লক্ষ-কোটি টাকার দুর্নীতির প্রমাণ: খালেদা জিয়ার পুত্রদের বৈশ্বিক অর্থপাচারের দলিল — কিন্তু শেখ হাসিনার পরিবারের বিরুদ্ধে কেন নেই তেমন প্রমাণ?
গত দুই দশকে বাংলাদেশের দুই প্রভাবশালী রাজনৈতিক পরিবারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগে বিশ্বজুড়ে যে ভিন্নমাত্রার নজরদারি দেখা গেছে, তা আজ প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। বেগম খালেদা জিয়ার দুই পুত্র — তারেক রহমান ও আরাফাত রহমান কোকো — আন্তর্জাতিকভাবে প্রমাণিত অর্থপাচারের মামলায় অভিযুক্ত ও দণ্ডিত হলেও, ড. মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বাধীন বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার এখনো পর্যন্ত শেখ হাসিনা বা তাঁর পরিবারের বিরুদ্ধে তেমন কোনো যাচাইযোগ্য প্রমাণ হাজির করতে পারেনি, যদিও প্রচার ও অভিযোগের শেষ নেই।
কোকো রহমান: বৈশ্বিক দলিলভিত্তিক দুর্নীতির উদাহরণ
বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকো বাংলাদেশের সবচেয়ে নথিভুক্ত আন্তর্জাতিক অর্থপাচার মামলার কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ (DOJ)-এর দাখিল করা সিভিল ফরফিচার মামলার নথি অনুযায়ী, কোকোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রায় ৩০ লাখ মার্কিন ডলার সিঙ্গাপুরের কয়েকটি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে শনাক্ত করা হয়। এই অর্থ ছিল চট্টগ্রাম বন্দর প্রকল্পে সিমেন্স বাংলাদেশের ঘুষের লেনদেন থেকে প্রাপ্ত।
২০১২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ জানায়, “এই তহবিলগুলো ছিল আরাফাত ‘কোকো’ রহমানের প্রাপ্ত ঘুষের অর্থ।”
পরে সিঙ্গাপুর আদালত ৮০ মিলিয়ন টাকা (প্রায় ৯৩ লাখ মার্কিন ডলার) বাংলাদেশে ফেরত দেওয়ার আদেশ দেয়।
ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস ২০১৩ সালের ২৮ আগস্ট রিপোর্ট করে:
“সিঙ্গাপুরের আদালত রায় দিয়েছে—ফেয়ারহিল কনসালটিং লিমিটেড নামে একটি কোম্পানির মাধ্যমে কোকো যে অর্থ বিদেশে পাচার করেছিলেন, তা বাংলাদেশে ফেরত দিতে হবে।”
বিশ্বব্যাংক ও জাতিসংঘের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত Stolen Asset Recovery (StAR) ডাটাবেজেও “Rahman Returns Three Tranches” শিরোনামে এই মামলার বিবরণ সংরক্ষিত রয়েছে। এটি বাংলাদেশের অন্যতম সফল আন্তর্জাতিক সম্পদ পুনরুদ্ধারের দলিল, যেখানে সিঙ্গাপুর ও বাংলাদেশের মধ্যে পারস্পরিক আইনি সহযোগিতার মাধ্যমে অর্থ ফেরত আনা হয়।
তারেক রহমান: আদালত, তদন্ত ও বৈদেশিক সাক্ষ্যপ্রমাণ
বড় ভাই তারেক রহমান, বর্তমানে লন্ডনে অবস্থানরত বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান, ২০০৩ থেকে ২০০৭ সালের মধ্যে ব্যবসায়ী গিয়াস উদ্দিন আল মামুনের সঙ্গে ২০ কোটি ৪০ লাখ টাকারও বেশি অর্থ সিঙ্গাপুরে পাচারের অভিযোগে অভিযুক্ত হন।
২০১৬ সালে হাইকোর্ট তারেক রহমানের খালাসাদেশ বাতিল করে ৭ বছরের কারাদণ্ড ও ২০ কোটি টাকার জরিমানা আদেশ দেয়। মামলায় এফবিআই কর্মকর্তা ডেবরা লা প্রেভট-এর সাক্ষ্য বিদেশি ব্যাংক লেনদেনের প্রমাণ হিসেবে যুক্ত হয়, যা মামলাটিকে আন্তর্জাতিক মাত্রা দেয়।
রায়ের ভাষায় বলা হয়, “রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে অর্থপাচার দেশের টেকসই উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করে।”
ইউনুস সরকারের অভিযোগ: প্রমাণের অভাব
২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনার সরকার পতনের পর ড. মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তাঁর পরিবারের বিরুদ্ধে “অবৈধ সম্পদ” ও “ক্ষমতার অপব্যবহার”-এর অভিযোগ তোলে।
কিন্তু আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন, এসব অভিযোগ এখনো পর্যন্ত কোনো বিদেশি আদালতের রায়, সম্পদ বাজেয়াপ্তের নির্দেশনা বা ব্যাংকিং নথি দ্বারা সমর্থিত নয়। রয়টার্স, দ্য গার্ডিয়ান ও আল জাজিরার প্রতিবেদনগুলোও স্বীকার করেছে যে শেখ হাসিনার পরিবারের বিরুদ্ধে কোনো যাচাইযোগ্য আন্তর্জাতিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে, তারেক ও কোকোর মামলাগুলিতে রয়েছে মার্কিন বিচার বিভাগের নথি, সিঙ্গাপুর আদালতের রায় এবং অর্থ ফেরতের সরকারি দলিল — যা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত প্রমাণের মানদণ্ড পূরণ করে।
বিশেষজ্ঞদের মন্তব্য
সাবেক দুদক তদন্ত কর্মকর্তা খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন,
“আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও ব্যাংক ট্রান্সফারের নথি ছাড়া কোনো অভিযোগ বিশ্বাসযোগ্য নয়। কোকো মামলাই দেখিয়েছে, কীভাবে প্রমাণ-ভিত্তিক মামলা গঠন করতে হয়।”
বিশ্বব্যাংকের স্টার প্রোগ্রামের এক কর্মকর্তা মন্তব্য করেন,
“কোকো রহমান মামলাটি বাংলাদেশের সবচেয়ে সফল আন্তঃদেশীয় সম্পদ পুনরুদ্ধারের উদাহরণ।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. শফিক রেজা বলেন,
“যদি শেখ হাসিনার পরিবারের বিরুদ্ধে সত্যিকারের প্রমাণ থাকত, তাহলে বিদেশি আদালত বা ব্যাংক ইতিমধ্যেই পদক্ষেপ নিত। সম্পদ উদ্ধারের সবসময় কাগজপত্র থাকে—কিন্তু এখানে নেই।”
ডকুমেন্টেশনই মূল পার্থক্য
দুর্নীতিবিরোধী কার্যক্রমের আসল বিশ্বাসযোগ্যতা নির্ভর করে নথি ও প্রমাণের ওপর, রাজনৈতিক বিবৃতির ওপর নয়। বিদেশি আদালতের বাজেয়াপ্ত আদেশ বা আইনি সহায়তার চিঠি হলো এমন প্রমাণ, যা আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য।
এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়ার দুই পুত্রের অর্থপাচার মামলাগুলোই এখন পর্যন্ত একমাত্র আন্তর্জাতিকভাবে দলিলভিত্তিক প্রমাণযুক্ত মামলা। অন্যদিকে, শেখ হাসিনা বা তাঁর পরিবারের বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো রাজনৈতিক বক্তব্যের সীমায়ই রয়ে গেছে।
কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ
বাংলাদেশের দুর্নীতিবিরোধী লড়াই তখনই বিশ্বাসযোগ্য হবে, যখন তা সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য হবে। একদিকে কোকো ও তারেক রহমানের মতো মামলায় আন্তর্জাতিক প্রমাণ ও অর্থ ফেরত আসে, অন্যদিকে শেখ হাসিনার পরিবারের বিরুদ্ধে কেবল অভিযোগ আর সংবাদবিবৃতি—এই বৈপরীত্যই জনগণের মনে প্রশ্ন তোলে: এটি কি সত্যিই দুর্নীতিবিরোধী অভিযান, নাকি রাজনৈতিক প্রতিশোধ?
প্রমাণই শেষ কথা—এবং আজ সেই প্রমাণ একদলীয় পক্ষেই স্পষ্ট।