপন, ব্যবসা সম্প্রসারণ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি কমে যায়।

অর্থাৎ ব্যাংকগুলো নিজেদের ঝুঁকি কমানোর চেষ্টা করলেও সামগ্রিক অর্থনীতির স্থবিরতা আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।

সাধারণ মানুষের ওপর সংকটের প্রথম আঘাত

এই অর্থনৈতিক স্থবিরতার সবচেয়ে তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়বে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায়। বাজারে পণ্যের দাম বাড়লেও মজুরি ও বেতন একই হারে বাড়ছে না। ফলে মানুষের প্রকৃত আয় কমে যাচ্ছে। আগে যে অর্থ দিয়ে একটি পরিবার মাসের প্রয়োজন মেটাতে পারত, এখন সেই একই অর্থে আগের তুলনায় অনেক কম পণ্য ও সেবা পাওয়া যাচ্ছে।

এর পরের ধাপে কর্মসংস্থানের সংকট আরও গভীর হতে পারে। উৎপাদন কমে গেলে শিল্পকারখানা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান কর্মী ছাঁটাই করতে বাধ্য হতে পারে। নতুন চাকরির সুযোগ কমে যাবে এবং বিশেষ করে তরুণদের জন্য কর্মবাজারে প্রবেশ আরও কঠিন হবে।

পরবর্তী পর্যায়ে ব্যাংকিং খাতে ঋণসংকট বা ‘ক্রেডিট ক্রাঞ্চ’ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ব্যাংকে আমানত বাড়লেও বেসরকারি খাতে ঋণ বিতরণ কমতে থাকলে উৎপাদন ও বিনিয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হবে। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতির কারণে আমানতের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমে যেতে পারে।

এ অবস্থায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক যদি কৃত্রিমভাবে সুদের হার কমানোর চেষ্টা করে, তাহলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। কারণ বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের চাহিদা না থাকলে শুধু সুদের হার কমিয়ে ঋণপ্রবাহ বাড়ানো সম্ভব নয়। উৎপাদন ও ব্যবসার পরিবেশ ঠিক না থাকলে উদ্যোক্তারা নতুন ঋণ নিতে আগ্রহী হবেন না।

এমন পরিস্থিতিতে তরুণ উদ্যোক্তাদের জামানতবিহীন ঋণ দেওয়ার উদ্যোগও যথাযথ যাচাই-বাছাই ছাড়া বাস্তবায়ন করা ঝুঁকিপূর্ণ। বিদ্যমান ঋণ পোর্টফোলিও যখন খেলাপি ঋণের চাপে দুর্বল, তখন ঋণগ্রহীতার সক্ষমতা যাচাই না করে নতুন ঋণ বিতরণ করলে ব্যাংকের আর্থিক ঝুঁকি আরও বেড়ে যেতে পারে।

ব্যাংকিং খাতে আস্থার সংকট ও সম্ভাব্য বিপর্যয়

সংকটের পরবর্তী ধাপে ব্যাংকগুলোর লোকসান আরও বাড়তে পারে। বেসরকারি খাতে ঋণ বিতরণ কমে যাওয়া এবং খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়ে যাওয়া ব্যাংকের আয় ও মূলধনের ওপর চাপ সৃষ্টি করবে। ঋণ আদায়ে ব্যর্থতা বাড়লে কোনো কোনো ব্যাংকের দেউলিয়া হওয়ার ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।

এমন পরিস্থিতিতে আমানতকারীদের আস্থা নষ্ট হওয়া অস্বাভাবিক নয়। ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হলে অনেকেই একসঙ্গে টাকা তুলে নেওয়ার চেষ্টা করতে পারেন। এতে ব্যাংকে তারল্যসংকট দেখা দিতে পারে এবং পরিস্থিতি আরও দ্রুত অবনতির দিকে যেতে পারে।

আগস্টের শেষ সপ্তাহে একীভূত ইসলামী ব্যাংকগুলোর আমানত উত্তোলনের আবেদন নিয়ে যে উদ্বেগের কথা লেখায় উল্লেখ করা হয়েছে, সেটিকে ব্যাংকিং খাতে আস্থার সংকটের সম্ভাব্য ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সামনে কঠিন সিদ্ধান্ত

এই সংকটের সবচেয়ে জটিল দিক হলো মুদ্রানীতি পরিচালনার দ্বিধা। কেন্দ্রীয় ব্যাংক যদি সুদের হার কমায়, তাহলে বাজারে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়তে পারে। মানুষের ক্রয়ক্ষমতা আরও কমবে। একই সঙ্গে দেশীয় বিনিয়োগের তুলনায় বিদেশে বেশি মুনাফার সম্ভাবনা থাকলে সঞ্চয়কারীরা অর্থ দেশের বাইরে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করতে পারেন। এতে বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে চাপ বাড়বে।

অন্যদিকে সুদের হার বাড়ানো হলে ঋণ গ্রহণের খরচ বেড়ে যাবে। ব্যবসায়ীরা নতুন বিনিয়োগে নিরুৎসাহিত হবেন, শিল্প উৎপাদন কমবে এবং অর্থনীতি আরও গভীর মন্দার দিকে যেতে পারে। একই সঙ্গে ঋণগ্রহীতাদের ওপর চাপ বাড়ায় ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণও আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকবে।

অর্থাৎ সুদের হার কমানো বা বাড়ানো—কোনো সিদ্ধান্তই ঝুঁকিমুক্ত নয়। দুর্বল অর্থনীতিতে এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী আর্থিক অবদমন তৈরি করতে পারে। তখন প্রকৃত মূল্যস্ফীতির তুলনায় সুদের হার কম থাকে, ঋণ বিতরণে সরকারি নির্দেশনা ও প্রভাব বাড়ে এবং ব্যাংকিং খাতে সরকারি ঋণের বোঝা ক্রমাগত ভারী হয়।

তবে কোনো পদক্ষেপ না নেওয়া আরও বিপজ্জনক হতে পারে। লেখকের মতে, বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এর কিছু লক্ষণ ইতোমধ্যে দেখা যাচ্ছে, বিশেষ করে ইউনূস সরকারের শেষ পর্যায় থেকে। সরকারি গ্যারান্টি এবং বাজেট ঘাটতি মেটাতে অর্থায়নের ওপর নির্ভরতা বাড়লে রাষ্ট্রের আর্থিক ঝুঁকিও বাড়ে। শেষ পর্যন্ত এই ঝুঁকি সরকারি আর্থিক হিসাবের পাশাপাশি ব্যাংকিং খাতের ওপরও চাপ সৃষ্টি করে।

টাকার অবমূল্যায়ন ও বৈদেশিক মুদ্রার নতুন চাপ

আমদানি ব্যয় বাড়লে ডলারের চাহিদা বৃদ্ধি পায়। এর ফলে দেশীয় মুদ্রার ওপর অবমূল্যায়নের চাপ তৈরি হয়। লেখায় উল্লেখ করা হয়েছে, প্রায় ১৮ মাসের ব্যবধানে ডলারের বিপরীতে টাকার বিনিময় হার ১১৭ থেকে ১২৪-এ নেমে এসেছে।

যদি বৈদেশিক অর্থপ্রবাহের ওপর নিয়ন্ত্রণ শিথিল থাকে এবং সঞ্চয়কারীরা অধিক মুনাফার আশায় বিদেশে অর্থ স্থানান্তর করতে থাকেন, তাহলে টাকার ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে। পরিস্থিতি সামাল দিতে শেষ পর্যন্ত নির্দিষ্ট বিনিময় হার বা কঠোর মুদ্রা নিয়ন্ত্রণের মতো পদক্ষেপের প্রয়োজন দেখা দিতে পারে বলে লেখক আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।

তবে শুধু বিনিময় হার নিয়ন্ত্রণ করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের উৎস বাড়ানো, রপ্তানি সক্ষমতা বৃদ্ধি, আমদানি ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা জরুরি।

উৎপাদন ও কর্মসংস্থান সংকুচিত হলে ভবিষ্যৎ আরও অনিশ্চিত

বাংলাদেশের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো অভ্যন্তরীণ চাহিদা ও উৎপাদন বাড়ানোর ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত অগ্রগতি না হওয়া—এমনটাই লেখকের মূল্যায়ন। অর্থনীতিকে সচল রাখতে শুধু সুদের হার, বিনিময় হার কিংবা ব্যাংকের হিসাব নিয়ে কাজ করলেই হবে না। উৎপাদন বাড়াতে হবে, ব্যবসার পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে হবে এবং মানুষের হাতে অর্থের প্রবাহ নিশ্চিত করতে হবে।

অন্যথায় চাকরি হারানোর ঘটনা বাড়বে, আয়বৈষম্য তীব্র হবে, দারিদ্র্য আরও গভীর হবে এবং দেশের মানবসম্পদের উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হবে। গত দুই বছরে বিশ্বব্যাংক ও জাতিসংঘের বিভিন্ন প্রতিবেদনে এসব ধরনের অর্থনৈতিক ও সামাজিক ঝুঁকি নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে লেখক উল্লেখ করেছেন।

একটি অর্থনীতি দীর্ঘদিন উৎপাদন ও কর্মসংস্থানের সংকটে থাকলে তা পুনরুদ্ধার করা কঠিন হয়ে পড়ে। কখনো কখনো ক্ষতির মাত্রা এত গভীর হয় যে স্বাভাবিক অর্থনৈতিক অবস্থায় ফিরে আসতে বহু বছর লেগে যায়। এর সবচেয়ে বড় বোঝা বহন করতে হয় সাধারণ মানুষকে। দারিদ্র্য, বেকারত্ব, খাদ্যনিরাপত্তাহীনতা এবং জীবনযাত্রার অনিশ্চয়তা তখন আরও বিস্তৃত হয়। চরম পরিস্থিতিতে খাদ্যসংকট ও দুর্ভিক্ষের আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

উত্তরণের পথ: এখনই কার্যকর অর্থনৈতিক পদক্ষেপ জরুরি

বাংলাদেশকে এই বিপজ্জনক পরিস্থিতি থেকে বের করে আনতে হলে বিচ্ছিন্ন কিছু সিদ্ধান্তের পরিবর্তে সমন্বিত অর্থনৈতিক পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।

প্রথমত, বেসরকারি খাতের উৎপাদন ও বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। শিল্পকারখানায় নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা, ব্যবসায়িক পরিবেশ স্থিতিশীল রাখা এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধার করা জরুরি।

দ্বিতীয়ত, রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। কর আদায়ের কার্যকারিতা বাড়ানোর পাশাপাশি সরকারি ব্যয়, ঋণ গ্রহণ এবং বাজেট ঘাটতি ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।

তৃতীয়ত, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে উৎপাদনশীল খাতে ঋণপ্রবাহের ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে। শুধু ঋণের সুদের হার কমানো বা বাড়ানোর মাধ্যমে অর্থনীতির সংকট সমাধান সম্ভব নয়। বরং উৎপাদন, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে হবে।

চতুর্থত, ব্যাংকিং খাতের প্রকৃত আর্থিক অবস্থা নিরূপণ করতে হবে। খেলাপি ঋণ আদায়, অনিয়মের তদন্ত, দায়ীদের জবাবদিহি এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যাংকের মূলধন পুনর্গঠনের উদ্যোগ নিতে হবে। যেসব ব্যাংক আর্থিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে, তাদের শুধু কাগজে-কলমে সচল রাখার পরিবর্তে প্রকৃত সক্ষমতা ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে হবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, অর্থনৈতিক বাস্তবতাকে অস্বীকার না করে স্বচ্ছভাবে সংকটের কারণ ও গভীরতা স্বীকার করা। প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যান কিংবা সরকারি আশ্বাস দিয়ে মানুষের জীবনযাত্রার দুর্ভোগ আড়াল করা সম্ভব নয়।

সময়মতো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে বাংলাদেশ দীর্ঘস্থায়ী নিম্ন প্রবৃদ্ধি, আর্থিক অবদমন এবং দুর্বল ব্যাংকিং ব্যবস্থার এক বিপজ্জনক চক্রে আটকে যেতে পারে। এর ফলে এমন ‘জম্বি ব্যাংক’-এর সংখ্যা বাড়তে পারে, যেগুলো কাগজে-কলমে টিকে থাকলেও বাস্তবে অর্থনীতিতে কার্যকর ঋণ ও বিনিয়োগের ভূমিকা পালনে অক্ষম।

বাংলাদেশের সামনে তাই এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—অর্থনীতির সংকটকে স্বীকার করে উৎপাদন, কর্মসংস্থান, রাজস্ব আদায় ও ব্যাংকিং খাতে জরুরি সংস্কার শুরু করা হবে, নাকি বাস্তবতাকে অস্বীকার করে সংকট আরও গভীর হতে দেওয়া হবে? সিদ্ধান্ত নিতে দেরি হলে এর মূল্য দিতে হবে দেশের কোটি কোটি মানুষকে।

লেখক: ড. মামুনুর রশীদ, যুক্তরাজ্যের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক।

More from the timeline

View all