Menu
Back to timeline

বাংলাদেশের সার সংকট

বাংলাদেশের সার সংকট

বিএনপির রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা ও অব্যবস্থাপনায় কি খাদ্যনিরাপত্তা হুমকির মুখে?

সরকার বলছে দেশে সারের কোনো ঘাটতি নেই। কিন্তু মাঠের বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা।

রাজশাহী থেকে কুড়িগ্রাম—দেশের বিভিন্ন এলাকায় হাজার হাজার কৃষক সার পাওয়ার দাবিতে মহাসড়ক অবরোধ করছেন। অন্যদিকে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, জাতীয় পর্যায়ে পর্যাপ্ত সার মজুত রয়েছে।

এই পরস্পরবিরোধী চিত্র একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে নিয়ে এসেছে—সমস্যা কি সত্যিই সারের জাতীয় ঘাটতি, নাকি সরকারি ব্যবস্থাপনা, সরবরাহব্যবস্থা ও স্থানীয় পর্যায়ের অনিয়মের কারণে কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়েছে?

কৃষকের অভিযোগ, সরকারি দামে সার পাওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে ডিলারদের কাছে সার মিলছে না। কোথাও গুদাম বন্ধ, কোথাও বরাদ্দ থাকার পরও সরবরাহ নেই, আবার খোলা বাজারে একই সার অতিরিক্ত দামে বিক্রি হচ্ছে।

ফলে কাগজে-কলমে পর্যাপ্ত মজুত থাকলেও মাঠে কৃষককে সার কিনতে হচ্ছে বেশি দামে কিংবা ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে।

এ ধরনের পরিস্থিতি শুধু কৃষকের দুর্ভোগ বাড়ায় না; এটি সরকারের বাজার নিয়ন্ত্রণ, প্রশাসনিক সক্ষমতা এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত সরবরাহব্যবস্থা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করে।

কৃত্রিম সংকটের চিত্র কোথায়?

কৃষি মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন—BCIC-এর তথ্য অনুযায়ী, আগস্টের শেষ দিকে ইউরিয়া, টিএসপি, ডিএপি ও এমওপির জাতীয় মজুত প্রায় ১৩ থেকে ১৬.৫ লাখ টনের মধ্যে ছিল। জুলাই–সেপ্টেম্বর মৌসুমে চাহিদা ছিল প্রায় ১৩.২১ লাখ টন।

অর্থাৎ জাতীয় পর্যায়ে মজুত পুরোপুরি শূন্য হয়ে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি ছিল না।

কিন্তু বাস্তব সংকট দেখা দিয়েছে বিতরণব্যবস্থার স্তরে।

কৃষকদের অভিযোগ অনুযায়ী, সরকারি নির্ধারিত মূল্যের তুলনায় খোলা বাজারে প্রতি ৫০ কেজি বস্তায় ৩০০ থেকে ৭০০ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত দাম নেওয়া হচ্ছে।

সরকারি হিসাবে ইউরিয়ার নির্ধারিত মূল্য প্রতি বস্তা ১,৩৫০ টাকা হলেও কোথাও কোথাও তা ১,৬৫০ থেকে ২,১৫০ টাকা পর্যন্ত বিক্রির অভিযোগ রয়েছে। একই ধরনের অভিযোগ রয়েছে টিএসপি ও ডিএপি নিয়েও।

প্রশ্ন হলো—সরকারি গুদামে সার থাকলে কৃষকের কাছে তা পৌঁছাচ্ছে না কেন?


ডিলারদের বিরুদ্ধে কৃত্রিম সংকট তৈরির অভিযোগ

সরকারি ব্যবস্থায় BCIC-এর অনুমোদিত ডিলাররা নির্দিষ্ট বরাদ্দ পান এবং সরকারি নির্ধারিত মূল্যে কৃষকদের কাছে সার বিক্রি করার কথা।

কিন্তু বিভিন্ন এলাকা থেকে পাওয়া অভিযোগে বলা হচ্ছে, কিছু ডিলার বরাদ্দকৃত সার সময়মতো উত্তোলন করছেন না, আবার কেউ কেউ কৃষকদের কাছে সরকারি দামে না দিয়ে খুচরা বিক্রেতা কিংবা কালোবাজারে সরবরাহ করছেন।

প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, দেশের প্রায় ১০ হাজার ডিলারের মধ্যে আনুমানিক ২,৩০০ ডিলারের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ শনাক্ত হয়েছে বলে মন্ত্রণালয় সূত্রে দাবি করা হয়েছে।

কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারীতে ২৩ আগস্ট দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পর ২০০-এর বেশি কৃষক একটি গুদাম খুলে প্রায় ১০ হাজার কেজি ইউরিয়া নিয়ে যাওয়ার ঘটনায় পরিস্থিতির ভয়াবহতা প্রকাশ পেয়েছে বলে লেখাটিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

এরপর রৌমারী ও নাগেশ্বরীতেও কৃষকদের বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধের ঘটনা ঘটে।

কৃষকের অভিযোগের সারমর্ম খুবই সরল—

টাকা বেশি দিলে সার আছে, সরকারি দামে চাইলে সার নেই।

দুপচাঁচিয়ার উনহাট গ্রামের কৃষক মিজানুর রহমানের বক্তব্য অনুযায়ী, অতিরিক্ত অর্থ দিতে পারলে সার পাওয়া যায়; না হলে পাওয়া যায় না।

লালমনিরহাটের কালীগঞ্জের কৃষক লতিফ উদ্দিনেরও অভিযোগ, ১০ বিঘা আমন ধানের জন্য তাঁর পাঁচ বস্তা সার প্রয়োজন হলেও ডিলার তাঁকে দিয়েছেন মাত্র এক বস্তা। পরে প্রতি বস্তায় অতিরিক্ত ৩৫০ টাকা দিয়ে খোলা বাজার থেকে সার কিনতে হয়েছে।

এসব অভিযোগ সত্য হলে এটি কেবল বাজারব্যবস্থার বিচ্যুতি নয়; এটি ভর্তুকিযুক্ত কৃষি উপকরণ নিয়ে একটি সম্ভাব্য সিন্ডিকেট-নির্ভর বাণিজ্যের ইঙ্গিত।


কারা লাভবান হচ্ছে?

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এখানেই।

কৃষক যখন সরকারি মূল্যে সার পাচ্ছেন না, তখন অতিরিক্ত দামে কারা তা বিক্রি করছে?

লেখাটিতে অভিযোগ করা হয়েছে, স্থানীয় পর্যায়ে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী কিছু ডিলার ও সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠী এই পরিস্থিতি থেকে লাভবান হচ্ছে। তাদের কারও কারও রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা রয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে।

সরকার কয়েকটি ডিলারের লাইসেন্স স্থগিত এবং কিছু জরিমানা করেছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এত বড় অভিযোগের পরও কেন সংকট পুরোপুরি বন্ধ হচ্ছে না?

যদি নিয়মিত নজরদারি না থাকে, যদি গুদামের মজুত ও বিতরণব্যবস্থা স্বচ্ছ না হয়, যদি অনিয়মের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তাহলে শুধু কয়েকটি লাইসেন্স বাতিল করে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।

কৃষকরা যখন রাস্তায় নামেন, কর্মকর্তারা গিয়ে আশ্বাস দেন। কিন্তু যদি মূল সরবরাহব্যবস্থার অনিয়ম অক্ষুণ্ন থাকে, তাহলে সাময়িক আশ্বাস কোনো স্থায়ী সমাধান দিতে পারে না।


এটি শুধু সারের সমস্যা নয়—এটি শাসনব্যবস্থার সমস্যা

বাংলাদেশের কৃষি অর্থনীতি শুধু কৃষকের ব্যক্তিগত আয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। খাদ্য উৎপাদন, বাজারমূল্য, গ্রামীণ কর্মসংস্থান এবং জাতীয় খাদ্যনিরাপত্তা—সবকিছুর সঙ্গে সার সরবরাহ সরাসরি যুক্ত।

আর এখানেই সংকটের গভীরতা।

প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫–২৬ অর্থবছরে দেশের অভ্যন্তরীণ সার উৎপাদন হয়েছে মাত্র ১১.০৬ লাখ টন, যেখানে মোট চাহিদা প্রায় ৬৬ লাখ টন। গ্যাস সংকটের কারণে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন সার কারখানাগুলোর বড় অংশ বন্ধ বা সীমিত উৎপাদনে রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

ফলে আমদানিনির্ভরতা ৭০ শতাংশের বেশি হয়ে উঠেছে।

এটি বাংলাদেশের কৃষি ও খাদ্যনিরাপত্তির জন্য নিজেই একটি বড় ঝুঁকি।

মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা, আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্যবৃদ্ধি কিংবা কোনো দেশের রপ্তানি সীমাবদ্ধতা—যেকোনো একটি কারণ বাংলাদেশের সার সরবরাহে বড় ধাক্কা দিতে পারে।

কিন্তু আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির চেয়েও তাৎক্ষণিক উদ্বেগের বিষয় হলো—দেশে সার থাকা সত্ত্বেও কৃষকের কাছে তা সঠিকভাবে পৌঁছাচ্ছে কি না।


কাগজে মজুত, মাঠে সংকট

এই পরিস্থিতি একটি অদ্ভুত দ্বৈত বাজার তৈরি করতে পারে।

একদিকে সরকারি গুদাম ও পরিসংখ্যানে পর্যাপ্ত মজুত।

অন্যদিকে কৃষকের হাতে সার নেই।

একদিকে সরকার বলছে সংকট নেই।

অন্যদিকে কৃষক অতিরিক্ত দাম দিয়ে সার কিনতে বাধ্য হচ্ছেন।

এই ব্যবধান যত বাড়বে, সরকারের ওপর কৃষকের আস্থাও তত কমবে।

কৃষক যদি বিশ্বাস করেন যে সরকারি মূল্যে সার পাওয়া সম্ভব নয়, তাহলে তিনি হয় বেশি দামে সার কিনবেন, নয়তো প্রয়োজনের তুলনায় কম সার ব্যবহার করবেন।

দুই ক্ষেত্রেই ক্ষতি কৃষকের।

আর দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতি হবে দেশের খাদ্যব্যবস্থার।


এর পরিণতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে?

সারের কৃত্রিম সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে এর প্রভাব শুধু কৃষকের জমিতে সীমাবদ্ধ থাকবে না।

১. ফসলের উৎপাদন কমতে পারে

পর্যাপ্ত সার ব্যবহার না হলে ধান, ভুট্টাসহ প্রধান ফসলের উৎপাদন কমে যেতে পারে। প্রদত্ত বিশ্লেষণে প্রতি হেক্টরে উৎপাদন ১২–১৮ শতাংশ পর্যন্ত কমার সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে।

২. খাদ্যের দাম বাড়তে পারে

দেশীয় উৎপাদন কমে গেলে খাদ্য আমদানির ওপর নির্ভরতা বাড়বে। এতে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ তৈরি হওয়ার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের খাদ্যব্যয়ও বাড়তে পারে।

৩. কৃষকের ঋণ বাড়বে

উচ্চ সুদে ঋণ নিয়ে অতিরিক্ত দামে সার কিনতে হলে ছোট ও প্রান্তিক কৃষকদের আর্থিক চাপ বাড়বে। ভবিষ্যতে কৃষিতে বিনিয়োগের সক্ষমতাও কমে যেতে পারে।

৪. গ্রামীণ অর্থনীতি দুর্বল হবে

কৃষকের উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও যদি উৎপাদন ও আয় সেই অনুপাতে না বাড়ে, তাহলে গ্রামীণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যেতে পারে।

অর্থাৎ সারের সংকট শেষ পর্যন্ত খাদ্য, মূল্যস্ফীতি, কৃষকের ঋণ এবং গ্রামীণ অর্থনীতি—সবকিছুর ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।


সরকারের সামনে এখন কী করা জরুরি?

এই পরিস্থিতিতে শুধু “সারের কোনো সংকট নেই”—এমন বক্তব্য যথেষ্ট নয়।

সরকারকে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা যাচাই করতে হবে।

কোথায় কত সার মজুত আছে, কোন ডিলার কত বরাদ্দ পেয়েছেন, কত উত্তোলন করেছেন, কোথায় বিতরণ করেছেন—এসব তথ্য স্বচ্ছভাবে প্রকাশ করা প্রয়োজন।

একই সঙ্গে—

  • সরকারি দামে সার বিক্রি নিশ্চিত করতে হবে;
  • কৃত্রিম সংকট তৈরির অভিযোগে দ্রুত তদন্ত করতে হবে;
  • অনিয়ম প্রমাণিত হলে ডিলারশিপ বাতিল ও আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে;
  • রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রভাব নির্বিশেষে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে;
  • গুদাম ও বিতরণব্যবস্থায় ডিজিটাল ট্র্যাকিং বাড়াতে হবে;
  • কৃষকদের জন্য সহজ অভিযোগ ও প্রতিকার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে;
  • দেশীয় সার উৎপাদন বাড়াতে গ্যাস ও শিল্প অবকাঠামোর দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করতে হবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—কৃষকের কাছে সার পৌঁছানোর বিষয়টিকে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা বা স্থানীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে রাখতে হবে।

শেষ কথা

সরকারি গুদামে সার থাকলেই কৃষকের সংকট শেষ হয় না।

কৃষকের জমিতে সময়মতো, সঠিক পরিমাণে এবং সরকারি নির্ধারিত মূল্যে সার পৌঁছানোই আসল বিষয়।

কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, ঝিনাইদহ, রাজশাহীসহ বিভিন্ন এলাকার কৃষকদের বিক্ষোভ যদি সত্যিই সরবরাহব্যবস্থার ব্যর্থতার প্রতিফলন হয়, তাহলে এটি উপেক্ষা করার মতো কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়।

কাগজে থাকা মজুত কৃষকের জমিতে ফলন ফলায় না।

কৃষকের প্রয়োজন বাস্তবে সার—গুদামে নয়, তার হাতে।

আর যদি রাজনৈতিক প্রভাব, ডিলার সিন্ডিকেট কিংবা প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তার কারণে ভর্তুকিযুক্ত সার কৃষকের কাছে না পৌঁছে, তাহলে এর মূল্য দিতে হবে শুধু কৃষককে নয়—শেষ পর্যন্ত পুরো দেশকে।

কারণ খাদ্যনিরাপত্তা কোনো দলের রাজনৈতিক সম্পদ নয়।

কৃষকের খাদ্য ও উৎপাদনের অধিকার রক্ষা করা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব।

More from the timeline

View all