Menu
Back to timeline

সন্ত্রাসীদের মুক্তি, আর কারাগারে ভিন্নমতাবলম্বীদের মৃত্যু—বাংলাদেশে কি নতুন মানবাধিকার সংকট?

সন্ত্রাসীদের মুক্তি, আর কারাগারে ভিন্নমতাবলম্বীদের মৃত্যু—বাংলাদেশে কি নতুন মানবাধিকার সংকট?

বাংলাদেশে রাজনৈতিক নিপীড়ন নিয়ে নতুন করে গুরুতর প্রশ্ন উঠছে। অভিযোগ রয়েছে, একদিকে দণ্ডিত বা অভিযুক্ত উগ্রপন্থী ও সন্ত্রাসীদের জামিনে মুক্তির সুযোগ তৈরি হচ্ছে, অন্যদিকে আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত রাজনৈতিক কর্মীদের বিরুদ্ধে কঠোর সন্ত্রাসবিরোধী আইন প্রয়োগ করে দীর্ঘদিন আটক রাখা, চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত করা এবং হেফাজতে নির্যাতনের অভিযোগ সামনে আসছে।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—যারা এখনো কোনো অপরাধে আদালতে দোষী সাব্যস্ত হননি, তাদের ক্ষেত্রেও রাজনৈতিক পরিচয় বা দলের সঙ্গে সম্পৃক্ততাকে আটক ও হয়রানির ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে—এমন অভিযোগ ক্রমেই সামনে আসছে। যদি এসব অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হয়, তাহলে তা আইনের শাসন, ন্যায়বিচার এবং মৌলিক মানবাধিকারের জন্য গভীর সংকেত বহন করে।

নুরুল ইসলামের মৃত্যু: কারাগারে চিকিৎসা ও নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন

মিরসরাই পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ডের সাধারণ সম্পাদক নুরুল ইসলাম, বয়স ৫৫ বছর, কোনো অপরাধে আদালতে দণ্ডিত ছিলেন না—এমনটাই তাঁর পক্ষের দাবি। আওয়ামী লীগের সঙ্গে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার কারণে তাঁকে আটক করা হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।

গুরুতর শারীরিক অসুস্থতার মধ্যেও তিনি চট্টগ্রামের কারাগারে ৩০ দিনেরও বেশি সময় আটক ছিলেন বলে অভিযোগ। তাঁর পরিবার ও সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা থেকে তিনি বঞ্চিত হয়েছেন এবং হেফাজতে থাকাকালে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।

অবশেষে তাঁর মৃত্যু কারাগারে আটক রাজনৈতিক কর্মীদের চিকিৎসা, নিরাপত্তা এবং আইনগত অধিকার নিয়ে নতুন করে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করেছে।

একজন বন্দি অপরাধী হোন বা বিচারাধীন—রাষ্ট্রের হেফাজতে থাকার সময় তাঁর জীবন ও শারীরিক নিরাপত্তার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। আদালতে দোষ প্রমাণের আগে কোনো নাগরিককে অপরাধী হিসেবে গণ্য করা আইনের মৌলিক নীতির পরিপন্থী।

আইন কি রাজনৈতিক দমনের হাতিয়ার হতে পারে?

সন্ত্রাস দমন বা রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য কঠোর আইন থাকা প্রয়োজন। কিন্তু কোনো আইনই রাজনৈতিক মত, দলীয় পরিচয় বা শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে নাগরিকদের নির্বিচারে আটক, নির্যাতন কিংবা চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত করার লাইসেন্স হতে পারে না।

বিশেষ করে যখন একই সময়ে প্রকৃত সন্ত্রাসী বা উগ্রপন্থী হিসেবে চিহ্নিত ব্যক্তিদের জামিনে মুক্তির ঘটনা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে, তখন রাজনৈতিক কর্মীদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের প্রয়োগের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও প্রমাণের মানদণ্ড আরও কঠোর হওয়া জরুরি।

আইনের শাসনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হলো—রাষ্ট্র তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের সঙ্গেও একই আইন, একই বিচারিক মানদণ্ড এবং একই মানবিক আচরণ বজায় রাখে কি না।

কারাগারে মৃত্যু মানেই কি তদন্তের দাবি নয়?

কোনো ব্যক্তি রাষ্ট্রের হেফাজতে থাকা অবস্থায় মারা গেলে বিষয়টি স্বাভাবিক মৃত্যু হিসেবে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকা উচিত নয়। বিশেষ করে যদি পরিবার নির্যাতন, চিকিৎসা না পাওয়া কিংবা অবহেলার অভিযোগ তোলে, তাহলে স্বাধীন ও বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত অপরিহার্য।

নুরুল ইসলামের মৃত্যুর ক্ষেত্রেও কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন:

  • তাঁর আটকের আইনগত ভিত্তি কী ছিল?
  • তাঁর বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ বা প্রমাণ কী ছিল?
  • কারাগারে তাঁর শারীরিক অবস্থার কী ধরনের চিকিৎসা দেওয়া হয়েছিল?
  • চিকিৎসার প্রয়োজন দেখা দিলে তাঁকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল কি না?
  • তাঁর মৃত্যুর কারণ কী ছিল?
  • হেফাজতে নির্যাতনের অভিযোগের স্বাধীন তদন্ত হয়েছে কি না?

এসব প্রশ্নের উত্তর আদালত, তদন্তকারী সংস্থা এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে স্বচ্ছভাবে পাওয়া প্রয়োজন।

ভিন্নমত দমন করে কোনো গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয় না

রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে কারাগারে পাঠানো, তাদের সংগঠন নিষিদ্ধ করা কিংবা রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে নাগরিক অধিকার সীমিত করা কোনো সুস্থ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার লক্ষণ নয়।

গণতন্ত্রের প্রকৃত শক্তি প্রকাশ পায় তখনই, যখন রাষ্ট্র তার বিরোধীদের অধিকারও রক্ষা করে। একজন রাজনৈতিক কর্মী সরকারের সমালোচক হতে পারেন, বিরোধী দলের সমর্থক হতে পারেন কিংবা কোনো নিষিদ্ধ রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগে অভিযুক্ত হতে পারেন—কিন্তু তবুও তাঁর ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার, আইনজীবীর সহায়তা পাওয়ার অধিকার, চিকিৎসা পাওয়ার অধিকার এবং মানবিক আচরণ পাওয়ার অধিকার অক্ষুণ্ণ থাকে।

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দায়িত্ব

রাজনৈতিক সহিংসতা, বিচারবহির্ভূত হত্যা, হেফাজতে মৃত্যু কিংবা নির্যাতনের অভিযোগ কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিষয় হিসেবে উপেক্ষা করা উচিত নয়।

জাতিসংঘ, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন এবং বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অংশীদারদের উচিত অভিযোগগুলো রাজনৈতিক পক্ষপাত ছাড়াই স্বাধীনভাবে পর্যবেক্ষণ করা এবং বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো।

কোনো রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা বা প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া হলেও তার অর্থ এই নয় যে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মৌলিক মানবাধিকার বাতিল হয়ে যাবে।

ন্যায়বিচারের প্রশ্নটি সবার জন্য

আজ যদি রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে একজন মানুষ বিনা বিচারে দীর্ঘদিন কারাগারে থাকেন, চিকিৎসা না পেয়ে মারা যান কিংবা নির্যাতনের শিকার হন এবং তার কোনো জবাবদিহি না থাকে, তাহলে আগামীকাল একই ব্যবস্থার শিকার হতে পারেন অন্য রাজনৈতিক মতের মানুষও।

রাষ্ট্রের হাতে সবচেয়ে বড় শক্তি হলো আইন। কিন্তু সেই আইন যখন নিরপেক্ষভাবে প্রয়োগ না হয়ে রাজনৈতিক প্রতিশোধের হাতিয়ারে পরিণত হয়, তখন আইন তার নৈতিক বৈধতা হারাতে শুরু করে।

নুরুল ইসলামের মৃত্যুর অভিযোগ তাই শুধু একজন রাজনৈতিক কর্মীর মৃত্যুর প্রশ্ন নয়। এটি বাংলাদেশের কারাগার, বিচারব্যবস্থা, আইন প্রয়োগ এবং রাজনৈতিক অধিকারের ভবিষ্যৎ নিয়ে একটি বৃহত্তর প্রশ্ন।

কারাগার প্রতিশোধের স্থান নয়; এটি আইনের অধীন একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান। সেখানে একজন বন্দির জীবন, স্বাস্থ্য ও মর্যাদা রক্ষা করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

এই দায়িত্বে ব্যর্থতার অভিযোগ উঠলে নীরবতা নয়—প্রয়োজন স্বচ্ছ তদন্ত, সত্য উদঘাটন এবং দায়ীদের জবাবদিহি।

বাংলাদেশে সত্যিকারের আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত করতে হলে একটি নীতি সবার জন্য সমান হতে হবে:

রাজনৈতিক পরিচয় যাই হোক, অপরাধ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত প্রত্যেক নাগরিক ন্যায়বিচার, মানবিক মর্যাদা ও আইনি সুরক্ষার অধিকারী।

More from the timeline

View all