Menu
Back to timeline

মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়ার অপচেষ্টা: জুলাই-পরবর্তী বাংলাদেশে ছাত্রলীগের শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন কীভাবে ধ্বংসের মুখে

মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়ার অপচেষ্টা: জুলাই-পরবর্তী বাংলাদেশে ছাত্রলীগের শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন কীভাবে ধ্বংসের মুখে

আগস্ট ২০২৪-এর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের (বাংলাদেশ ছাত্রলীগ) সঙ্গে সম্পৃক্ত হাজারো শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। অনেকের দাবি, প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তা, ক্যাম্পাসে সহিংসতা এবং রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে তারা ক্লাস, পরীক্ষা ও স্বাভাবিক শিক্ষাজীবন থেকে কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন।

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনকে অনেকেই "ছাত্র আন্দোলনের বিজয়" হিসেবে আখ্যায়িত করলেও, এর পরবর্তী বাস্তবতা দেশের বহু শিক্ষার্থীর জন্য ভিন্ন চিত্র তুলে ধরেছে। সমালোচকদের মতে, বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার অভিযোগে হাজারো শিক্ষার্থী বিচারিক প্রক্রিয়া ছাড়াই সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন। তাদের বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধ হামলা, প্রশাসনিক শাস্তি, গ্রেপ্তার, ক্যাম্পাসে প্রবেশে বাধা এবং অব্যাহত ভয়ভীতির পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে।

তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এটি বিচারের প্রক্রিয়া নয়; বরং রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে এক ধরনের সমষ্টিগত শাস্তি, যা একটি পুরো প্রজন্মের শিক্ষা ও ভবিষ্যৎকে অনিশ্চয়তার মধ্যে ঠেলে দিয়েছে।

ক্যাম্পাসজুড়ে ভয়ের পরিবেশ

শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর বাংলাদেশ ছাত্রলীগকে ২০২৪ সালের অক্টোবরে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের আওতায় নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। এরপর থেকেই সংগঠনের নেতা-কর্মী, সমর্থক কিংবা অতীতে সম্পৃক্ত ছিলেন—এমন বহু শিক্ষার্থী নিজেদের বিশ্ববিদ্যালয়ে কার্যত অবাঞ্ছিত হয়ে পড়েন।

বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, পরীক্ষা দিতে বা ক্লাসে অংশ নিতে গিয়ে অনেক শিক্ষার্থী হামলার শিকার হয়েছেন। বিবিসি বাংলায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এক শিক্ষার্থী, যিনি নিজের পরিচয় গোপন রেখেছেন, জানান যে পরীক্ষায় অংশ নিতে গেলে তার ওপর হামলা চালানো হয় এবং পরে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। তিনি ২৭ দিন কারাভোগের পর মুক্তি পেলেও এখনও বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরতে পারেননি। তার শিক্ষাজীবন দীর্ঘ সময় ধরে স্থবির হয়ে রয়েছে।

ব্যাপক বহিষ্কার ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা

বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগ-সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে ব্যাপক প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে জুলাই-সংক্রান্ত ঘটনায় অভিযুক্ত করে ৪০৩ জন শিক্ষার্থীকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়, যাদের অধিকাংশই ছাত্রলীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে উল্লেখ করা হয়।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে শতাধিক শিক্ষার্থীকে বহিষ্কার করা হয়; বিভিন্ন সূত্রে এই সংখ্যা প্রায় ২৮৯ পর্যন্ত উল্লেখ করা হয়েছে। একই ধরনের বহিষ্কার ও সাময়িক বরখাস্তের ঘটনা শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের আরও বিভিন্ন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ঘটেছে। অনেক শিক্ষার্থীকে ক্যাম্পাসে প্রবেশে বাধা দেওয়া হয়েছে, আবার কারও সনদপত্র আটকে রাখা বা বাতিল করার অভিযোগও উঠেছে।

নিরাপত্তাহীনতার কারণে শিক্ষাজীবন থেকে বিচ্ছিন্ন

অনেক শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে কোনো আনুষ্ঠানিক মামলা বা শাস্তিমূলক সিদ্ধান্ত না থাকলেও তারা নিরাপত্তাহীনতার কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরতে পারছেন না। ঢাকা, রাজশাহী, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভাগীয় ও হল প্রশাসনের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে যে তারা শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে।

অনেক ক্ষেত্রে পরীক্ষা দেওয়ার অনুমতি চাইলে শিক্ষার্থীদের জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে বিশ্ববিদ্যালয় তাদের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিতে পারবে না। ফলে তারা বাধ্য হয়ে ক্যাম্পাস থেকে দূরে অবস্থান করছেন।

সমালোচকদের মতে, এটি এক ধরনের "অনানুষ্ঠানিক বহিষ্কার", যেখানে প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তা কার্যত ক্যাম্পাসে গোষ্ঠীগত আধিপত্যকে বৈধতা দিয়েছে।

আতঙ্ক, হামলা ও গ্রেপ্তারের অভিযোগ

বিভিন্ন স্থানে পরীক্ষাকেন্দ্রে হামলা, পরীক্ষার খাতা বাতিল, পরীক্ষা চলাকালে শিক্ষার্থী আটক এবং শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগও সামনে এসেছে। অনেকের দাবি, শুধুমাত্র রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে তাদের শিক্ষাজীবন থমকে গেছে।

পর্যবেক্ষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে ছাত্রলীগ-সংশ্লিষ্ট বহু শিক্ষার্থী তিন ধরনের সংকটের মুখোমুখি—

  • ক্যাম্পাসে প্রবেশ করলেই হামলার আশঙ্কা;
  • বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগ ও আবাসিক হলে সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বয়কট;
  • কোনো আনুষ্ঠানিক অভিযোগ না থাকলেও গ্রেপ্তার, হয়রানি বা সহিংসতার ভয়ে শিক্ষাজীবন থেকে দূরে থাকা।

তাদের মতে, এসব ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়; বরং একটি ধারাবাহিক প্রবণতার ইঙ্গিত দেয়।

শিক্ষা থেকে বঞ্চিত একটি প্রজন্ম

সমালোচকদের মতে, একটি দেশের ভবিষ্যৎ তার শিক্ষার্থীদের ওপর নির্ভর করে। কিন্তু রাজনৈতিক বিভাজনের কারণে যদি হাজার হাজার শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন, তবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে শুধু ব্যক্তিগত জীবন নয়, পুরো জাতির মানবসম্পদ।

তাদের দাবি, দীর্ঘদিন শিক্ষা থেকে দূরে থাকার ফলে অনেক শিক্ষার্থী মানসিক সংকট, হতাশা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন। কেউ কেউ দেশ ছাড়ার চিন্তা করছেন, আবার অনেকে উচ্চশিক্ষা ও কর্মজীবনের সুযোগ হারানোর আশঙ্কায় রয়েছেন।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড

মানবাধিকার সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন আন্তর্জাতিক নীতিমালায় শিক্ষা মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃত। সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণাপত্রের (UDHR) ২৬ নম্বর অনুচ্ছেদে যোগ্যতার ভিত্তিতে উচ্চশিক্ষায় সমান প্রবেশাধিকারের কথা বলা হয়েছে। একইভাবে, আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার বিষয়ক সনদ (ICESCR)-এ রাজনৈতিক মতাদর্শের ভিত্তিতে শিক্ষাক্ষেত্রে বৈষম্যকে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে।

সমালোচকদের মতে, যদি কোনো শিক্ষার্থী কেবল রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হন, তবে তা ন্যায়বিচার, আইনের শাসন এবং সমান অধিকারের মৌলিক নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

উপসংহার

বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো হওয়া উচিত জ্ঞানচর্চা, মতবিনিময় এবং মুক্ত চিন্তার কেন্দ্র। রাজনৈতিক মতপার্থক্যের কারণে যদি কোনো শিক্ষার্থী ক্যাম্পাসে প্রবেশ করতে না পারেন, পরীক্ষায় অংশ নিতে না পারেন বা নিরাপত্তাহীনতার কারণে শিক্ষাজীবন ছেড়ে দিতে বাধ্য হন, তবে তা শুধু ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়—রাষ্ট্রের ভবিষ্যতের জন্যও গভীর উদ্বেগের বিষয়।

সমালোচকদের মতে, টেকসই গণতন্ত্র ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হলে রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে প্রত্যেক শিক্ষার্থীর শিক্ষা গ্রহণের অধিকার, ব্যক্তিগত নিরাপত্তা এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা অপরিহার্য।

More from the timeline

View all