নেপালে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যায় প্রাণহানি ও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির সংবাদে আমি গভীরভাবে শোকাহত। রসুয়া জেলার তিমুরে, সিয়াব্রুবেশি ও রাসুওয়াগাধীসহ বিভিন্ন এলাকায় আকস্মিক বন্যা বহু মানুষের জীবনকে বিপর্যস্ত করেছে। ইতোমধ্যে অনেক মূল্যবান প্রাণ ঝরে গেছে, অনেকে এখনো নিখোঁজ রয়েছেন এবং অসংখ্য পরিবার অনিশ্চয়তা, বেদনা ও ধ্বংসযজ্ঞের মধ্য দিয়ে কঠিন সময় পার করছে।
এই শোকাবহ মুহূর্তে আমি নিহতদের পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাচ্ছি। একই সঙ্গে নেপাল সরকার এবং নেপালের বন্ধুত্বপূর্ণ জনগণের প্রতিও জানাচ্ছি আন্তরিক সহমর্মিতা। যারা এই দুর্যোগে প্রাণ হারিয়েছেন, মহান সৃষ্টিকর্তার কাছে তাদের আত্মার শান্তি কামনা করছি। আহতদের দ্রুত সুস্থতা এবং নিখোঁজদের নিরাপদে উদ্ধারের জন্য প্রার্থনা করছি।
নেপাল বাংলাদেশের ঘনিষ্ঠ ও পরীক্ষিত বন্ধু। আমাদের দুই দেশের সম্পর্ক কেবল ভৌগোলিক নৈকট্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; ইতিহাস, সংস্কৃতি, আঞ্চলিক সহযোগিতা এবং দুই দেশের জনগণের অভিন্ন আকাঙ্ক্ষা আমাদের গভীরভাবে একসূত্রে আবদ্ধ করেছে।
২০১৮ সালে চতুর্থ বিমসটেক (BIMSTEC) সম্মেলনে যোগ দিতে কাঠমান্ডু সফরের কথা আমি গভীর শ্রদ্ধা ও আন্তরিকতার সঙ্গে স্মরণ করি। সেই সফরে আমি নেপালের মানুষের উষ্ণ আতিথেয়তা, মর্যাদাবোধ এবং প্রতিকূলতা মোকাবিলায় তাদের অসাধারণ দৃঢ়তা প্রত্যক্ষ করার সুযোগ পেয়েছিলাম।
দুর্যোগের মুহূর্তে প্রতিবেশী ও বন্ধু রাষ্ট্রগুলোর একে অপরের পাশে দাঁড়ানোই মানবিকতার সবচেয়ে বড় পরিচয়। বাংলাদেশ নিজেও বন্যা, নদীভাঙন, ভূমিকম্প ও জলবায়ুজনিত নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে লড়াই করে আসছে। তাই দুর্যোগের ভয়াবহতা এবং এর কারণে সাধারণ মানুষের জীবনে নেমে আসা দুর্ভোগ বাংলাদেশ গভীরভাবে উপলব্ধি করে।
বাংলাদেশ অতীতেও নেপালসহ বিভিন্ন বন্ধুত্বপূর্ণ দেশের প্রাকৃতিক দুর্যোগে পাশে দাঁড়িয়েছে। বর্তমান সংকটেও নেপালের মানুষের পাশে দাঁড়াতে বাংলাদেশকে সম্ভাব্য সব ধরনের বাস্তব ও মানবিক সহযোগিতা নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। নেপাল সরকারের অনুরোধ থাকলে ত্রাণ কার্যক্রম ও জরুরি মানবিক সহায়তার লজিস্টিক কেন্দ্র হিসেবে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের সৈয়দপুর বিমানবন্দর ব্যবহারের সুযোগও বিবেচনা করা যেতে পারে।
নেপালের এই দুর্যোগ আমাদের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়—জলবায়ু পরিবর্তন, পাহাড়ি প্রতিবেশব্যবস্থার দুর্বলতা, আকস্মিক বন্যা, ভূমিধস এবং চরম আবহাওয়ার ঝুঁকি গোটা দক্ষিণ এশিয়ার অভিন্ন চ্যালেঞ্জ। এসব দুর্যোগ কোনো রাষ্ট্রীয় সীমান্ত মানে না। তাই আঞ্চলিক সহযোগিতা আরও শক্তিশালী করা এখন সময়ের দাবি।
বিশেষ করে আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা, দুর্যোগ প্রস্তুতি, জলবায়ু অভিযোজন, নদী ও পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা, তথ্য আদান-প্রদান এবং জরুরি মানবিক সাড়াদানের ক্ষেত্রে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে আরও ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা গড়ে তুলতে হবে।
এই কঠিন সময়ে যারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন—উদ্ধারকর্মী, নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য, চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী, স্থানীয় প্রশাসন, স্বেচ্ছাসেবক এবং সাধারণ নাগরিকদের প্রতি আমি গভীর শ্রদ্ধা জানাই। তাদের সাহস, মানবিকতা ও দায়িত্ববোধ অসংখ্য মানুষের জীবনে আশার আলো জ্বালাচ্ছে।
এই শোক ও সংকটের সময়ে বাংলাদেশের জনগণ নেপালের জনগণের সঙ্গে সম্পূর্ণ সংহতি প্রকাশ করছে। আমরা বিশ্বাস করি, ঐক্য, সাহস ও পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে নেপাল এই ভয়াবহ দুর্যোগ কাটিয়ে উঠবে এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ ও পরিবারগুলো ধীরে ধীরে তাদের জীবন পুনর্গঠন করতে সক্ষম হবে।
নেপালের জনগণের জন্য আমাদের ভালোবাসা, প্রার্থনা ও পূর্ণ সংহতি রইল।
শেখ হাসিনা
সভাপতি, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ
সাবেক প্রধানমন্ত্রী, বাংলাদেশ