বাংলাদেশে বর্তমানে স্থাপিত বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ২৮ হাজার মেগাওয়াটেরও বেশি। কিন্তু বর্তমান বিএনপি সরকারের আমলে বাস্তবে অনেক দিনই উৎপাদন ১৩ থেকে ১৪ হাজার মেগাওয়াটের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে, যেখানে গ্রীষ্মকালের সর্বোচ্চ চাহিদা ১৬ হাজার ৫০০ থেকে ১৭ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যাচ্ছে। ফলে প্রতিদিনই গড়ে ২ থেকে ৩ হাজার মেগাওয়াট, কখনও তারও বেশি বিদ্যুতের ঘাটতি তৈরি হচ্ছে।
এই ঘাটতির সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী দেশের গ্রামীণ জনপদ। দেশের অসংখ্য গ্রামে প্রতিদিন ৮ থেকে ১৪ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকে না; কোথাও কোথাও এই সময় আরও দীর্ঘ। সরকারি ছুটির দিন কিংবা গভীর রাতেও লোডশেডিং থেকে রেহাই মিলছে না। পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ (পিজিসিবি)-এর তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে সাপ্তাহিক ছুটির দিনগুলোতে গড় লোডশেডিং ২ হাজার মেগাওয়াট অতিক্রম করেছে। শেরপুর, সিলেট ও বাগেরহাটসহ বিভিন্ন জেলার অনেক এলাকায় চাহিদার মাত্র ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ বিদ্যুৎ সরবরাহ করা যাচ্ছে।
রূপপুরের অগ্রগতি, কিন্তু অন্ধকারে সাধারণ মানুষ
দেশের অন্যতম বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্প রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ইতোমধ্যে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি অর্জন করেছে। জ্বালানি লোডিং সম্পন্ন হয়েছে এবং ২০২৬ সালে ধাপে ধাপে উৎপাদন শুরু হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে সাধারণ মানুষের জীবনে এর সুফল এখনও দৃশ্যমান নয়।
বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর কাছে প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকার বকেয়া, জ্বালানি সংকট, গ্যাস সরবরাহের ঘাটতি এবং আমদানি-সংক্রান্ত জটিলতার কারণে অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না; কিছু কেন্দ্র কার্যত অলস পড়ে রয়েছে।
সমালোচকদের মতে, এটি কেবল পরিস্থিতিগত সংকট নয়; বরং পরিকল্পনার ঘাটতি, সমন্বয়হীনতা এবং নীতিগত দুর্বলতার বহিঃপ্রকাশ।
অন্ধকারে সাধারণ মানুষের জীবন
এই সংকটের প্রকৃত মূল্য দিচ্ছে দেশের সাধারণ মানুষ।
গ্রামের অসংখ্য পরিবার প্রচণ্ড গরমে পাখা ছাড়া রাত কাটাতে বাধ্য হচ্ছে। শিশুরা ঘুমাতে পারছে না, বয়স্করা স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছেন, আর পরীক্ষার্থী শিক্ষার্থীরা পড়াশোনায় মনোযোগ ধরে রাখতে হিমশিম খাচ্ছে।
বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে অনেক হাসপাতালও নিরবচ্ছিন্ন সেবা দিতে হিমশিম খাচ্ছে, যা রোগীদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি করছে। ছোট ব্যবসায়ীরা দোকান আগেভাগে বন্ধ করতে বাধ্য হচ্ছেন, ফলে আয় কমে যাচ্ছে। অন্যদিকে কৃষকরা সেচ পাম্প চালাতে না পেরে কৃষিকাজে মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়ছেন।
এটাই আজ বাংলাদেশের বহু মানুষের প্রতিদিনের বাস্তবতা।
সমালোচকদের মতে, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা যেকোনো সরকারের মৌলিক দায়িত্ব। অথচ বর্তমান পরিস্থিতিতে শহর ও গ্রামের মধ্যে বিদ্যুৎ বণ্টনে বৈষম্যের অভিযোগও বাড়ছে। তুলনামূলকভাবে শহরাঞ্চল কিছুটা অগ্রাধিকার পেলেও গ্রামীণ জনগণকে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎহীন অবস্থায় থাকতে হচ্ছে।
এটি কেবল সাময়িক অসুবিধা নয়; বরং লাখো মানুষের শিক্ষা, কর্মসংস্থান, ব্যবসা ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রার ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলছে।
অর্থনীতির ওপর গভীর আঘাত
দীর্ঘস্থায়ী বিদ্যুৎ সংকট বাংলাদেশের অর্থনীতির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খাতকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
তৈরি পোশাক শিল্প
দেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান উৎস তৈরি পোশাক (আরএমজি) শিল্পে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে উৎপাদনসূচি ভেঙে পড়ছে, ব্যয় বাড়ছে এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের নির্ধারিত সময়ে পণ্য সরবরাহ করা কঠিন হয়ে পড়ছে। এর ফলে বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের নির্ভরযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসা
ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা বাধ্য হয়ে ব্যয়বহুল ডিজেল জেনারেটরের ওপর নির্ভর করছেন। এতে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে, লাভ কমে যাচ্ছে এবং অনেক প্রতিষ্ঠান টিকে থাকার লড়াইয়ে পড়ছে।
কৃষি
বিদ্যুতের অনিয়মিত সরবরাহের কারণে সেচব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। সময়মতো সেচ না পাওয়ায় ফসল উৎপাদন ঝুঁকির মুখে পড়ছে, যা খাদ্যনিরাপত্তা ও মূল্যস্ফীতির ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
ডিজিটাল অর্থনীতি
তথ্যপ্রযুক্তি, ফ্রিল্যান্সিং, কল সেন্টার এবং স্টার্টআপ খাতও বিদ্যুৎ সংকটে ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেটের ওপর নির্ভরশীল এই খাতগুলোতে উৎপাদনশীল সময় নষ্ট হচ্ছে, বিদেশি ক্লায়েন্ট হারানোর ঝুঁকি বাড়ছে এবং বৈদেশিক আয় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
সংকট উত্তরণে করণীয়
এই সংকট দীর্ঘায়িত হলে দেশের অর্থনীতি ও জনজীবনের ওপর এর প্রভাব আরও গভীর হতে পারে। তাই বিদ্যুৎ উৎপাদন অব্যাহত রাখতে দ্রুত বকেয়া পরিশোধ, জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা, বিদ্যুৎ বণ্টনে ভারসাম্য আনা এবং নতুন উৎপাদন সক্ষমতা দ্রুত কার্যকর করার উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।
স্বল্পমেয়াদি সমাধানের পরিবর্তে জ্বালানির বহুমুখীকরণ, দক্ষ ব্যবস্থাপনা, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং জবাবদিহিমূলক নীতিমালা গ্রহণই হতে পারে টেকসই সমাধানের পথ।
বাংলাদেশের মানুষ নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ পাওয়ার অধিকার রাখে। কোনো পরিবার যেন অন্ধকারে রাত কাটাতে বাধ্য না হয়, কোনো শিক্ষার্থীর পড়াশোনা বা কোনো ব্যবসায়ীর জীবিকা যেন বিদ্যুৎ সংকটের কারণে থমকে না যায়—সেটিই হওয়া উচিত রাষ্ট্রের অগ্রাধিকার।
দেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়ন নির্ভর করছে নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপর। সেই লক্ষ্য অর্জনে কার্যকর, দায়িত্বশীল ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ এখন সময়ের দাবি।