বিচারের আগেই মৃত্যু: ছয় মাসে কারাগারে প্রাণ হারিয়েছেন ৩৭ বিচারাধীন বন্দি ও ২৪ দণ্ডপ্রাপ্ত কয়েদি
২০২৬ সালের জুলাই। বাংলাদেশ বর্তমানে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের অধীনে পরিচালিত হচ্ছে। এ বছরের প্রথম ছয় মাসেই দেশের বিভিন্ন কারাগারে মোট ৬১ জন বন্দির মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছে আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)। এর মধ্যে ৩৭ জন ছিলেন বিচারাধীন বন্দি—অর্থাৎ যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলেও আদালতে তাদের অপরাধ এখনও প্রমাণিত হয়নি এবং আইন অনুযায়ী তারা তখনও নির্দোষ হিসেবে বিবেচিত ছিলেন। কিন্তু বিচার শেষ হওয়ার আগেই তারা রাষ্ট্রের হেফাজত থেকে জীবিত নয়, লাশ হয়ে বেরিয়ে এসেছেন।
আসকের তথ্য অনুযায়ী, শুধু ঢাকা বিভাগেই কারাগারে মৃত্যুর সংখ্যা ৩৬। এর মধ্যে ১৯ জন ছিলেন দণ্ডপ্রাপ্ত বন্দি এবং ১৭ জন বিচারাধীন। এই পরিসংখ্যান অনেকের কাছেই ২০০১ থেকে ২০০৬ সালের সময়কালে কারাগারে মৃত্যুর ঘটনাগুলোর স্মৃতি ফিরিয়ে আনছে।
এই পরিস্থিতি শুধুমাত্র মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব ও জবাবদিহিতার প্রশ্নও সামনে নিয়ে আসে। একজন বিচারাধীন বন্দি সম্পূর্ণভাবে রাষ্ট্রের হেফাজতে থাকেন এবং তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের ওপরই বর্তায়। বিচার সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত তার জীবন ও নিরাপত্তা রক্ষার সাংবিধানিক দায় রাষ্ট্র এড়াতে পারে না।
কিন্তু বাস্তবে ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, রংপুর, সিলেট, বরিশাল এবং ময়মনসিংহ—প্রায় সব বিভাগ থেকেই বিচারাধীন বন্দিদের মৃত্যুর খবর এসেছে। সমালোচকদের মতে, এই ঘটনাগুলো এমন এক উদ্বেগজনক বার্তা দিচ্ছে যে, একজন ব্যক্তি শেষ পর্যন্ত দোষী সাব্যস্ত হবেন নাকি নির্দোষ প্রমাণিত হবেন, সেটি আর মুখ্য বিষয় নয়; বরং রাষ্ট্রের হেফাজতে তার বেঁচে ফেরাটাই অনিশ্চিত হয়ে উঠছে।
তাদের দাবি, ন্যায়বিচার, মানবিকতা এবং আইনের শাসনের কথা বলা হলেও, যদি একজন মানুষ তার মামলার রায় হওয়ার আগেই কারাগারে প্রাণ হারান, তাহলে সেই প্রতিশ্রুতিগুলো কার্যত অর্থহীন হয়ে পড়ে।
অন্যদিকে, ২৪ জন দণ্ডপ্রাপ্ত বন্দির মৃত্যুও সমানভাবে গুরুতর প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। আদালতের রায়ে কারাদণ্ড হতে পারে, কিন্তু সেটি কখনোই রাষ্ট্রকে কোনো ব্যক্তির জীবন কেড়ে নেওয়ার অনুমতি দেয় না। তবে ৩৭ জন বিচারাধীন বন্দির মৃত্যু বিশেষভাবে উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে, কারণ তারা এমন মানুষ ছিলেন যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলেও কোনো আদালত এখনও তাদের অপরাধ প্রমাণ করেনি।
এসব মৃত্যুর পেছনে নির্যাতন, সহিংসতা, চিকিৎসা অবহেলা নাকি অন্য কোনো কারণ দায়ী—সে বিষয়ে এখনও বহু প্রশ্নের উত্তর মেলেনি। সমালোচকদের অভিযোগ, সরকার এ বিষয়ে পর্যাপ্ত ব্যাখ্যা কিংবা স্বচ্ছ তদন্ত নিশ্চিত করতে পারেনি।
তাদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি ২০০১-২০০৬ সময়কালে কারাগারের পরিবেশ ও বন্দি মৃত্যুকে ঘিরে সৃষ্টি হওয়া বিতর্কগুলোরই পুনরাবৃত্তি। একই সঙ্গে তারা অভিযোগ করছেন, জবাবদিহিতা ও স্বাধীন তদন্ত নিশ্চিত করতে রাষ্ট্র ব্যর্থ হয়েছে।
সমালোচকদের ভাষায়, ইতিহাস যেন কেবল পুনরাবৃত্তিই হচ্ছে না; বরং আরও গভীর নীরবতা ও অনিশ্চয়তার আড়ালে সেই পুনরাবৃত্তি আরও উদ্বেগজনক রূপ নিচ্ছে।