Menu
Back to timeline

*২৩ জুন ১৯৯৬* : শেখ হাসিনা প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন

*২৩ জুন ১৯৯৬* : শেখ হাসিনা প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন

১৯৯৬ সালের ২৩ জুন বাংলাদেশে একটি ঐতিহাসিক অধ্যায় রচিত হয়। এই দিন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনা প্রথমবারের মতো দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। এটি ছিল শুধু একটি রাজনৈতিক পালাবদল নয়, বরং স্বাধীনতা যুদ্ধের অন্যতম নেতৃত্বদানকারী দল আওয়ামী লীগের জন্য এক দীর্ঘ সংগ্রামের সফল পরিণতি। এই ঘটনাটি শুধু শেখ হাসিনার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়নি, বরং বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসেও একটি মাইলফলক হয়ে ওঠে।

পটভূমি: দীর্ঘ প্রতীক্ষা ও রাজনৈতিক সংগ্রাম

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর বাংলাদেশে দীর্ঘ সময় ধরে সামরিক শাসন ও একনায়কতান্ত্রিক শাসনের প্রবল দাপট চলেছে। আওয়ামী লীগ কার্যত রাজনীতি থেকে ছিটকে পড়ে। দেশের রাজনীতিতে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তি ও সামরিক শাসনের হাতবদল চলতে থাকে।

১৯৮১ সালে ভারত থেকে নির্বাসন শেষে দেশে ফিরে শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব নেন। তখন থেকেই শুরু হয় একটি ভিন্ন ধারার গণতান্ত্রিক রাজনীতির পুনরুত্থান। সামরিক স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন, জেল-জুলুম, বহুবার হামলার মুখোমুখি হওয়া সত্ত্বেও শেখ হাসিনা দৃঢ়ভাবে নেতৃত্ব দেন। বিশেষ করে ১৯৯০ সালের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে তার ভূমিকা ছিল অবিস্মরণীয়।

১৯৯৬ সালের নির্বাচন: ২১ বছরের অপেক্ষার অবসান

১৯৯১ সালের সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পরাজিত হলেও সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠায় শেখ হাসিনার নেতৃত্ব প্রশংসিত হয়। পরবর্তী সময়ে, ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ‘ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠার’ আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়। এর ফলে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তিত হয়—যা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন।

১৯৯৬ সালের ১২ জুন অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করে। ১৫৪টি আসন নিয়ে তারা সরকার গঠনের ক্ষমতা অর্জন করে এবং ২৩ জুন ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। উল্লেখ্য, ২৩ জুন তারিখটি ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ১৯৪৯ সালের এই দিনেই বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।

শপথ গ্রহণের তাৎপর্য

২৩ জুন ১৯৯৬ সালে বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি বিচারপতি শাহাবুদ্দিন আহমদ শেখ হাসিনাকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ পাঠ করান। এ সময় দেশ-বিদেশের গণমাধ্যমের নজর ছিল বাংলাদেশে। শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন কূটনীতিক, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও বিশিষ্টজনেরা। এর মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধুর কন্যা হিসেবে শেখ হাসিনা ২১ বছরের প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে পুনরায় গণতান্ত্রিক বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সরকার প্রতিষ্ঠা করেন।

প্রথম মেয়াদের প্রধান অর্জনসমূহ

শেখ হাসিনার প্রথম মেয়াদে সরকার বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করে, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:

  1. গঙ্গা পানি চুক্তি (১৯৯৬): ভারতের সঙ্গে ৩০ বছরের দীর্ঘ গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তি স্বাক্ষর হয়, যা দুই দেশের সম্পর্কে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।

  2. শান্তি চুক্তি (১৯৯৭): পার্বত্য চট্টগ্রামের দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত অবসানে ঐতিহাসিক শান্তি চুক্তি স্বাক্ষর হয়।

  3. বিদ্যুৎ ও অবকাঠামো উন্নয়ন: বিদ্যুৎ খাতে বিনিয়োগ ও অবকাঠামো উন্নয়নে গতি আসে।

  4. শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে অগ্রগতি: বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক বিতরণ, নারী শিক্ষায় অগ্রাধিকার, এবং স্বাস্থ্যসেবার সম্প্রসারণ করা হয়।

প্রতিক্রিয়া ও গুরুত্ব

শেখ হাসিনার প্রথমবার ক্ষমতায় আসা শুধু আওয়ামী লীগের জন্য নয়, পুরো দেশের গণতান্ত্রিক ধারা পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হয়। তার শপথ গ্রহণ একদিকে যেমন রাজনৈতিক ইতিহাসের ধারাকে পরিবর্তন করেছে, অন্যদিকে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ দিক নির্দেশনায়ও ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে।

আজ যখন ২৩ জুন স্মরণ করা হয়, তখন সেটি শুধুই একটি নির্বাচনী জয় বা শপথ গ্রহণ নয়—বরং এটি বাংলাদেশের গণতন্ত্র, সংগ্রাম ও উন্নয়নের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবেই বিবেচিত হয়। শেখ হাসিনার এই প্রথম শপথ ছিল নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচনের সূচনা, যা পরবর্তীতে বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ও আন্তর্জাতিক মর্যাদা বৃদ্ধিতে বিশাল ভূমিকা রেখেছে।

More from the timeline

View all