বাংলাদেশের পোশাকশিল্প কি ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে? জুলাই-পরবর্তী শাসনব্যবস্থার ব্যর্থতায় হারাচ্ছে বৈশ্বিক অবস্থান
চার দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক (রেডিমেড গার্মেন্টস—আরএমজি) শিল্প দেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত ছিল। দেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশেরও বেশি এসেছে এই খাত থেকে। প্রায় ৪০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের এই শিল্প বাংলাদেশকে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারক দেশে পরিণত করেছিল এবং চার মিলিয়নেরও বেশি মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছিল, যাদের অধিকাংশই নারী।
কিন্তু আজ সেই সাফল্যের ধারাবাহিকতা মারাত্মক চ্যালেঞ্জের মুখে।
২০২৪ সালের জুলাই-পরবর্তী রাজনৈতিক অস্থিরতার পর বাংলাদেশের পোশাকশিল্প অভূতপূর্ব সংকটে পড়েছে। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (WTO) তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে ধরে রাখা বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারকের অবস্থান হারিয়ে ভিয়েতনামের কাছে পিছিয়ে পড়েছে। যেখানে বৈশ্বিক পোশাক বাজার ৪.৪৬ শতাংশ হারে সম্প্রসারিত হয়েছে, সেখানে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ০.৮৯ শতাংশ—যা এশিয়ার প্রধান প্রতিযোগী দেশগুলোর মধ্যে সর্বনিম্ন।
সমালোচকদের মতে, এটি কেবল বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির প্রভাব নয়; বরং জুলাই-পরবর্তী প্রশাসনিক ব্যর্থতা, নীতিগত অদক্ষতা, শিল্পাঞ্চলে আইন-শৃঙ্খলার অবনতি এবং অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার ফল।
বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান দুর্বল হচ্ছে
আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পরিসংখ্যান বলছে, পশ্চিমা ক্রেতারা যখন তাদের ক্রয়াদেশ ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া ও ভারতের মতো দেশগুলোতে স্থানান্তর করছিল, তখন বাংলাদেশের অনেক কারখানা উৎপাদন ব্যাহত হওয়া, জ্বালানি সংকট এবং সরবরাহ ব্যবস্থার সমস্যায় জর্জরিত ছিল।
শিল্পসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্রের দাবি, জুলাই-পরবর্তী অস্থিরতার সময় বাংলাদেশ থেকে প্রায় ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের আন্তর্জাতিক পোশাক অর্ডার অন্য দেশে চলে যায়। আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলো একবার বিকল্প সরবরাহকারী দেশ বেছে নিলে সেই বাজার পুনরুদ্ধার করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে।
জ্বালানি সংকটে উৎপাদন ব্যাহত
বর্তমানে শিল্প খাতের অন্যতম বড় সংকট জ্বালানি সরবরাহ। গাজীপুর, সাভার ও নারায়ণগঞ্জের মতো প্রধান শিল্পাঞ্চলের বহু কারখানা পর্যাপ্ত গ্যাসের অভাবে পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না।
প্রতিদিন গ্যাসের ঘাটতি কয়েকশ মিলিয়ন ঘনফুটে পৌঁছেছে বলে শিল্পমালিকদের অভিযোগ। অনেক এলাকায় প্রয়োজনীয় চাপের তুলনায় গ্যাসের চাপ অত্যন্ত কম থাকায় ডাইং, স্পিনিং ও ফিনিশিং কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বাধ্য হয়ে কারখানাগুলো ডিজেলচালিত জেনারেটর ব্যবহার করছে, ফলে উৎপাদন ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাচ্ছে।
উচ্চ সুদহার ও আর্থিক সংকট
শিল্প উদ্যোক্তাদের আরেকটি বড় সমস্যা হলো ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদহার। অনেক ক্ষেত্রে ঋণের সুদ ১৫ শতাংশের কাছাকাছি পৌঁছেছে, অথচ পোশাক শিল্পের গড় মুনাফা ৫ থেকে ৭ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ।
তারল্য সংকটের কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান কাঁচামাল আমদানির জন্য পর্যাপ্ত অর্থায়ন পাচ্ছে না। ফলে অনেক উদ্যোক্তা ব্যক্তিগত সঞ্চয় ব্যবহার করে শ্রমিকদের বেতন পরিশোধ করতে বাধ্য হচ্ছেন।
প্রশাসনিক জটিলতায় রপ্তানি বিলম্ব
সমালোচকদের মতে, প্রশাসনিক ধীরগতি ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতাও শিল্পকে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে ফেলেছে।
চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্য খালাসে দীর্ঘসূত্রতা, বন্ড লাইসেন্স নবায়নে বিলম্ব এবং কাস্টমস ও কর প্রশাসনের বিভিন্ন জটিলতার কারণে রপ্তানি পণ্য নির্ধারিত সময়ে বিদেশে পাঠানো যাচ্ছে না। এতে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থা কমছে এবং বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ছে।
শুল্ক ও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার চাপ
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি বাজার যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু উচ্চ আমদানি শুল্ক এবং নতুন বাণিজ্যিক সুবিধা নিশ্চিত করতে কার্যকর কূটনৈতিক উদ্যোগের অভাবে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে।
কারখানায় উৎপাদন বিলম্বিত হওয়ায় আন্তর্জাতিক ক্রেতারা অনেক ক্ষেত্রে ২০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত মূল্যছাড় দাবি করছে অথবা বিমানপথে অতিরিক্ত খরচে পণ্য পাঠানোর চাপ দিচ্ছে। অনেক প্রতিষ্ঠান এই শর্ত মেনে নিতে না পারায় অর্ডার বাতিল হচ্ছে।
২০২৬ সালের মার্চ মাসে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ১৯.৩৫ শতাংশ কমে যায়।
বন্ধ হচ্ছে কারখানা, হারাচ্ছেন শ্রমিকরা
এই সংকটের সবচেয়ে বড় মূল্য দিচ্ছেন শ্রমিকরা।
গত দেড় বছরে ১৫০টিরও বেশি গার্মেন্টস ও টেক্সটাইল কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গেছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বহু প্রতিষ্ঠান ঋণ পরিশোধ ও শ্রমিকদের বেতন দিতে না পেরে উৎপাদন বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে।
একাধিক বড় শিল্পগোষ্ঠী হাজার হাজার শ্রমিক ছাঁটাই করেছে। বিভিন্ন হিসাব অনুযায়ী, ১৯ হাজারেরও বেশি শ্রমিক ইতোমধ্যে চাকরি হারিয়েছেন।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন নারী শ্রমিকরা, যারা বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের মূল ভিত্তি। কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অসংখ্য পরিবারের আয়ের একমাত্র উৎস বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, যার প্রভাব পড়ছে গ্রামীণ অর্থনীতি এবং ক্ষুদ্র ব্যবসার ওপরও।
অর্থনীতির জন্য বড় হুমকি
পোশাকশিল্প বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রধান উৎস। ফলে এই খাতের সংকট শুধু শিল্পেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান এবং সামগ্রিক আর্থিক স্থিতিশীলতার ওপরও সরাসরি প্রভাব ফেলছে।
সমালোচকদের মতে, জুলাই-পরবর্তী অন্তর্বর্তী প্রশাসন শিল্পাঞ্চলে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা, জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং শিল্পকারখানার কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখতে ব্যর্থ হয়েছে।
তাদের অভিযোগ, পরবর্তী বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারও এখন পর্যন্ত কার্যকর অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার পরিকল্পনা, জ্বালানি সংকট নিরসন, সহজ ঋণব্যবস্থা বা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্প্রসারণে দৃশ্যমান সাফল্য দেখাতে পারেনি।
উপসংহার
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প কেবল একটি শিল্পখাত নয়; এটি দেশের অর্থনীতির ভিত্তি, কোটি মানুষের জীবিকার উৎস এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বাংলাদেশের পরিচয়ের অন্যতম স্তম্ভ।
সমালোচকদের মতে, রাজনৈতিক অস্থিরতা, নীতিগত দুর্বলতা, জ্বালানি সংকট, আর্থিক চাপ এবং প্রশাসনিক অদক্ষতা যদি দ্রুত দূর করা না যায়, তবে বাংলাদেশ শুধু বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারকের অবস্থানই হারাবে না, বরং বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলেও তার দীর্ঘদিনের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বাংলাদেশের অর্থনীতি ও কর্মসংস্থান রক্ষায় এখনই কার্যকর, সমন্বিত ও দূরদর্শী পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি।