একসময় বাংলাদেশে দীর্ঘস্থায়ী লোডশেডিং ছিল নিত্যদিনের বাস্তবতা। কিন্তু গত এক দশকে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি, নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন এবং গ্রিড সম্প্রসারণের ফলে দেশের অধিকাংশ মানুষ সেই পুরোনো অন্ধকার থেকে অনেকটাই বেরিয়ে এসেছিল। শিল্প-কারখানা, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা ও নগরজীবনে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ অর্থনৈতিক অগ্রগতির অন্যতম ভিত্তিতে পরিণত হয়েছিল।
কিন্তু আজ সেই বাস্তবতা আবার দ্রুত বদলে যাচ্ছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে দেশের বিভিন্ন এলাকায় দিনে ৬ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিংয়ের অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। বিদ্যুৎ ঘাটতি এখন আর সাময়িক অসুবিধা নয়; এটি মানুষের দৈনন্দিন জীবন, শিল্প উৎপাদন, কৃষি, শিক্ষা এবং স্বাস্থ্যসেবার ওপর সরাসরি চাপ সৃষ্টি করছে।
বিদ্যুৎ সংকটের ভয়াবহ চিত্র
দেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থার সাম্প্রতিক পরিস্থিতি দেখলে সংকটের গভীরতা স্পষ্ট হয়। সর্বোচ্চ চাহিদা প্রায় ১৬ হাজার মেগাওয়াটের কাছাকাছি পৌঁছালেও বাস্তবে উৎপাদন তার তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম থাকছে। ফলে কয়েক হাজার মেগাওয়াটের ঘাটতি তৈরি হচ্ছে এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখতে হচ্ছে।
সংকটের অন্যতম বড় কারণ গ্যাসের সরবরাহ ঘাটতি। গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বড় একটি অংশ পর্যাপ্ত গ্যাস না পাওয়ায় পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। একই সময়ে এলএনজি সরবরাহ ও আমদানির বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
ফলে কাগজে-কলমে বাংলাদেশের যে বিপুল বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা রয়েছে, তার একটি বড় অংশ বাস্তবে কাজে লাগানো যাচ্ছে না।
অর্থাৎ সমস্যা শুধু বিদ্যুৎকেন্দ্রের সংখ্যা নয়—জ্বালানি সরবরাহ, আমদানি, অর্থায়ন, অবকাঠামো এবং ব্যবস্থাপনার সমন্বিত দুর্বলতাই সংকটকে গভীর করছে।
গ্যাস সংকট: বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রধান বাধা
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের বড় অংশ গ্যাসনির্ভর। ফলে বিদ্যুৎকেন্দ্রে প্রয়োজনীয় গ্যাস না পৌঁছালে উৎপাদন ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও কেন্দ্রগুলো বসে থাকতে বাধ্য হয়।
এলএনজি টার্মিনাল বা আমদানি সরবরাহ ব্যবস্থায় কোনো ধরনের বিঘ্ন ঘটলে তার প্রভাব সরাসরি পড়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনে। গ্যাসের চাপ কমে গেলে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পূর্ণ ক্ষমতায় চলতে পারে না, আর তখন জাতীয় গ্রিডে ঘাটতি পূরণ করতে শুরু হয় লোডশেডিং।
এই পরিস্থিতি দেখিয়ে দেয়—বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা কতটা গুরুত্বপূর্ণ।
শিল্প খাতে বড় আঘাত
বিদ্যুৎ সংকটের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক ক্ষতিগুলোর একটি পড়ছে শিল্প খাতে।
গার্মেন্টস, টেক্সটাইল, ডাইং, স্পিনিং, রাইস মিল, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প—সব ক্ষেত্রেই বিদ্যুৎ বিভ্রাট উৎপাদন ব্যাহত করছে। একটি কারখানায় কয়েক ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকলে শুধু উৎপাদন বন্ধ হয় না; শ্রমিকদের কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়, অর্ডার ডেলিভারিতে বিলম্ব হয় এবং উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যায়।
বিদ্যুৎ না থাকলে অনেক প্রতিষ্ঠান বাধ্য হয়ে ডিজেলচালিত জেনারেটর ব্যবহার করে। কিন্তু ডিজেলের উচ্চমূল্যের কারণে উৎপাদন খরচ দ্রুত বেড়ে যায়। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা করা এমনিতেই কঠিন; তার ওপর অতিরিক্ত জ্বালানি ব্যয় বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের আরও দুর্বল করে।
বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতের মতো সময়নির্ভর শিল্পে কয়েক ঘণ্টার বিদ্যুৎ বিভ্রাটও বড় ধরনের ক্ষতির কারণ হতে পারে।
কৃষিতেও সংকটের প্রভাব
বিদ্যুৎ সংকট শুধু শহর বা শিল্পাঞ্চলের সমস্যা নয়।
রাজশাহী, নাটোরসহ কৃষিনির্ভর অঞ্চলে সেচের পাম্প বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকলে সেচ ব্যাহত হয়, উৎপাদন ব্যয় বাড়ে এবং কৃষকের ফসল ঝুঁকিতে পড়ে।
খুলনাসহ উপকূলীয় অঞ্চলে চিংড়ি চাষেও বিদ্যুতের প্রয়োজনীয়তা অত্যন্ত বেশি। এয়ারেটর বন্ধ হয়ে গেলে পানিতে অক্সিজেনের মাত্রা কমে যেতে পারে, যার ফলে মাছ বা চিংড়ির ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়।
অর্থাৎ বিদ্যুৎ সংকট শেষ পর্যন্ত খাদ্য উৎপাদন ও গ্রামীণ অর্থনীতিতেও আঘাত করছে।
শিক্ষার্থীদের জীবনেও অন্ধকার
লোডশেডিংয়ের আরেকটি বড় ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীরা।
বিশেষ করে গ্রাম ও মফস্বল এলাকায় দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ব্যাহত হচ্ছে। অনেককে মোবাইলের আলো বা মোমবাতির আলোয় পড়তে হচ্ছে। অনলাইন শিক্ষা, কম্পিউটার ব্যবহার কিংবা ইন্টারনেটনির্ভর পড়াশোনাও বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে কঠিন হয়ে পড়ছে।
একটি দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যখন নিয়মিত পড়াশোনার জন্য পর্যাপ্ত আলো ও বিদ্যুৎ পায় না, তখন সংকটটি কেবল বর্তমানের নয়—এর প্রভাব ভবিষ্যতের মানবসম্পদ উন্নয়নের ওপরও পড়ে।
স্বাস্থ্যসেবায় ঝুঁকি আরও ভয়াবহ
হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোর জন্য নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ কোনো বিলাসিতা নয়—এটি জীবনরক্ষার মৌলিক শর্ত।
অপারেশন থিয়েটার, আইসিইউ, অক্সিজেন ব্যবস্থা, ভ্যাকসিন ও ওষুধের কোল্ড চেইন—সবকিছু বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল। বিদ্যুৎ চলে গেলে অনেক প্রতিষ্ঠানকে ডিজেল জেনারেটরের ওপর নির্ভর করতে হয়।
দীর্ঘস্থায়ী লোডশেডিংয়ের ফলে জেনারেটর ব্যবস্থায় চাপ বাড়ে, জ্বালানি ব্যয় বাড়ে এবং চিকিৎসাসেবার নির্ভরযোগ্যতা কমে যায়।
সাধারণ মানুষের জীবন অতিষ্ঠ
বিদ্যুৎ সংকটের সবচেয়ে সরাসরি শিকার সাধারণ মানুষ।
প্রচণ্ড গরমে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় ঘুম ও স্বাভাবিক জীবনযাপন ব্যাহত হচ্ছে। ছোট দোকান ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান দ্রুত বন্ধ করতে হচ্ছে। রান্না, পানির পাম্প, মোবাইল চার্জিং থেকে শুরু করে দৈনন্দিন জীবনের প্রায় প্রতিটি কাজেই বিঘ্ন ঘটছে।
শহরে যেমন অসহনীয় গরম ও যানজটের সঙ্গে বিদ্যুৎ সংকট যুক্ত হচ্ছে, তেমনি গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুৎ না থাকার অর্থ অনেক সময় সেচ, ব্যবসা ও যোগাযোগ ব্যবস্থাও ব্যাহত হওয়া।
কীভাবে এই পরিস্থিতি তৈরি হলো?
বাংলাদেশের বর্তমান বিদ্যুৎ সংকটকে কোনো একটি কারণ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না।
গ্যাস সরবরাহের ঘাটতি, এলএনজি আমদানি ও সরবরাহ ব্যবস্থার সমস্যা, কয়লা পরিবহন ও সরবরাহে বাধা, বিদ্যুৎকেন্দ্রের রক্ষণাবেক্ষণ, জ্বালানি আমদানির ব্যয় এবং বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক চাপ—সবগুলো বিষয় একসঙ্গে কাজ করছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নীতিগত ও প্রশাসনিক দুর্বলতা।
২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী প্রশাসনের সময়ে জ্বালানি ও শিল্প খাতের কাঠামোগত সমস্যাগুলোর অনেকগুলোই কার্যকরভাবে সমাধান হয়নি। পরবর্তী নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরও সংকট মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত পরিকল্পনার ঘাটতি নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
সংকটের দায় এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই
একটি দেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থা কেবল বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িত—
- পর্যাপ্ত গ্যাস ও জ্বালানি নিশ্চিত করা
- এলএনজি আমদানি ও টার্মিনাল ব্যবস্থাপনা
- বিদ্যুৎকেন্দ্রের নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ
- বিদ্যুৎ আমদানি ও আঞ্চলিক সহযোগিতা
- বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক স্থিতিশীলতা
- সঞ্চালন ও বিতরণ অবকাঠামো উন্নয়ন
- শিল্পাঞ্চলে নির্ভরযোগ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা
এই প্রতিটি ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন।
একটি সরকার যদি শুধু প্রতিবার সংকট দেখা দেওয়ার পর সাময়িক সমাধান দেয়, তাহলে সমস্যা বারবার ফিরে আসবেই।
বিদ্যুৎ নিরাপত্তা মানেই অর্থনৈতিক নিরাপত্তা
বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হওয়ার স্বপ্ন দেখে। নিজেকে আঞ্চলিক উৎপাদন ও রপ্তানি কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়। কিন্তু একটি শিল্পভিত্তিক অর্থনীতি দিনে ৬–১২ ঘণ্টা বিদ্যুৎবিহীন অবস্থায় টেকসইভাবে এগোতে পারে না।
বিদ্যুৎ সংকট মানে শুধু অন্ধকার নয়।
এটি কারখানায় উৎপাদন বন্ধ হওয়া, কৃষিতে সেচ ব্যাহত হওয়া, শিক্ষার্থীর পড়াশোনা থেমে যাওয়া, হাসপাতালে ঝুঁকি বাড়া, ব্যবসার ব্যয় বৃদ্ধি, বিনিয়োগকারীর আস্থা কমে যাওয়া এবং রপ্তানি প্রতিযোগিতা হারানোর নাম।
বিশ্বের বিনিয়োগকারীরা রাজনৈতিক বক্তব্যের চেয়ে বাস্তব অবকাঠামোকে বেশি গুরুত্ব দেয়। যে দেশে শিল্প প্রতিষ্ঠান জানে না আগামীকাল পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ ও গ্যাস পাবে কি না, সেখানে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ আকর্ষণ করা কঠিন।
এখনই প্রয়োজন জরুরি পদক্ষেপ
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ সংকট সমাধানে কয়েকটি বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ প্রয়োজন।
প্রথমত, বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর জন্য পর্যাপ্ত গ্যাস ও জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, এলএনজি আমদানি ও জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা দূর করতে হবে। তৃতীয়ত, শিল্পাঞ্চলগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।
একই সঙ্গে বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক ব্যবস্থাপনা, আমদানি চুক্তি, সঞ্চালন অবকাঠামো এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাও শক্তিশালী করতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—সরকারকে সংকটের প্রকৃত কারণ জনগণের সামনে স্বচ্ছভাবে তুলে ধরতে হবে এবং সময়বদ্ধ সমাধান দিতে হবে।
অন্ধকারে কতদিন?
বাংলাদেশ একবার দীর্ঘস্থায়ী লোডশেডিংয়ের যুগ পেরিয়ে সামনে এগিয়েছিল। শিল্পায়ন, ডিজিটাল অর্থনীতি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নের সঙ্গে নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ সরবরাহ একটি অপরিহার্য ভিত্তি হয়ে উঠেছিল।
আজ সেই ভিত্তিই আবার দুর্বল হয়ে পড়ছে।
সংকটের পরিসংখ্যান প্রকাশ্যে। মানুষের দুর্ভোগ দৃশ্যমান। শিল্পের উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। শিক্ষার্থীরা পড়াশোনায় সমস্যায় পড়ছে। কৃষক ও ব্যবসায়ীরা ক্ষতির মুখে পড়ছেন।
তাই প্রশ্নটি শুধু “বিদ্যুৎ কখন আসবে?”—এতটা সরল নয়।
প্রকৃত প্রশ্ন হলো:
বাংলাদেশ কি আবার এমন একটি বিদ্যুৎব্যবস্থার দিকে ফিরে যাবে, যেখানে নাগরিক, কৃষক ও শিল্পোদ্যোক্তাদের প্রতিদিন অন্ধকারের সময়সূচি হিসাব করে জীবন চালাতে হবে?
বিদ্যুৎ কোনো বিলাসিতা নয়। এটি আধুনিক রাষ্ট্রের মৌলিক অবকাঠামো। বাংলাদেশের অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও ভবিষ্যৎ শিল্পায়নকে নিরাপদ রাখতে হলে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি নিরাপত্তাকে এখনই সর্বোচ্চ জাতীয় অগ্রাধিকার দিতে হবে।
আলো নিভে যাওয়ার পর ব্যাখ্যা নয়—আলো জ্বালিয়ে রাখার সক্ষমতাই একটি সরকারের প্রকৃত পরীক্ষার জায়গা।