রাজনৈতিক অস্থিরতার পরবর্তী বাস্তবতায় বাংলাদেশ যখন নতুন পরিস্থিতির মুখোমুখি, তখন ২০২৬ সালের জুন মাস বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির ব্যর্থতার এক কঠোর প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছে। ন্যায়বিচার, নিরাপত্তা এবং মানবাধিকার সংস্কারের যে প্রতিশ্রুতি জনগণকে দেওয়া হয়েছিল, তা বাস্তবে রূপ নিয়েছে সহিংসতা, দায়মুক্তি এবং প্রাতিষ্ঠানিক অবক্ষয়ের এক উদ্বেগজনক চিত্রে। হত্যা, ধর্ষণ, হামলা, চাঁদাবাজি, চুরি, গণপিটুনি এবং নানামুখী মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা অব্যাহত রয়েছে। সমালোচকদের মতে, নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পরিবর্তে সরকার রাজনৈতিক অবস্থান সুসংহত করতেই বেশি মনোযোগী। বিএনপি যে “পরিবর্তন”-এর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, জুন মাসের বাস্তবতা তার সম্পূর্ণ বিপরীত—একটি দেশ যেখানে আইনের শাসন দুর্বল হয়ে পড়ছে, সাধারণ মানুষ অনিরাপদ হয়ে উঠছে এবং ক্ষমতাসীনদের জবাবদিহিতা প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে।
রাজনৈতিক সহিংসতা ও ব্যাপক গ্রেপ্তার
হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (HRSS)-এর মাসিক পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, জুন ২০২৬ মোটেই শান্তিপূর্ণ ছিল না। মাসজুড়ে রাজনৈতিক সহিংসতার ৫৮টি ঘটনায় ৯ জন নিহত এবং ৩৪৬ জন আহত হন, যা মে মাসের তুলনায় উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শুধুমাত্র বিএনপির অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বেই ২১টি সংঘর্ষে ৩ জন নিহত এবং ১৪৬ জন আহত হন। এছাড়া জামায়াতে ইসলামী ও অন্যান্য রাজনৈতিক গোষ্ঠীর সংঘর্ষও সহিংসতার মাত্রা বাড়িয়েছে। চাঁদাবাজি, আধিপত্য বিস্তার এবং স্থানীয় প্রভাব প্রতিষ্ঠার লড়াইকে এসব ঘটনার অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। হামলার শিকার হয়েছে বাড়িঘর, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এবং রাজনৈতিক কার্যালয়। একই সময়ে অন্তত ৪,৭৭৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যার মধ্যে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সংখ্যাই বেশি বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। এ নিয়ে নির্বাচনী বিচার ও নির্বিচার গ্রেপ্তারের অভিযোগও উঠেছে।
জুন ২০২৬: মানবাধিকার পরিস্থিতির সারসংক্ষেপ
| মানবাধিকার লঙ্ঘনের ধরন | নথিভুক্ত ঘটনা | হতাহত |
|---|---|---|
| রাজনৈতিক সহিংসতা | ৫৮টি সংঘর্ষ | ৯ নিহত, ৩৪৬ আহত |
| গণপিটুনি ও বিচারবহির্ভূত সহিংসতা | ৬৩টি ঘটনা | ৩৩ নিহত, ৬৯ আহত |
| নারী নির্যাতন ও ধর্ষণ | ৩৫২ জন ভুক্তভোগী | ১০৬টি ধর্ষণ (৭৫ জন শিশু), ১৯টি গণধর্ষণ, ৫৭টি পারিবারিক সহিংসতাজনিত মৃত্যু |
| সংবাদমাধ্যমে হামলা | ৩৯টি ঘটনা | ৪৭ জন সাংবাদিক হামলা, হুমকি বা হয়রানির শিকার |
| জাতিগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা | ১২টি ঘটনা | ১২টি মন্দির ও ৭টি বাড়ি ভাঙচুর, একজন আদিবাসী নারী গণধর্ষণের শিকার |
গণপিটুনি ও আইনের শাসনের সংকট
এই সময়ে গণপিটুনির ঘটনাও উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। HRSS-এর তথ্যমতে, জুন মাসে ৬৩টি গণপিটুনির ঘটনায় ৩৩ জন নিহত এবং ৬৯ জন আহত হন। চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, ধর্ম অবমাননার অভিযোগ কিংবা ব্যক্তিগত বিরোধকে কেন্দ্র করে এসব সহিংসতার ঘটনা ঘটে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও রেহাই পাননি; ২৯টি পৃথক ঘটনায় অন্তত ৬৬ জন পুলিশ সদস্য হামলা বা আহত হওয়ার তথ্য উঠে এসেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রবণতা শুধু সামাজিক অস্থিরতার নয়, বরং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় রাষ্ট্রের দুর্বলতারও প্রতিফলন।
নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ
জুন মাসে নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতার চিত্র আরও উদ্বেগজনক হয়ে ওঠে। HRSS-এর তথ্য অনুযায়ী, ৩৫২ জন নারী ও কন্যাশিশু বিভিন্ন ধরনের সহিংসতার শিকার হন। এর মধ্যে ১০৬টি ধর্ষণের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে, যার ৭৫ জন ভুক্তভোগী শিশু। ১৯টি গণধর্ষণের ঘটনাও রেকর্ড করা হয়েছে। ধর্ষণের পর দুই কন্যাশিশুকে হত্যা করা হয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এছাড়া পারিবারিক সহিংসতায় ৫৭ জন নিহত, ৪৮ জন আহত এবং ৩৬ জন আত্মহত্যায় বাধ্য হয়েছেন বলে দাবি করা হয়েছে। যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন আরও ৯৪ জন। একই সময়ে ২৯১ জন শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে এবং ৫৪ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এই পরিসংখ্যানগুলো দেশের নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে অভিযান
সমালোচকদের অভিযোগ, অপরাধ দমনের তুলনায় রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা বেশি লক্ষ্য করা গেছে। জুন মাসে দেশব্যাপী ২৫৭টি অভিযানে অন্তত ৪,৭৭৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) ও বিভিন্ন জেলার পুলিশ একাধিক ব্লক রেইড পরিচালনা করে।
সরকার দাবি করেছে, এসব অভিযান নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের সদস্যদের বিরুদ্ধে পরিচালিত হয়েছে এবং এর মধ্যে ১,৫৫৯ জন রাজনৈতিকভাবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি গ্রেপ্তার হয়েছেন। তবে সমালোচকদের অভিযোগ, অভিযানের আওতা শুধু আওয়ামী লীগ নয়; জামায়াতে ইসলামীসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কর্মী এবং স্বতন্ত্র মত প্রকাশকারীদের বিরুদ্ধেও বিস্তৃত হয়েছে।
হেফাজতে মৃত্যু ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিয়ে প্রশ্ন
প্রতিবেদন অনুযায়ী, জুন মাসে পুলিশি অভিযান বা রাষ্ট্রের হেফাজতে অন্তত তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে একজন গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) হেফাজতে সন্দেহজনক পরিস্থিতিতে মারা যান বলে অভিযোগ রয়েছে। নির্বাচনের আগে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংস্কার এবং নির্যাতন বন্ধের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও, এসব ঘটনা সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
সংবাদমাধ্যম ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা
জুন মাসে সাংবাদিকদের ওপর হামলা ও হয়রানির ঘটনাও উদ্বেগের কারণ হয়ে ওঠে। ৩৯টি পৃথক ঘটনায় অন্তত ৪৭ জন সাংবাদিক শারীরিক হামলা, হুমকি বা হয়রানির শিকার হন বলে HRSS জানিয়েছে। গণপরিবহন ও স্থানীয় বাজারে চাঁদাবাজির মতো বিষয় নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন করতে গিয়ে অনেক সাংবাদিক হামলার শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন নিয়ে উদ্বেগ
একই সময়ে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন (এনএইচআরসি) আইন, ২০২৬-এর খসড়া নিয়েও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। বিশেষ করে, হিউম্যান রাইটস ওয়াচসহ বিভিন্ন সংস্থা আশঙ্কা প্রকাশ করেছে যে, প্রস্তাবিত আইনটি কমিশনের স্বাধীনতা সীমিত করতে পারে। সমালোচকদের মতে, আইনটি পাস হলে নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ স্বাধীনভাবে তদন্ত করার ক্ষমতা কমিশনের আর থাকবে না, যা জবাবদিহিতা ও মানবাধিকার সুরক্ষার ক্ষেত্রে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
উপসংহার
বর্তমান সরকার ক্ষমতায় এসেছিল মানবাধিকার রক্ষা, সুশাসন এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে। কিন্তু জুন ২০২৬-এর ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে এমন একটি বাস্তবতার চিত্র উঠে এসেছে, যেখানে একদিকে অপরাধ ও সহিংসতা অব্যাহত রয়েছে, অন্যদিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা, রাজনৈতিক গ্রেপ্তার, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং মানবাধিকার সুরক্ষা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্য অংশীদার, বিদেশি বিনিয়োগকারী এবং বৈশ্বিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর কাছে জুন ২০২৬-এর এই পরিস্থিতি বাংলাদেশে মানবাধিকার ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে আলোচনা ও মূল্যায়নের প্রয়োজনীয়তার ইঙ্গিত বহন করে।