বাংলাদেশের নবনির্বাচিত বিএনপি সরকারের আমলে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে। ২০২৬ সালের প্রথম সাত মাসে দেশজুড়ে বিভিন্ন হামলায় ৩৬১ জন পুলিশ সদস্য আহত হওয়ার তথ্য সামনে এসেছে। ৩৬১ পুলিশ সদস্য হামলায় আহত
প্রশ্নটি তাই শুধু পুলিশের নিরাপত্তা নিয়ে নয়; প্রশ্নটি রাষ্ট্রের আইন প্রয়োগের সক্ষমতা নিয়েও। যে পুলিশ সদস্যরা নাগরিকের জানমাল রক্ষা এবং আইন বাস্তবায়নের দায়িত্বে রয়েছেন, তারাই যদি বারবার হামলার শিকার হন, তাহলে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত—সেটিই এখন বড় উদ্বেগ।
পুলিশের ওপর হামলা কি নতুন বাস্তবতা হয়ে উঠছে?
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর ধরন বলছে, পুলিশের ওপর হামলা আর কেবল বড় ধরনের অভিযান বা সংঘবদ্ধ অপরাধীদের সঙ্গে সংঘর্ষের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। টহল, গ্রেপ্তার, আসামি ধরতে অভিযান কিংবা জনসমাগম নিয়ন্ত্রণের মতো নিয়মিত দায়িত্ব পালন করতে গিয়েও পুলিশ সদস্যরা হামলার মুখে পড়ছেন।
ঢাকায় পৃথক ঘটনায় একজন পুলিশ সদস্য নিহত এবং আরও দুজন গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনাও পরিস্থিতির গভীরতা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে। Police officer killed, two others shot in separate Dhaka incidents
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, অনেক ক্ষেত্রে সন্দেহভাজন বা গ্রেপ্তার ব্যক্তিকে পুলিশের কাছ থেকে ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা, পুলিশকে ঘিরে ফেলা কিংবা শারীরিকভাবে আক্রমণ করার মতো ঘটনাও সামনে আসছে। Attacks on law enforcers continue
এ ধরনের পরিস্থিতি একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেয়: আইন প্রয়োগকারী সংস্থার প্রতি ভয় বা শ্রদ্ধার জায়গায় যদি প্রকাশ্য প্রতিরোধ ও হামলার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত হয়, তাহলে রাষ্ট্রের আইন প্রয়োগের সক্ষমতা স্বাভাবিকভাবেই দুর্বল হয়ে পড়ে।
২০২৪-এর অস্থিরতার পরও কেন কাটছে না সংকট?
২০২৪ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতার পর বাংলাদেশের পুলিশ বাহিনী যে বড় ধরনের ধাক্কার মুখে পড়েছিল, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু দুই বছর পরও যদি পুলিশ সদস্যদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা, মনোবল সংকট এবং কর্তৃত্ব হারানোর অনুভূতি থেকে থাকে, তাহলে সেটিকে আর কেবল ‘পরিবর্তনকালীন বিশৃঙ্খলা’ বলে এড়িয়ে যাওয়া যায় না।
একটি কার্যকর পুলিশ বাহিনীর জন্য শুধু অস্ত্র, যানবাহন বা জনবল যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন স্পষ্ট রাজনৈতিক সমর্থন, পেশাগত স্বাধীনতা, দ্রুত বিচার এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে কার্যকর শাস্তির নিশ্চয়তা।
কোনো পুলিশ সদস্য যদি মনে করেন, আইন প্রয়োগ করতে গিয়ে তিনি নিজেই হামলার শিকার হতে পারেন এবং পরে হামলাকারীদের বিরুদ্ধে যথেষ্ট ব্যবস্থা নাও হতে পারে, তাহলে তার সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বাভাবিকভাবেই সতর্কতা তৈরি হবে। সেই দ্বিধা শেষ পর্যন্ত অপরাধীদেরই সুবিধা দেয়।
সরকারের বক্তব্য বনাম মাঠের বাস্তবতা
সরকারের পক্ষ থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় কঠোর অবস্থানের কথা বলা হচ্ছে। পুলিশকে রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে অপরাধীকে অপরাধী হিসেবেই বিবেচনা করার আহ্বানও জানানো হচ্ছে। কিন্তু মাঠপর্যায়ে পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা অব্যাহত থাকলে শুধু বক্তব্য দিয়ে জননিরাপত্তার সংকট সমাধান করা সম্ভব নয়।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি মূল্যায়নের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বক্তব্যের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো বাস্তব পরিসংখ্যান—হত্যা, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা, পুলিশের ওপর হামলা এবং অপরাধীদের গ্রেপ্তার ও বিচারের হার।
যদি এসব সূচকে প্রত্যাশিত উন্নতি না ঘটে, তাহলে সরকারের ‘আইনশৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার’ দাবিকে প্রশ্ন করা স্বাভাবিক।
পুলিশের দুর্বলতা মানেই নাগরিকের দুর্বলতা
পুলিশ কোনো আলাদা শ্রেণির প্রতিষ্ঠান নয়। পুলিশের ওপর হামলা শেষ পর্যন্ত সাধারণ নাগরিকের নিরাপত্তাকেই দুর্বল করে।
একজন পুলিশ সদস্য আহত হলে শুধু একজন সরকারি কর্মচারী আহত হন না—একটি থানার কার্যক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়, একটি এলাকার টহল ও তদন্ত কার্যক্রম ব্যাহত হয় এবং অপরাধীদের কাছে ভুল বার্তা পৌঁছায়।
আর যখন অপরাধীরা বুঝতে পারে যে তারা সংঘবদ্ধ হয়ে পুলিশকে প্রতিরোধ করতে পারবে, তখন সেই সাহস ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে। প্রথমে আসামি ছিনিয়ে নেওয়া, পরে পুলিশকে মারধর, এরপর প্রকাশ্য চাঁদাবাজি বা সন্ত্রাস—এভাবেই আইনের প্রতি অবজ্ঞা একটি সামাজিক বাস্তবতায় পরিণত হতে পারে।
রাষ্ট্রের জন্য এখন সবচেয়ে বড় পরীক্ষা
বাংলাদেশের সামনে তাই মূল প্রশ্নটি হলো—রাষ্ট্র কি তার আইন প্রয়োগকারী বাহিনীর কর্তৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে পারবে?
পুলিশকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রেখে পেশাগতভাবে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে। একই সঙ্গে পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায় দ্রুত তদন্ত, কার্যকর মামলা এবং দৃশ্যমান বিচার নিশ্চিত করতে হবে। অপরাধী যে দলেরই হোক, যে গোষ্ঠীরই হোক কিংবা যত প্রভাবশালীই হোক—আইনের সামনে তার পরিচয় একটাই হওয়া উচিত: অপরাধী।
কারণ রাষ্ট্রের শক্তি শুধু সরকারের হাতে থাকা ক্ষমতায় নয়; রাষ্ট্রের শক্তি নির্ভর করে আইন সবার জন্য সমানভাবে কার্যকর কি না তার ওপর।
৩৬১ জন পুলিশ সদস্য আহত হওয়ার তথ্য তাই কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়। এটি আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার জন্য একটি সতর্কসংকেত। পুলিশের ওপর হামলা যদি স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হয় এবং অপরাধীরা যদি আইন প্রয়োগের পথে প্রকাশ্যে বাধা দেওয়ার সাহস পায়, তাহলে নিরাপত্তার সংকট শুধু পুলিশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না—তা ছড়িয়ে পড়বে পুরো সমাজে।
বাংলাদেশে স্থিতিশীলতা ও জননিরাপত্তা ফিরিয়ে আনতে হলে এখন দরকার বক্তব্যের চেয়ে কার্যকর পদক্ষেপ। কারণ একটি রাষ্ট্র তখনই শক্তিশালী, যখন তার আইন রক্ষাকারীরাই নিরাপদে আইন প্রয়োগ করতে পারেন।