Menu
Back to timeline

আন্তর্জাতিক কৌশলগত সংলাপ “বাংলাদেশকে পুনর্গঠন: বিশ্বসংকট উত্তরণের পথ” শীর্ষক সম্মেলনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনার বক্তব্য

আন্তর্জাতিক কৌশলগত সংলাপ “বাংলাদেশকে পুনর্গঠন: বিশ্বসংকট উত্তরণের পথ” শীর্ষক সম্মেলনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনার বক্তব্য

সম্মানিত অতিথিবৃন্দ, প্রিয় অংশগ্রহণকারীগণ, ভদ্রমহিলা ও ভদ্রমহোদয়গণ,

আপনাদের সবাইকে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও সালাম। এই গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক আয়োজনে আমাকে বক্তব্য রাখার সুযোগ দেওয়ার জন্য আমি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।

বাংলাদেশ—একটি শান্তিপ্রিয়, মধ্যপন্থী মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ—আজ গভীর সংকটের মুখোমুখি। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের টানা ১৫ বছরের শাসনে যে দেশ বিশ্বের ৩৫তম বৃহৎ অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছিল, সেই অর্জন অবৈধ ইউনূস নেতৃত্বাধীন সরকার মাত্র এক বছরের মধ্যেই ধ্বংস করে দিয়েছে।

আমি গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে, জাতীয় চার নেতাকে এবং মহান মুক্তিযুদ্ধে আত্মোৎসর্গকারী ৩০ লাখ শহীদকে। একই সঙ্গে কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করছি সেইসব বন্ধুপ্রতিম রাষ্ট্র ও জনগণকে, যারা বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা অসীম ত্যাগ ও রক্তের বিনিময়ে অর্জিত হলেও স্বাধীনতার পর আমাদের গণতন্ত্র ও উন্নয়নের পথ কখনোই সহজ ছিল না। বরং তা ছিল ষড়যন্ত্র, সংকট ও প্রতিকূলতায় পরিপূর্ণ।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট আমি হারিয়েছি আমার সমগ্র পরিবারকে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, আমার মা, আমার তিন ভাই, দুই ভাবিসহ পরিবারের মোট ১৮ জন সদস্যকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। আমি এবং আমার ছোট বোন শেখ রেহানা সে সময় জার্মানিতে অবস্থান করায় বেঁচে যাই।

এরপর আমরা ছয় বছর নির্বাসিত জীবন কাটাই। দেশে ফিরে দেখি, আমার পরিবারের হত্যাকারীরা রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতায় নিরাপদে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তাদের বিচার চাওয়ার অধিকারও আমাদের ছিল না। মুক্তিযুদ্ধের যুদ্ধাপরাধীদেরও কারাগার থেকে মুক্তি দেওয়া হয়েছিল।

এই কঠিন বাস্তবতার মধ্যেই ১৯৮১ সালে আমি দেশের মানুষের সেবা করার সংকল্প নিয়ে বাংলাদেশে ফিরে আসি। আমার অনুপস্থিতিতেই বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ আমাকে দলের সভাপতি নির্বাচিত করেছিল। সত্যি বলতে, আমি তখন এই দায়িত্ব নেওয়ার জন্য প্রস্তুত ছিলাম না। কিন্তু দলের নেতাকর্মীদের ইচ্ছা এবং জাতির পিতার অসমাপ্ত স্বপ্ন পূরণের দায়িত্ববোধ আমাকে এই পথ বেছে নিতে উদ্বুদ্ধ করে।

দীর্ঘদিন বাংলাদেশ সামরিক শাসনের অধীনে ছিল। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নয়, বরং অভ্যুত্থান ও পাল্টা অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটত। সেই পরিস্থিতিতে আমার লক্ষ্য ছিল গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, আঞ্চলিক শান্তি নিশ্চিত করা এবং মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জন—যে স্বপ্ন বঙ্গবন্ধু দেখেছিলেন।

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সবসময় ধর্মনিরপেক্ষতা, অসাম্প্রদায়িক রাজনীতি, গণতন্ত্র এবং সমান নাগরিক অধিকারে বিশ্বাস করে। বঙ্গবন্ধু এমন একটি বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, যেখানে মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, আদিবাসীসহ সকল ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষ সমান মর্যাদায় বসবাস করবে।

দীর্ঘ ২১ বছর পর ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে। আমরা খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি করি এবং বাংলাদেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করি। বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে ব্যাপক উন্নয়নমূলক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করি। ২০০১ সালে আমাদের প্রথম মেয়াদ শেষে বাংলাদেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করে, বিদ্যুৎ উৎপাদন বেড়ে দাঁড়ায় ৪,৩০০ মেগাওয়াট এবং সাক্ষরতার হার বৃদ্ধি পেয়ে হয় ৬৫.৫ শতাংশ। অন্যান্য সামাজিক ও অর্থনৈতিক সূচকেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জিত হয়। কিন্তু ২০০১ সালের নির্বাচনে আমরা পুনরায় ক্ষমতায় আসতে পারিনি।

২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময় বাংলাদেশ সন্ত্রাসবাদ ও ধর্মীয় উগ্রবাদের নিরাপদ আশ্রয়ে পরিণত হয়। হরকাতুল জিহাদ, জামাআতুল মুজাহিদিন বাংলাদেশ (জেএমবি)সহ বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠন সেই সময় শক্তিশালী হয়ে ওঠে, যা আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সম্পূর্ণ পরিপন্থী ছিল।

২০০৮ সালের নির্বাচনে জনগণের রায়ে ক্ষমতায় এসে ২০০৯ সালে আমরা সন্ত্রাসবিরোধী কার্যক্রমকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিই। সন্ত্রাসবিরোধী আইন প্রণয়ন, জঙ্গি অর্থায়ন ও অর্থপাচার রোধ, উগ্রবাদী নেটওয়ার্ক দমন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ব্যাপক সংস্কার গ্রহণ করি।

আমরা কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি), অ্যান্টি টেররিজম ইউনিট, বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটসহ বিভিন্ন বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলি। একই সঙ্গে আলেম-ওলামা, শিক্ষক, পরিবার, তরুণ সমাজ ও কমিউনিটি নেতাদের সম্পৃক্ত করে উপলব্ধি করি যে, কেবল শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে নয়—শিক্ষা, সামাজিক সচেতনতা, ধর্মীয় অপব্যাখ্যার মোকাবিলা, অর্থায়ন নিয়ন্ত্রণ, সাইবার নজরদারি এবং সামাজিক প্রতিরোধের মাধ্যমেই সন্ত্রাসবাদকে স্থায়ীভাবে পরাজিত করা সম্ভব।

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে বাংলাদেশ একটি অত্যন্ত বিপজ্জনক পরিস্থিতির মধ্যে প্রবেশ করে। কোটা আন্দোলনের আড়ালে সুচিন্তিত পরিকল্পনার মাধ্যমে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে একটি নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করা হয়। এই আন্দোলনে সহিংস উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলো সক্রিয়ভাবে অংশ নেয় এবং এর প্রধান সুবিধাভোগীতে পরিণত হয়।

এই সহিংসতায় দেশের ৪৬০টি পুলিশ স্টেশন আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়। বহু স্থানে আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে। দায়িত্ব পালনরত পুলিশ সদস্যদের হত্যা করে সেতুর ওপর ঝুলিয়ে রাখা হয়।

কারাগারে হামলা চালিয়ে দণ্ডপ্রাপ্ত ও অভিযুক্ত জঙ্গিদের মুক্ত করা হয়। নিষিদ্ধ সংগঠন আনসারুল্লাহ বাংলা টিম, হিযবুত তাহরীর, হরকাতুল জিহাদ এবং জামাআতুল মুজাহিদিন বাংলাদেশের নেতারাও মুক্তি পায়।

একই সময়ে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, আহমদিয়া ও সুফি সম্প্রদায়ের উপাসনালয়, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এবং বিভিন্ন সাংস্কৃতিক স্থাপনা হামলা ও ধ্বংসযজ্ঞের শিকার হয়। শুধু স্থাপনা নয়, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষও নৃশংস নির্যাতনের শিকার হন। এটি ছিল বাংলাদেশের ঐতিহাসিক সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ওপর এক সুপরিকল্পিত আঘাত।

উগ্রবাদী নেতারা প্রকাশ্যে সক্রিয় হতে শুরু করে। তাদের কৌশল ছিল স্পষ্ট—লাশ তৈরি করো, জনমনে ক্ষোভ সৃষ্টি করো এবং সরকারকে পতনের দিকে ঠেলে দাও। আমার বিশ্বাস, ড. ইউনূস, তারেক রহমান ও জামায়াত এই লক্ষ্য নিয়েই আন্দোলন পরিচালনা করেছে। এটি কোনো স্বতঃস্ফূর্ত ছাত্র আন্দোলন ছিল না; বরং ছিল সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক অভিযান।

১৮ জুলাই আমি প্রতিটি মৃত্যু, প্রতিটি গুলিবর্ষণ এবং প্রতিটি সহিংস ঘটনার তদন্তে বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন গঠন করেছিলাম। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—যদি ড. ইউনূস সত্যিই বিচার চাইতেন, তাহলে সেই তদন্ত কমিশন কেন স্থগিত করা হলো? কেন একটি স্বাধীন তদন্তকে ভয় পাওয়া হলো?

যারা প্রকৃত হত্যাকাণ্ডে জড়িত ছিল, তাদের অন্তর্বর্তী সরকার দায়মুক্তি দিয়েছে। যদি তারা নির্দোষই হতো, তাহলে তাদের দায়মুক্তির প্রয়োজন হতো কেন? এই দায়মুক্তিই প্রকৃত সত্যকে সামনে নিয়ে আসে। বর্তমান সরকারও সেই ধারাবাহিকতা বজায় রেখে ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত করছে।

২০২৪ সালের আগস্টের পর থেকে দেশে কার্যত আইনশৃঙ্খলা ভেঙে পড়েছে। সাবেক প্রধান বিচারপতিকে মিথ্যা মামলায় গ্রেপ্তার করে হাতকড়া পরিয়ে কারাগারে নেওয়া হয়েছে। প্রধান বিচারপতি ও অন্যান্য বিচারপতিদের ওপর চাপাতি, কুঠার, লাঠি ও আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে হামলা চালিয়ে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে।

আইনজীবী, সাংবাদিক, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব এবং বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের অসংখ্য নেতাকর্মীকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে, ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে জখম করা হয়েছে, গ্রেপ্তার ও নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে। নারী ও শিশুদের ওপর ধর্ষণ ও হত্যার মতো ভয়াবহ অপরাধ বেড়েছে। গোটা দেশে এক ভয়ের পরিবেশ সৃষ্টি করা হয়েছে।

২০০৯ সাল থেকে আমরা যে বাংলাদেশ গড়ে তুলেছিলাম, সেই দেশ ২০২১ সালে উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা অর্জন করে। দারিদ্র্যের হার কমে ১৮.৭ শতাংশে এবং চরম দারিদ্র্য নেমে আসে ৫.৬ শতাংশে। মানুষ শান্তি, নিরাপত্তা ও উন্নয়নের সুফল ভোগ করছিল।

কিন্তু গত দুই বছরে দেশের অর্থনীতি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। উন্নয়নের বহু অর্জন ধ্বংস হয়ে গেছে। দারিদ্র্য আবার বাড়ছে, মানুষের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা নেই। অথচ ক্ষমতাসীনরা জনগণের দুর্ভোগের প্রতি উদাসীন থেকে ক্ষমতা ও অর্থের সুবিধা ভোগ করছে। এমনকি শত শত শিশু সময়মতো টিকা না পাওয়ায় প্রাণ হারিয়েছে।

আজ আমার বার্তা খুবই স্পষ্ট।

বাংলাদেশকে উগ্রবাদ, সহিংসতা কিংবা ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রব্যবস্থাকে ধ্বংস করার মাধ্যমে পুনর্গঠন করা যাবে না।

বাংলাদেশকে পুনরুদ্ধার করতে হবে গণতন্ত্র, সাংবিধানিক শাসন, ধর্মীয় সম্প্রীতি, উন্নয়ন এবং নিরাপত্তার ভিত্তিতে।

একটি স্থিতিশীল ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ শুধু দক্ষিণ এশিয়ার জন্য নয়, সমগ্র বিশ্বের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

একটি শান্তিপূর্ণ, ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশ বৈশ্বিক নিরাপত্তার জন্যও অপরিহার্য।

সবাইকে আন্তরিক ধন্যবাদ।

জয় বাংলা।

জয় বঙ্গবন্ধু।

More from the timeline

View all