সাইবার নিরাপত্তা (সংশোধন) আইন ২০২৬: নিরাপত্তার আড়ালে কি মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা?
সাইবার নিরাপত্তার নামে নাগরিকের কণ্ঠরোধ, অনলাইন বক্তব্যকে অপরাধে পরিণত করা এবং সরকারের হাতে ব্যাপক ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করার আশঙ্কা—বাংলাদেশের প্রস্তাবিত সাইবার নিরাপত্তা (সংশোধন) আইন ২০২৬ ঘিরে এখন এমনই গুরুতর প্রশ্ন সামনে আসছে।
বাংলাদেশের নবনির্বাচিত বিএনপি সরকার দ্রুত সাইবার নিরাপত্তা (সংশোধন) আইন ২০২৬ প্রণয়নের উদ্যোগ নিচ্ছে বলে প্রদত্ত প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। কিন্তু প্রস্তাবিত আইনের বিভিন্ন বিধান নিয়ে যে উদ্বেগ তুলে ধরা হয়েছে, তা বিবেচনায় নিলে প্রশ্ন ওঠে—এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য কি নাগরিকদের ডিজিটাল নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, নাকি অনলাইন বক্তব্য ও তথ্যপ্রবাহের ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ আরও শক্তিশালী করা?
সাইবার অপরাধ প্রতিরোধ, ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা এবং অনলাইন প্রতারণা মোকাবিলা অবশ্যই একটি আধুনিক রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। কিন্তু নিরাপত্তার নামে এমন কোনো আইন প্রণয়ন করা উচিত নয়, যার অস্পষ্ট সংজ্ঞা ও কঠোর শাস্তির ভয়ে সাধারণ মানুষ, সাংবাদিক, লেখক কিংবা সরকারের সমালোচকেরা নিজেদের বক্তব্য প্রকাশ করতে দ্বিধাবোধ করেন।
প্রস্তাবিত আইন নিয়ে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো—এর কিছু বিধান কার্যকর হলে গুজব, ভুল তথ্য, মানহানি, ব্যঙ্গচিত্র কিংবা রাষ্ট্রকে অবমাননার অভিযোগে নাগরিকদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। অভিযোগগুলোর সংজ্ঞা যদি স্পষ্ট না হয় এবং অপরাধ প্রমাণের মানদণ্ড নির্ধারিত না থাকে, তাহলে আইনটির প্রয়োগে বেছে বেছে কাউকে লক্ষ্যবস্তু করার ঝুঁকি থেকেই যায়।
গুজব, ভুল তথ্য ও ব্যঙ্গচিত্র: মতপ্রকাশ কি অপরাধে পরিণত হবে?
প্রদত্ত প্রতিবেদনে প্রস্তাবিত আইনের অধীনে কথিত গুজব ছড়ানোর জন্য সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড, অনলাইনে ভুল তথ্য প্রচারের জন্য ৪০ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা এবং অনলাইন মানহানির জন্য সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ডের বিধানের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
এসব শাস্তির বিধান খসড়ায় ঠিক কীভাবে লেখা হয়েছে, কোন অপরাধের ক্ষেত্রে কোন শাস্তি প্রযোজ্য এবং অপরাধের উপাদান কী—তা মূল খসড়া দেখে যাচাই করা জরুরি। তবে প্রতিবেদনে বর্ণিত শাস্তির মাত্রা যদি যথাযথ হয়, তাহলে তা নাগরিক অধিকার ও আইনের আনুপাতিকতার প্রশ্নে গভীর আলোচনা দাবি করে।
‘গুজব’, ‘ভুল তথ্য’, ‘অবমাননা’ কিংবা ‘রাষ্ট্রকে অপমান’—এ ধরনের শব্দের সুনির্দিষ্ট আইনি সংজ্ঞা থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো তথ্য ভুল প্রমাণিত হলেই তা ইচ্ছাকৃত অপরাধ হয়ে যায় না। একজন সাংবাদিক জনস্বার্থে কোনো অভিযোগ প্রকাশ করতে পারেন, একজন নাগরিক সরকারের কোনো সিদ্ধান্তের সমালোচনা করতে পারেন, কিংবা একজন কার্টুনিস্ট ব্যঙ্গচিত্রের মাধ্যমে ক্ষমতাসীনদের কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারেন। এসব ক্ষেত্রে তথ্যের সত্যতা, বক্তব্যের উদ্দেশ্য, জনস্বার্থ এবং প্রকৃত ক্ষতির বিষয়গুলো বিবেচনায় না নিলে আইনটি বৈধ সমালোচনা দমনের হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে।
একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সরকারের সমালোচনা করার অধিকার যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি মিথ্যা তথ্যের মাধ্যমে কারও ক্ষতি করা থেকে নাগরিকদের সুরক্ষাও জরুরি। এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করতে হলে আইন হতে হবে স্পষ্ট, নির্দিষ্ট এবং অপব্যবহার রোধের কার্যকর সুরক্ষাসম্পন্ন।
টিআইবির উদ্বেগ: নজরদারি ও দমন-পীড়নের ঝুঁকি
প্রদত্ত লেখায় ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) প্রস্তাবিত আইনের বিভিন্ন দিক নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সংস্থাটির বক্তব্য হিসেবে বলা হয়েছে, সাইবার অপরাধ, সাইবার নিরাপত্তা এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার মতো পৃথক বিষয়কে একই আইনের আওতায় আনা হলে আইনটির ভুল ব্যাখ্যা ও অপব্যবহারের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামানের বক্তব্য হিসেবে প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, প্রস্তাবিত আইনটি বর্তমান রূপে পাস হলে বাংলাদেশের সাইবার পরিসর অনিয়ন্ত্রিত নজরদারি, দায়মুক্তি ও দমন-পীড়নের পরিবেশে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এই বক্তব্যের যথার্থতা ও মূল উদ্ধৃতি প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট বিবৃতি বা সংবাদসূত্র থেকে যাচাই করা উচিত।
মানবাধিকার সহায়তা সোসাইটিসহ অন্যান্য অধিকারকর্মী ও সংগঠনও ‘যাচাই না করা’ তথ্যকে অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করার সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে বলে লেখাটিতে দাবি করা হয়েছে। বিশেষ করে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা এবং জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিবেদন প্রকাশের ক্ষেত্রে এমন বিধান বাধা সৃষ্টি করতে পারে।
কারণ সাংবাদিকতার কাজ শুধু সরকারি বিবৃতি পুনঃপ্রকাশ করা নয়; অনেক সময় ক্ষমতাবান ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অনুসন্ধান করা, অনিয়মের তথ্য সামনে আনা এবং জনস্বার্থে প্রশ্ন তোলাও সাংবাদিকতার অংশ। তথ্য যাচাইয়ের যথাযথ সুযোগ না দিয়ে বা ইচ্ছাকৃত মিথ্যাচার ও সৎ উদ্দেশ্যে করা প্রতিবেদনকে আলাদা না করে শাস্তির বিধান প্রয়োগ করা হলে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
আদালতের অনুমোদন ছাড়াই কনটেন্ট বন্ধের ক্ষমতা?
প্রস্তাবিত আইন নিয়ে আরেকটি বড় উদ্বেগ হলো অনলাইন কনটেন্ট ব্লক বা অপসারণের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের ক্ষমতা সম্প্রসারণের অভিযোগ।
প্রদত্ত প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, খসড়া অনুযায়ী কিছু ক্ষেত্রে আগাম আদালতের অনুমোদন ছাড়াই কনটেন্ট বন্ধ করার ক্ষমতা দেওয়া হতে পারে। পাশাপাশি কোন কোন কারণে কনটেন্ট ব্লক করা যাবে, তার পরিধি বাড়ানো এবং অপসারিত কনটেন্ট সম্পর্কে জনসমক্ষে তথ্য প্রকাশের বাধ্যবাধকতা কমিয়ে দেওয়ার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ধরনের বিধান কার্যকর হলে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়তে পারে। কোনো কনটেন্ট কেন বন্ধ করা হলো, সিদ্ধান্তের পক্ষে কী যুক্তি ছিল, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের আপিলের সুযোগ রয়েছে কি না—এসব প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর থাকা দরকার।
অবশ্যই, শিশু যৌন নির্যাতনের উপাদান, সাইবার অপরাধের প্রমাণ, ব্যক্তিগত তথ্যের অবৈধ প্রকাশ কিংবা জরুরি নিরাপত্তাঝুঁকির ক্ষেত্রে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু জরুরি ক্ষমতার ব্যবহারও হতে হবে নির্দিষ্ট আইনি মানদণ্ডের অধীন, প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত নয় এবং পরবর্তী স্বাধীন পর্যালোচনার আওতায়।
রাষ্ট্রের হাতে ক্ষমতা থাকা আর সেই ক্ষমতা জবাবদিহি ছাড়া প্রয়োগ করার সুযোগ থাকা এক বিষয় নয়। একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় এই পার্থক্য নিশ্চিত করাই আইনের শাসনের অন্যতম শর্ত।
২৮ সদস্যের সাইবার নিরাপত্তা পরিষদ: ক্ষমতার ভারসাম্য কোথায়?
প্রতিবেদনে প্রস্তাবিত ২৮ সদস্যের জাতীয় সাইবার নিরাপত্তা পরিষদ নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। এতে প্রধানমন্ত্রী ও সরকার মনোনীত ব্যক্তিদের প্রভাব বেশি থাকবে এবং বেসরকারি খাতের বিশেষজ্ঞদের সংখ্যা হবে মাত্র দুজন—এমন দাবি করা হয়েছে। ওই দুই বিশেষজ্ঞও সরকারের মনোনয়নে নির্বাচিত হবেন বলে লেখাটিতে উল্লেখ রয়েছে।
যদি পরিষদটির গঠন ও ক্ষমতা সত্যিই এমন হয়, তাহলে এর স্বাধীনতা, স্বচ্ছতা এবং বিভিন্ন পক্ষের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা দরকার।
সাইবার নিরাপত্তা একটি প্রযুক্তিগত ও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট ক্ষেত্র। এখানে প্রযুক্তিবিদ, সাইবার অপরাধ বিশেষজ্ঞ, নাগরিক অধিকারকর্মী, গণমাধ্যম প্রতিনিধি, আইনজ্ঞ এবং বেসরকারি খাতের অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের স্বাধীন মতামত গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাঠামো যদি প্রধানত সরকারের মনোনীত ব্যক্তিদের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়, তাহলে সরকারের সিদ্ধান্তের নিরপেক্ষ পর্যালোচনা কতটা সম্ভব হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।
প্রতিবেদনে আরও দাবি করা হয়েছে, আইনের অধীনে দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রে সুরক্ষা বা দায়মুক্তির বিধান রাখা হতে পারে। এমন কোনো বিধান থাকলে তা কতটা সীমিত, কোন পরিস্থিতিতে প্রযোজ্য এবং অসদাচরণ বা ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে কী প্রতিকার থাকবে—এসব বিষয় স্পষ্ট হওয়া জরুরি।
কর্মকর্তাদের বৈধ ও সৎ উদ্দেশ্যে নেওয়া সিদ্ধান্তের জন্য অযৌক্তিক হয়রানি থেকে সুরক্ষা প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু সেই সুরক্ষা যেন ক্ষমতার অপব্যবহার, বেআইনি নজরদারি বা নাগরিক অধিকারের লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে জবাবদিহি এড়ানোর পথ না হয়ে ওঠে।
আগের সাইবার আইন নিয়ে সমালোচনা, নতুন খসড়ায় কি আরও কঠোর নিয়ন্ত্রণ?
বাংলাদেশে সাইবার আইন নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। ২০২৩ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় প্রণীত সাইবার নিরাপত্তা আইনও দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সমালোচনার মুখে পড়েছিল। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সাংবাদিকতা এবং সরকারের সমালোচকদের বিরুদ্ধে আইনের সম্ভাব্য ব্যবহারের প্রশ্ন তখনও আলোচনায় ছিল।
পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বিতর্কিত কয়েকটি বিধান সংশোধন বা বাতিল করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল বলে প্রদত্ত লেখায় উল্লেখ রয়েছে। সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে নতুন আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে নাগরিক অধিকার সুরক্ষা, বিচারিক তদারকি এবং স্বচ্ছতা আরও শক্তিশালী করার প্রত্যাশা তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।
কিন্তু প্রস্তাবিত ২০২৬ সালের সংশোধনীতে যদি গুজব ও ভুল তথ্যসংক্রান্ত অপরাধের শাস্তি বাড়ানো হয়, কনটেন্ট ব্লক করার ক্ষমতা সম্প্রসারিত হয় এবং মতপ্রকাশের সঙ্গে সম্পর্কিত অপরাধের সংজ্ঞা অস্পষ্ট রাখা হয়, তাহলে সেটি আগের বিতর্কগুলোকে নতুন করে সামনে আনবে।
যে রাজনৈতিক দল গণতান্ত্রিক পরিসর পুনরুদ্ধার এবং নাগরিক স্বাধীনতা রক্ষার প্রতিশ্রুতি দেয়, তাদের কাছে প্রত্যাশা থাকে—ক্ষমতায় এসে সেই প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন আইন ও প্রশাসনিক ব্যবস্থায় দেখা যাবে। অতীতের কোনো আইন নিয়ে সমালোচনা করা আর নিজের সরকারের সময় একই ধরনের বা আরও কঠোর বিধান প্রস্তাব করা—এই দুই অবস্থানের মধ্যে অসংগতি থাকলে তার ব্যাখ্যাও সরকারকে দিতে হবে।
গণতন্ত্রে নিরাপত্তা ও স্বাধীনতা পরস্পরের প্রতিপক্ষ নয়
সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষা করা—দুটিই রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। একটি দায়িত্ব পালনের নামে অন্যটিকে দুর্বল করা দীর্ঘমেয়াদে নাগরিকদের আস্থা নষ্ট করতে পারে।
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় অপরাধের সংজ্ঞা স্পষ্ট থাকে, শাস্তি অপরাধের গুরুত্বের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়, রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত স্বাধীন বিচারিক পর্যালোচনার আওতায় থাকে এবং নাগরিকেরা অন্যায়ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলে প্রতিকার চাইতে পারেন। একই সঙ্গে ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা, অনলাইন প্রতারণা প্রতিরোধ এবং ডিজিটাল অবকাঠামো রক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
অন্যদিকে, আইনের ভাষা যদি অস্পষ্ট হয়, রাষ্ট্রের হাতে ব্যাপক নির্বাহী ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হয় এবং সেই ক্ষমতার স্বাধীন তদারকি দুর্বল থাকে, তাহলে আইনটির প্রয়োগ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে। নাগরিকেরা তখন শুধু বেআইনি বক্তব্যের জন্য নয়, বৈধ সমালোচনা বা জনস্বার্থে প্রশ্ন তোলার কারণেও শাস্তির আশঙ্কা করতে পারেন।
এমন পরিস্থিতিকে অনেক সময় ‘ভীতির সংস্কৃতি’ বলা হয়—যেখানে সবাইকে সরাসরি শাস্তি দেওয়ার প্রয়োজন হয় না; শাস্তির আশঙ্কাই মানুষকে নীরব করে দিতে পারে।
বিএনপি সরকারের প্রতি আহ্বান: খসড়া পুনর্বিবেচনা করুন
প্রস্তাবিত সাইবার নিরাপত্তা (সংশোধন) আইন ২০২৬ নিয়ে উদ্বেগ দূর করার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো খসড়াটি জনসমক্ষে প্রকাশ করা, সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মতামত গ্রহণ করা এবং বিতর্কিত বিধানগুলো স্বাধীনভাবে পর্যালোচনা করা।
বিএনপি সরকারের উচিত সাংবাদিক, প্রযুক্তিবিদ, মানবাধিকার সংগঠন, আইনজ্ঞ, নাগরিক সমাজ এবং বেসরকারি খাতের বিশেষজ্ঞদের নিয়ে অর্থবহ পরামর্শপ্রক্রিয়া চালু করা। শুধু আনুষ্ঠানিক আলোচনা নয়, প্রাপ্ত মতামতের ভিত্তিতে কোন বিধান পরিবর্তন করা হলো এবং কেন করা হলো, তার ব্যাখ্যাও জনসমক্ষে প্রকাশ করা দরকার।
বিশেষ করে—
‘গুজব’, ‘ভুল তথ্য’, ‘অবমাননা’ ও ‘রাষ্ট্রকে অপমান’-এর মতো শব্দের স্পষ্ট ও সীমিত আইনি সংজ্ঞা নির্ধারণ করতে হবে।
জনস্বার্থে সাংবাদিকতা, সৎ উদ্দেশ্যে করা সমালোচনা এবং ব্যঙ্গাত্মক বক্তব্যের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।
কনটেন্ট ব্লক করার সিদ্ধান্তে স্বচ্ছতা, স্বাধীন বিচারিক তদারকি এবং কার্যকর আপিলের ব্যবস্থা রাখতে হবে।
নজরদারি ও তথ্য সংগ্রহের ক্ষমতার ওপর কঠোর আইনি সীমা আরোপ করতে হবে।
সরকারি কর্মকর্তাদের ক্ষমতার অপব্যবহার বা বেআইনি পদক্ষেপের বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিকার নিশ্চিত করতে হবে।
শাস্তির মাত্রা অপরাধের প্রকৃত ক্ষতি ও গুরুত্বের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে।
প্রস্তাবিত খসড়ায় এসব সুরক্ষা যথাযথভাবে নিশ্চিত না হলে সরকারকে আইনটি বর্তমান রূপে এগিয়ে নেওয়ার পরিবর্তে পুনর্বিবেচনা করে নতুনভাবে প্রণয়নের কথা ভাবতে হবে।
প্রশ্ন এখন একটাই: নিরাপত্তা, নাকি নিয়ন্ত্রণ?
বাংলাদেশের নাগরিকেরা নিরাপদ ডিজিটাল পরিবেশ চান। তাঁরা চান অনলাইন প্রতারণা বন্ধ হোক, ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষিত থাকুক, সাইবার অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনা হোক। কিন্তু সেই সঙ্গে তাঁরা সরকারের সিদ্ধান্তের সমালোচনা করতে, দুর্নীতি ও অনিয়মের খবর প্রকাশ করতে, ব্যঙ্গচিত্র আঁকতে এবং জনস্বার্থে প্রশ্ন তুলতে চান—আইনকে ভয় না করে।
এই অধিকারগুলো কোনো সরকারের বিশেষ অনুগ্রহ নয়; এগুলো গণতান্ত্রিক সমাজের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। তাই সাইবার নিরাপত্তার নামে এমন বিধান তৈরি করা উচিত নয়, যা নাগরিকের বৈধ বক্তব্যকে অপরাধে পরিণত করার সুযোগ সৃষ্টি করে।
সাইবার নিরাপত্তা আইন মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য হওয়া উচিত, ক্ষমতাকে সমালোচনা থেকে নিরাপদ রাখার জন্য নয়। বিএনপি সরকার যদি সত্যিই গণতান্ত্রিক পরিসর রক্ষা করতে চায়, তাহলে প্রস্তাবিত আইনটির প্রতিটি বিতর্কিত বিধান পুনর্বিবেচনা, স্বাধীন তদারকি নিশ্চিত এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার কার্যকর সুরক্ষা দেওয়ার মধ্য দিয়েই তা প্রমাণ করতে হবে।
কারণ শেষ পর্যন্ত একটি আইনের সাফল্য নির্ভর করে শুধু কতটি পোস্ট সরানো হলো বা কতজনকে শাস্তি দেওয়া হলো, তার ওপর নয়। বরং নির্ভর করে—আইনটি অপরাধ কমাতে কতটা কার্যকর, নাগরিকের অধিকার কতটা রক্ষা করে এবং রাষ্ট্রের ক্ষমতাকে কতটা জবাবদিহির মধ্যে রাখে।
নিরাপত্তা চাই, কিন্তু সেই নিরাপত্তার মূল্য যেন স্বাধীনতার বিনিময়ে দিতে না হয়।