অবিচ্ছিন্ন ধারাবাহিকতা: বঙ্গবন্ধুর পরিবার ও বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষ চেতনাকে মুছে ফেলার দশকের পর দশক প্রচেষ্টা
বাংলাদেশের স্বাধীনতা-পরবর্তী ইতিহাসে ১৫ আগস্ট ১৯৭৫, ২১ আগস্ট ২০০৪ এবং ৫ আগস্ট ২০২৪—এই তিনটি তারিখ গভীর ক্ষতচিহ্নের মতো দাঁড়িয়ে আছে। এগুলোকে শুধু বিচ্ছিন্ন রাজনৈতিক ট্র্যাজেডি হিসেবে দেখলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারাবাহিকতা আড়ালে থেকে যায়। এই দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী, তিনটি ঘটনাই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার এবং ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের অসাম্প্রদায়িক ও বহুত্ববাদী রাষ্ট্রচিন্তার বিরুদ্ধে দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক সংঘাতের বিভিন্ন অধ্যায়।
১৫ আগস্ট ১৯৭৫: প্রতিষ্ঠাতা নেতৃত্বকে নিশ্চিহ্ন করার রক্তাক্ত অধ্যায়
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ভোরে ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাসভবনে সশস্ত্র সেনাসদস্যদের হামলায় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, তাঁর স্ত্রী বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিব, তিন ছেলে এবং পরিবারের আরও কয়েকজন সদস্য নিহত হন। বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা সে সময় দেশের বাইরে থাকায় প্রাণে বেঁচে যান।
এরপর ক্ষমতার পালাবদল ঘটে এবং খন্দকার মোশতাক আহমদ রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন। বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের দায়মুক্তি দিতে জারি করা হয় ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ। এর ফলে হত্যাকারীদের বিচারের পথ দীর্ঘ সময়ের জন্য কার্যত বন্ধ হয়ে যায়।
ঘটনার এখানেই শেষ হয়নি। ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি অবস্থায় মুক্তিযুদ্ধকালীন জাতীয় চার নেতা—তাজউদ্দীন আহমদ, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী এবং এএইচএম কামারুজ্জামান—হত্যার শিকার হন।
পরবর্তী সামরিক শাসনামলে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তি পুনরায় রাজনৈতিক পরিসরে জায়গা পেতে শুরু করে। এই পরিবর্তন বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় আদর্শ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক উত্তরাধিকার নিয়ে নতুন সংঘাতের ভিত্তি তৈরি করে।
২০০১–২০০৬: বিএনপি–জামায়াত জোট ও রাজনৈতিক সংঘাতের নতুন পর্যায়
২০০১ সালে বিএনপি–জামায়াত জোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর জামায়াতে ইসলামীর কয়েকজন নেতা মন্ত্রিসভায় স্থান পান। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি বাহিনীর সহযোগী হিসেবে অভিযুক্ত একটি রাজনৈতিক শক্তির রাষ্ট্রক্ষমতায় প্রত্যাবর্তন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ বিতর্ক সৃষ্টি করে।
এই সময় দেশের বিভিন্ন এলাকায় হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা, বাড়িঘর ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে আক্রমণ, মন্দিরে হামলা, ধর্ষণ ও সম্পত্তি দখলের অভিযোগ ওঠে। একই সময়ে জঙ্গিবাদী সংগঠনগুলোর তৎপরতাও উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
এই সময়ের সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনাগুলোর একটি ছিল ২১ আগস্ট ২০০৪-এর গ্রেনেড হামলা। ঢাকার বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের সমাবেশে শেখ হাসিনাকে লক্ষ্য করে গ্রেনেড হামলা চালানো হয়। শেখ হাসিনা প্রাণে বেঁচে গেলেও আওয়ামী লীগের মহিলা বিষয়ক সম্পাদক আইভি রহমানসহ ২৪ জন নিহত হন এবং শত শত মানুষ আহত হন।
পরবর্তী বিচারিক কার্যক্রমে হামলার সঙ্গে জঙ্গি ও রাজনৈতিক ব্যক্তিদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠে আসে। আদালতের রায়েও একাধিক ব্যক্তিকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। ফলে ২১ আগস্টের ঘটনা বাংলাদেশের রাজনৈতিক সহিংসতার ইতিহাসে একটি গভীর বিভাজনরেখা হয়ে থাকে।
৫ আগস্ট ২০২৪: নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা
২০২৪ সালের জুলাইয়ে শুরু হওয়া কোটা সংস্কার আন্দোলন ক্রমে বৃহত্তর সরকারবিরোধী আন্দোলনে রূপ নেয়। ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করে দেশ ত্যাগ করেন। এরপর একটি অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে।
এরপর বাংলাদেশে রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতার নতুন অধ্যায় শুরু হয়। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ও সমর্থকদের বিরুদ্ধে হামলা, গ্রেপ্তার ও মামলা যেমন বেড়ে যায়, তেমনি বিভিন্ন স্থানে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বাড়িঘর, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় স্থাপনায় হামলার খবরও প্রকাশিত হয়।
হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদসহ বিভিন্ন সংগঠন এ সময়ে বিপুলসংখ্যক সাম্প্রদায়িক হামলার অভিযোগ তোলে। বিভিন্ন এলাকায় মন্দির ও উপাসনালয় ভাঙচুর, বাড়িঘর লুটপাট এবং ভূমি দখলের অভিযোগও সামনে আসে। সুফি মাজার ও দরগাহ, আহমদিয়া সম্প্রদায় এবং অন্যান্য সংখ্যালঘু গোষ্ঠীও হামলার অভিযোগ করে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দুর্বলতার সুযোগে বিভিন্ন স্থানে মব জাস্টিস বা জনতার হাতে বিচারও উদ্বেগজনকভাবে সামনে আসে। এসব ঘটনা বাংলাদেশের ধর্মীয় সম্প্রীতি ও সামাজিক সহাবস্থানের ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি করে।
তিনটি ঘটনার মধ্যে ধারাবাহিকতা কোথায়?
এই বিশ্লেষণের মূল বক্তব্য হলো—১৫ আগস্ট ১৯৭৫, ২১ আগস্ট ২০০৪ এবং ৫ আগস্ট ২০২৪-কে শুধু আলাদা আলাদা রাজনৈতিক ঘটনা হিসেবে দেখলে বাংলাদেশের দীর্ঘ রাজনৈতিক সংঘাতের প্রকৃতি পুরোপুরি বোঝা যায় না।
এই দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী, ১৯৭১ সালে যারা বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রচিন্তার বিরোধিতা করেছিল, তাদের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন রূপে ফিরে এসেছে। কখনও তা সামরিক শাসনের মাধ্যমে, কখনও রাজনৈতিক জোটের মাধ্যমে, কখনও জঙ্গিবাদী সহিংসতার মাধ্যমে এবং কখনও রাজপথের সংঘাত ও সামাজিক মেরুকরণের মাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে।
বঙ্গবন্ধুর পরিবারকে ঘিরে সংঘাতও এই ধারাবাহিকতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু ও তাঁর অধিকাংশ পরিবারের সদস্যকে হত্যার পর শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা বেঁচে ছিলেন। পরবর্তী সময়ে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ আবার রাষ্ট্রক্ষমতায় ফিরে আসে এবং ১৯৭১ সালের যুদ্ধাপরাধের বিচারসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ গ্রহণ করে। ফলে বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকে ঘিরে বিরোধও নতুন মাত্রা পায়।
বাংলাদেশের সামনে বড় প্রশ্ন
বাংলাদেশের জন্ম হয়েছিল একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আদর্শকে কেন্দ্র করে—স্বাধীনতা, জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা এবং সব নাগরিকের সমান মর্যাদা। কিন্তু স্বাধীনতার পর থেকেই এসব আদর্শ নিয়ে রাজনৈতিক সংঘাত অব্যাহত রয়েছে।
আজকের প্রশ্ন শুধু কে ক্ষমতায় থাকবে, তা নয়। আরও মৌলিক প্রশ্ন হলো—বাংলাদেশ কোন ধরনের রাষ্ট্র হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করবে?
একটি রাষ্ট্র যেখানে ধর্ম, রাজনৈতিক মত বা পরিচয়ের কারণে কোনো নাগরিক নিরাপত্তাহীন হবে না; যেখানে রাজনৈতিক বিরোধিতার জবাব হবে নির্বাচনী ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায়; যেখানে বিচার হবে প্রমাণ ও আইনের ভিত্তিতে; এবং যেখানে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও রাষ্ট্রের বহুত্ববাদী চরিত্র রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হবে না—সেই বাংলাদেশই কি ভবিষ্যতের লক্ষ্য?
অথবা রাজনৈতিক সংঘাত, প্রতিহিংসা, সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ ও সহিংসতার ধারাবাহিকতা আরও গভীর হবে?
১৫ আগস্ট ১৯৭৫, ২১ আগস্ট ২০০৪ এবং ৫ আগস্ট ২০২৪—এই তিনটি তারিখ তাই বাংলাদেশের সামনে একই মৌলিক প্রশ্ন রেখে যায়: মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে যে রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছিল, তার অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক ও বহুত্ববাদী চরিত্র কি শেষ পর্যন্ত টিকে থাকবে, নাকি রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও বিভাজনের ধারাবাহিকতায় তা ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যাবে?