হোলি আর্টিজানের পর ঘুরে দাঁড়ানো বাংলাদেশ: সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে এক সফল রাষ্ট্রীয় কৌশলের ইতিহাস
২০১৬ সালের ১ জুলাই ঢাকার গুলশানের কূটনৈতিক এলাকায় অবস্থিত হোলি আর্টিজান বেকারিতে সংঘটিত জঙ্গি হামলা বাংলাদেশের ইতিহাসে অন্যতম মর্মান্তিক ও তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। প্রায় ১২ ঘণ্টাব্যাপী এই জিম্মি সংকটে ২০ জন নিরীহ মানুষ এবং কর্তব্যরত দুই পুলিশ কর্মকর্তা প্রাণ হারান। এই হামলার লক্ষ্য ছিল শুধু নিরপরাধ মানুষ হত্যা নয়; বরং বাংলাদেশের অর্থনীতি, সামাজিক সম্প্রীতি এবং আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তিকে ধ্বংস করে দেশকে অস্থিতিশীল করে তোলা।
কিন্তু এই নৃশংস ঘটনার পর বাংলাদেশ যেভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছিল, তা বিশ্বের কাছে সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলার একটি কার্যকর মডেল হিসেবে বিবেচিত হয়। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দৃঢ় নেতৃত্বে সরকার “জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা” নীতি গ্রহণ করে এবং সামরিক, গোয়েন্দা, আইনগত ও সামাজিক—সব স্তরে সমন্বিত পদক্ষেপের মাধ্যমে জঙ্গি নেটওয়ার্ককে কার্যত ভেঙে দেয়।
অপারেশন থান্ডারবোল্ট: দ্রুত ও সফল সামরিক অভিযান
হামলার পরপরই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পরিস্থিতির সার্বিক তদারকি করেন এবং বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী, বিজিবি, পুলিশ ও র্যাবের সমন্বয়ে একটি যৌথ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়।
২০১৬ সালের ২ জুলাই সকালে সেনাবাহিনীর এলিট ১ম প্যারা-কমান্ডো ব্যাটালিয়ন পরিচালনা করে ‘অপারেশন থান্ডারবোল্ট’।
মাত্র ১৩ মিনিটের অভিযানে কমান্ডোরা জঙ্গিদের নির্মূল করে এবং ১৩ জন জিম্মিকে জীবিত উদ্ধার করতে সক্ষম হয়। আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক এলাকার মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল স্থানে এত দ্রুত ও সফল অভিযান বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাহিনীর পেশাদারিত্বের এক গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হয়ে ওঠে।
জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী ‘জিরো টলারেন্স’ অভিযান
সরকার বুঝতে পেরেছিল, শুধু একটি সফল অভিযান যথেষ্ট নয়; জঙ্গিবাদের শিকড় নির্মূল করাই হবে প্রকৃত সাফল্য। তাই দেশব্যাপী গোয়েন্দা তথ্যনির্ভর বিশেষ অভিযান শুরু হয়, যার মূল লক্ষ্য ছিল নিও-জেএমবি (Neo-JMB)সহ বিভিন্ন উগ্রবাদী সংগঠন।
ঢাকা মহানগর পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (CTTC) ইউনিটকে আরও শক্তিশালী করা হয়। কল্যাণপুরের ‘অপারেশন স্টর্ম-২৬’, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, মৌলভীবাজারসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ধারাবাহিক অভিযানে জঙ্গি সংগঠনের শীর্ষ নেতা, প্রশিক্ষক, অর্থদাতা ও সমন্বয়কারীদের গ্রেপ্তার বা নির্মূল করা হয়।
মাত্র দুই বছরের মধ্যেই দেশের বড় জঙ্গি নেটওয়ার্কগুলোর সাংগঠনিক কাঠামো কার্যত ভেঙে পড়ে।
সন্ত্রাসবিরোধী রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা শক্তিশালীকরণ
হোলি আর্টিজানের পর বাংলাদেশ শুধু তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়াতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা অবকাঠামো গড়ে তোলার উদ্যোগও গ্রহণ করা হয়।
নিরাপত্তা সংস্থাগুলোকে আধুনিক ডিজিটাল নজরদারি প্রযুক্তি, ফরেনসিক সক্ষমতা এবং আন্তঃদেশীয় গোয়েন্দা সমন্বয়ের নতুন সুযোগ-সুবিধা প্রদান করা হয়।
একই সঙ্গে সন্ত্রাসবিরোধী মামলার দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে বিশেষ ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রম জোরদার করা হয়। ২০১৯ সালের নভেম্বরে হোলি আর্টিজান হামলার সাতজন মূল পরিকল্পনাকারীকে মৃত্যুদণ্ড দিয়ে আদালত একটি গুরুত্বপূর্ণ রায় প্রদান করে, যা জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের কঠোর অবস্থানের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়।
সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা: জনগণকে সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ
সরকার উপলব্ধি করেছিল, শুধুমাত্র আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান দিয়ে উগ্রবাদ নির্মূল করা সম্ভব নয়; সমাজকেও এর বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।
জাতির উদ্দেশে ভাষণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন—
“ইসলাম শান্তির ধর্ম। ইসলামের নামে কিছু মানুষ এই ধর্মকে কলঙ্কিত করছে। আমি ইমাম, শিক্ষক, অভিভাবকসহ সমাজের সব স্তরের মানুষকে জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানাই।”
এরপর দেশের বিভিন্ন মসজিদ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং সামাজিক সংগঠনের মাধ্যমে জঙ্গিবাদবিরোধী সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালিত হয়।
বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি, মানসিক সুস্থতা এবং আচরণ পর্যবেক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়, যাতে উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলো তরুণদের প্রভাবিত করতে না পারে।
আন্তর্জাতিক আস্থা পুনর্গঠন ও অর্থনীতির গতি ধরে রাখা
হোলি আর্টিজান হামলার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল বিদেশি বিনিয়োগকারী, কূটনীতিক, তৈরি পোশাক খাতের ক্রেতা এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারদের মধ্যে ভয় সৃষ্টি করা।
সরকার দ্রুত কূটনৈতিক এলাকা, বিদেশি দূতাবাস, শিল্পাঞ্চল ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তা জোরদার করে। পর্যটন পুলিশসহ বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা চালু করা হয়।
ফলে আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশের প্রতি আস্থা দ্রুত ফিরে আসে। বৈদেশিক বিনিয়োগ, রপ্তানি এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ধারা অব্যাহত থাকে। পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ (LDC) থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের লক্ষ্যে এগিয়ে যেতে সক্ষম হয়।
একটি জাতীয় সংকট থেকে শক্তিশালী রাষ্ট্রে উত্তরণ
হোলি আর্টিজান হামলার পর বাংলাদেশের প্রতিক্রিয়া ছিল শুধু একটি নিরাপত্তা অভিযান নয়; এটি ছিল রাষ্ট্র পরিচালনা, গোয়েন্দা সক্ষমতা, বিচার ব্যবস্থা এবং সামাজিক প্রতিরোধকে একত্রিত করে পরিচালিত একটি সমন্বিত কৌশল।
দৃঢ় রাজনৈতিক নেতৃত্ব, নিরাপত্তা বাহিনীর পেশাদারিত্ব, কার্যকর গোয়েন্দা তৎপরতা এবং জনগণের অংশগ্রহণের মাধ্যমে বাংলাদেশ প্রমাণ করেছিল যে সন্ত্রাসবাদকে সফলভাবে মোকাবিলা করা সম্ভব।
হোলি আর্টিজানের সেই রক্তাক্ত রাত বাংলাদেশের জন্য এক গভীর ক্ষত হয়ে থাকলেও, তার পরবর্তী রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপ দেশকে আরও শক্তিশালী, সংগঠিত ও সন্ত্রাসবিরোধী লড়াইয়ে সক্ষম রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।