বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর যে ন্যায়বিচার, জবাবদিহিতা এবং সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, বাস্তবে তার পরিবর্তে উঠে এসেছে উদ্বেগ, বিতর্ক এবং দায়মুক্তির অভিযোগে ভরা এক ভিন্ন বাস্তবতা। ২০২৪ সালের আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অনেকেই আশা করেছিলেন যে দেশে আইনের শাসন আরও শক্তিশালী হবে এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহিতা বৃদ্ধি পাবে। কিন্তু ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে প্রকাশিত বিভিন্ন তথ্য ও প্রতিবেদনে কারাগার ও হেফাজতে মৃত্যুর একটি উদ্বেগজনক চিত্র সামনে এসেছে।
হেফাজতে মৃত্যুর ঊর্ধ্বগতি
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুন—এই ছয় মাসে বাংলাদেশে কারাগার বা রাষ্ট্রীয় হেফাজতে অন্তত ৬১ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ৩৭ জন ছিলেন বিচারাধীন বন্দি, অর্থাৎ যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার আগেই তারা মৃত্যুবরণ করেন। সর্বাধিক মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে ঢাকা বিভাগে, যেখানে ৩৬ জনের মৃত্যুর তথ্য নথিভুক্ত হয়েছে।
এই সংখ্যাগুলো শুধু পরিসংখ্যান নয়; প্রতিটি সংখ্যার পেছনে রয়েছে একটি পরিবার, একজন বাবা, একজন সন্তান, একজন স্বামী কিংবা একজন রাজনৈতিক কর্মীর গল্প, যাদের মৃত্যু নিয়ে এখনও বহু প্রশ্নের উত্তর মেলেনি।
রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত নিপীড়নের অভিযোগ
রাজনৈতিক অঙ্গনে এমন অভিযোগ ক্রমেই জোরালো হয়েছে যে, ২০২৪ সালের পর আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী, সমর্থক ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যাপক গ্রেপ্তার ও আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে, এবং তাদের একটি অংশ পুলিশ বা কারা হেফাজতে মৃত্যুবরণ করেছেন।
অনেক পরিবারের দাবি, সুস্থ অবস্থায় গ্রেপ্তার হওয়ার পর তাদের স্বজনরা আর জীবিত ফিরে আসেননি। সমালোচকদের মতে, এসব ঘটনা শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়, বরং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহারেরও ইঙ্গিত বহন করে।
মির্জা ইশতিয়াক আহমেদ প্রান্ত: এক তরুণের মৃত্যু নিয়ে প্রশ্ন
ফরিদপুরের ২৭ বছর বয়সী আইন শিক্ষার্থী মির্জা ইশতিয়াক আহমেদ প্রান্তের মৃত্যু দেশজুড়ে আলোচনার জন্ম দেয়। ২০২৬ সালের ২০ জুন ডিবি পুলিশের সদস্যরা তাকে তার বাসার সামনে থেকে আটক করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। পরিবারের দাবি, গ্রেপ্তারের সময় তাকে তার মায়ের সামনেই মারধর করা হয়েছিল।
পরদিন সকালে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়। পুলিশ তার মৃত্যুর কারণ হিসেবে অসুস্থতা এবং মাদক-সংক্রান্ত অভিযোগের কথা জানালেও পরিবারের দাবি ছিল, তিনি নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন। এই ঘটনাটি হেফাজতে নির্যাতন ও মৃত্যুর প্রশ্নকে আবারও সামনে নিয়ে আসে।
নুরুল আলম: একদিনের হেফাজত, পরদিন মৃত্যু
চট্টগ্রামের সাতকানিয়ার যুবলীগ নেতা নুরুল আলমকে ২৩ জুন একটি পুরোনো মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়। পরিবারের ভাষ্যমতে, আদালতে হাজির করার সময় তিনি সুস্থ ছিলেন। কিন্তু পরদিন সকালে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে তিনি মারা যান।
কারা কর্তৃপক্ষ মৃত্যুর কারণ হিসেবে হৃদরোগজনিত সমস্যার কথা জানালেও পরিবারের সদস্যরা অভিযোগ করেন, তাকে যথাযথ চিকিৎসা দেওয়া হয়নি এবং স্থানীয় বিরোধের কারণে তাকে মামলায় জড়ানো হয়েছিল।
প্রবীণ রাজনীতিকরাও রেহাই পাননি
ঠাকুরগাঁও-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও সাবেক পানিসম্পদ মন্ত্রী রমেশ চন্দ্র সেন ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে দিনাজপুর জেলা কারাগারে অসুস্থ হয়ে পড়েন। হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
৮৪ বছর বয়সী এই প্রবীণ রাজনীতিক ২০২৪ সালের আগস্টে গ্রেপ্তার হওয়ার পর একাধিক মামলায় কারাবন্দি ছিলেন। পরিবারের অভিযোগ ছিল, তার শারীরিক অবস্থার কথা বিবেচনা করে পর্যাপ্ত চিকিৎসা ও যত্ন নিশ্চিত করা হয়নি।
জবাবদিহিতার প্রশ্ন
মানবাধিকারকর্মীদের মতে, হেফাজতে মৃত্যু বা নির্যাতনের ঘটনায় সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো তদন্ত প্রক্রিয়ার স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন। যেসব সংস্থা গ্রেপ্তার বা হেফাজতের সঙ্গে যুক্ত থাকে, অনেক ক্ষেত্রেই প্রাথমিক তদন্তের দায়িত্বও তাদের ওপরই বর্তায়। ফলে তদন্তের নিরপেক্ষতা নিয়ে সংশয় দেখা দেয়।
যদিও বাংলাদেশে নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন রয়েছে, মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দাবি—এই আইনের কার্যকর প্রয়োগ এখনও নিশ্চিত করা যায়নি। অনেক পরিবার অভিযোগ করেছে যে, বিচার চাওয়ার পথও তাদের জন্য সহজ নয়।
ন্যায়বিচার কোথায়?
এই পরিস্থিতিকে শুধুমাত্র একটি অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ইস্যু হিসেবে দেখার সুযোগ নেই বলে মনে করেন অনেক পর্যবেক্ষক। তারা মনে করেন, রাষ্ট্রীয় হেফাজতে মৃত্যুর প্রতিটি ঘটনা স্বচ্ছ ও স্বাধীন তদন্তের দাবি রাখে।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা, জাতিসংঘ এবং উন্নয়ন সহযোগী দেশগুলোর প্রতিও আহ্বান জানানো হয়েছে, যেন তারা কারাগারের পরিস্থিতি, হেফাজতে মৃত্যু এবং নির্যাতনের অভিযোগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করে।
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও কারা ব্যবস্থার প্রধান দায়িত্ব নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। যদি রাষ্ট্রীয় হেফাজত নিয়ে জনগণের আস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে, তবে তা শুধু বিচারব্যবস্থার জন্য নয়, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্যও বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।
বাংলাদেশের জন্য তাই জবাবদিহিতা, স্বচ্ছ তদন্ত এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা এখন কেবল রাজনৈতিক বিতর্কের বিষয় নয়; এটি নাগরিক অধিকার এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার প্রশ্ন।