ড. ইউনুসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর বাংলাদেশ পরিণত হয়েছে এক ভয়ংকর প্রতিশোধের রাষ্ট্রে। আদালত, পুলিশ ও প্রশাসনকে হাতিয়ার বানিয়ে সরকার এখন দেশের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও তাদের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে এক নির্মম অভিযানে নেমেছে। শহর থেকে গ্রাম, অফিস থেকে পাড়া—সব জায়গাই এখন আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত মানুষের জন্য হয়ে উঠেছে শিকার ক্ষেত্র।
গণনির্যাতন ও গণবিচ্ছিন্নতা
দেশজুড়ে ১.৫ থেকে ২ কোটি আওয়ামী লীগ নেতা ও কর্মী এখন বাস্তুচ্যুত। তারা কেউ নিজ গ্রাম-বাসা ছেড়ে পালিয়েছেন, কেউ আত্মগোপনে আছেন। এই বিপুল সংখ্যক মানুষের নিপীড়ন কোনো আকস্মিক বিশৃঙ্খলা নয়—এটি একটি পরিকল্পিত রাজনৈতিক অভিযান, যার উদ্দেশ্য একটাই: আওয়ামী লীগকে রাষ্ট্র থেকে মুছে ফেলা।
গ্রেপ্তার, মিথ্যা মামলা, ভয়ভীতি ও হয়রানির মাধ্যমে প্রশাসন আজ পরিণত হয়েছে দমনযন্ত্রে। যে বিচারব্যবস্থা নাগরিকের অধিকার রক্ষায় নিয়োজিত থাকার কথা, সেটিই আজ রাজনৈতিক প্রতিশোধের হাতিয়ার। আদালতে জামিন অস্বীকার, মামলার শুনানি দীর্ঘসূত্রতা, আইনজীবীদের হয়রানি—সব কিছুই চলছে এক পরিকল্পিত নীরব নিপীড়নের অংশ হিসেবে।
রাজনৈতিক প্রতিশোধের নামে মানবিক বিপর্যয়
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার সরকার পতনের পর বহু মানুষ ভেবেছিল রাজনৈতিক সমঝোতার নতুন অধ্যায় শুরু হবে। কিন্তু তার বদলে যা ঘটেছে তা এক রাষ্ট্রীয় প্রতিশোধের অভিযান। সারা দেশে আওয়ামী লীগ অফিসে হামলা, নেতাকর্মীদের বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেওয়া, পরিবারের ওপর আক্রমণ—সবকিছুই সংগঠিতভাবে ঘটানো হয়েছে। প্রশাসন নীরব থেকেছে, আর বিএনপি-জামায়াত চক্র এই সুযোগে ‘প্রতিশোধের উল্লাসে’ মেতেছে।
গ্রামাঞ্চলে আওয়ামী লীগের সমর্থক সন্দেহে পুরো গ্রাম পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। শহরে চলছে প্রশাসনিক অভিযান ও নির্বিচার গ্রেপ্তার। পুলিশের পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসনের অনেকেই এই নিপীড়নে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে অংশ নিচ্ছেন। যারা পালাতে পারেননি, তাদের আটক বা নির্যাতন করা হয়েছে; যারা পালিয়েছেন, তারা এখন আশ্রয়হীন ও অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখোমুখি।
গোপনে বেঁচে থাকা, অদম্য প্রতিরোধ
নির্যাতনের ভয়ে বহু প্রভাবশালী নেতা এখন পরিচয় গোপন করে দিনমজুর, রিকশাচালক বা শ্রমিক হিসেবে কাজ করছেন। কেউ কেউ পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগও বন্ধ করে দিয়েছেন, কারণ একটি ফোনকলই তাদের অবস্থান ফাঁস করে দিতে পারে। তবুও, নিপীড়নের মাঝেও তাদের প্রতিরোধের মনোবল নিভে যায়নি। গোপনে সংগঠন পুনর্গঠনের চেষ্টা চলছে, রাতের অন্ধকারে বৈঠক হচ্ছে, তথ্য আদান-প্রদান চলছে।
রাজনৈতিক নির্মূলের কৌশল
অন্তর্বর্তী সরকারের এই অভিযান দুটি লক্ষ্য পূরণ করছে—শারীরিক উচ্ছেদ এবং রাজনৈতিক মুছে ফেলা। আওয়ামী লীগের শিকড়কে উপড়ে ফেলা হচ্ছে, যাতে দলটি আর জনসমর্থন ফিরে না পায়। ভয় আর নীরবতার রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করে একদলীয় নিয়ন্ত্রণ কায়েম করা হচ্ছে।
মানবাধিকারের চূড়ান্ত অবমাননা
আজ বাংলাদেশে মানবাধিকার অর্থহীন হয়ে পড়েছে। স্কুলছুট শিশু, পালিয়ে বেড়ানো পরিবার, পুড়ে যাওয়া গ্রাম—সবই এক রাজনৈতিক প্রতিশোধের ভয়াবহ চিত্র। জাতিসংঘ ঘোষিত মৌলিক অধিকার—রাজনৈতিক অংশগ্রহণ ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা—আজ কার্যত বিলুপ্ত।
এক আতঙ্কগ্রস্ত জাতির প্রতিচ্ছবি
ঢাকা, খুলনা, রাজশাহী—সব শহরের চেনা মুখগুলো হারিয়ে গেছে। দলীয় পতাকা মুছে গেছে, আলোচনার জায়গায় নেমেছে নীরবতা। এই নীরবতা শান্তি নয়, এটি ভয়ের প্রতিধ্বনি।
১.৫ থেকে ২ কোটি বাস্তুচ্যুত আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীর এই গল্প কেবল একটি রাজনৈতিক দলের নয়—এটি একটি জাতির গণতান্ত্রিক আত্মার বিলাপ। যতদিন না এই মানুষগুলো তাদের ঘরে ফিরতে পারছে, ততদিন বাংলাদেশে গণতন্ত্র কেবল স্মৃতিতেই থাকবে।