২০২৫ সালের বাংলাদেশ আর গণতন্ত্র নয়—এটি এখন ভয়, সহিংসতা ও বিশ্বাসঘাতকতায় বন্দী এক দেশ। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অবৈধ অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ছায়াতলে স্বাধীনতার স্বপ্ন পরিণত হয়েছে দুঃস্বপ্নে। মানবাধিকার শুধু লঙ্ঘিতই নয়, তা ধ্বংসপ্রাপ্ত। সাংবাদিকরা হয়ে উঠেছেন শিকার, কর্মীরা রাষ্ট্রের শত্রু, আর সাধারণ মানুষ বাস করছে সেই আতঙ্কে যেখানে আইন নয়, জনতা ও সশস্ত্র গোষ্ঠী নির্ধারণ করছে ন্যায়বিচার।
মানবাধিকার কি ভেঙে পড়ছে?
রাষ্ট্রযন্ত্র যা মানুষের সুরক্ষায় থাকার কথা, তা আজ ক্ষমতার দাসে পরিণত। আদালত গণমোবের চাপে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, পুলিশ রাজনৈতিক প্রতিহিংসার হাতিয়ার হয়ে উঠেছে, সেনাবাহিনী দাঁড়িয়ে থেকেও নিশ্চুপ। আইনের শাসনের জায়গা নিয়েছে ভয় আর নীরবতা। ভিন্নমত প্রকাশের মূল্য এখন শুধু কারাবাস নয়—অপহরণ, নির্যাতন কিংবা মৃত্যু।
মতপ্রকাশের স্বাধীনতা: সত্য বলা এখন অপরাধ
আগস্ট ২০২৪ থেকে জুলাই ২০২৫-এর মধ্যে ৪৯৬ সাংবাদিক হয়রানির শিকার হয়েছেন, তিনজন নিহত হয়েছেন। সাংবাদিক ও লেখকদের বিরুদ্ধে মিথ্যা হত্যা ও হামলার মামলা দেওয়া হচ্ছে, স্থানীয় সংবাদকর্মীদের জড়ানো হচ্ছে অতীত রাজনৈতিক অস্থিরতার ঘটনার সঙ্গে। ঢাকাসহ সিলেট, চট্টগ্রাম ও বিভিন্ন জেলায় সাংবাদিকদের ওপর একযোগে মামলা চাপিয়ে দিয়ে মতপ্রকাশের অধিকারকে অপরাধে পরিণত করা হয়েছে।
প্রেস কার্ড বাতিল, সংবাদপত্রে হামলা, সম্পাদকের অপসারণ—সবকিছু মিলিয়ে অন্তত ১৫০ জন সংবাদকর্মী জীবিকা হারিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে গুজব ছড়ানো হচ্ছে, অথচ রাষ্ট্র এ বিষয়ে উদাসীন। সেনাবাহিনীও নীরব দর্শক, ফলে সাংবাদিকতার জায়গা পরিণত হয়েছে ভয় ও আতঙ্কের প্রতীকে।
আদালতের নিয়ন্ত্রণ: ন্যায়বিচারের পরিবর্তে ভয়
বাংলাদেশের আদালত এখন আর ন্যায়বিচারের প্রতীক নয়; বরং ক্ষমতার খেলায় বলি হচ্ছে সাধারণ মানুষ। শিশু থেকে ব্যবসায়ী—যেকেউ মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে পড়ছে। গোপালগঞ্জসহ বিভিন্ন জেলায় নিরীহ মানুষকে গ্রেপ্তার, ভয় দেখানো এবং ঘুষ না দিলে মামলায় ফাঁসানো হচ্ছে। আদালতের সাক্ষ্য সাজানো, প্রমাণ জালিয়াতি—সবই এখন নিয়মিত চিত্র।
রাজনৈতিক সহিংসতা ও নাগরিক অধিকার হরণের চিত্র
২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর থেকে রাজনৈতিক সহিংসতা ভয়াবহ আকার নিয়েছে। বিরোধী পক্ষ ও চরমপন্থীরা দমনহীনভাবে সহিংসতা চালাচ্ছে। শান্তিপূর্ণ মিছিলও রক্তাক্ত হচ্ছে, পুলিশ ও সশস্ত্র গোষ্ঠী একসঙ্গে বিরোধী কণ্ঠস্বর দমন করছে। সংখ্যালঘু সম্প্রদায় বিশেষভাবে আক্রান্ত; মন্দির, মাজার, এমনকি মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিস্তম্ভও ধ্বংস করা হচ্ছে।
নারীর অধিকার: মৌলবাদী তাণ্ডব
চরমপন্থী ইসলামপন্থীরা নারীদের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে উন্মুক্ত যুদ্ধে নেমেছে। পোশাক, শিক্ষা কিংবা কর্মজীবনে নারীদের ভূমিকার কারণে তাদের আক্রমণ করা হচ্ছে। নারী সাংবাদিক, শিক্ষার্থী ও পেশাজীবীরা ক্রমশ জনপরিসর থেকে সরে যাচ্ছেন। নীরব রাষ্ট্র, ভীত আদালত—সব মিলিয়ে নারীরা এখন অবরুদ্ধ।
সংখ্যালঘু ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ওপর হামলা
২০২৫ সালের প্রথমার্ধেই ২৫৮টি সাম্প্রদায়িক হামলার ঘটনা ঘটেছে। রংপুরে হিন্দু পরিবারগুলোর ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে, মন্দির ভাঙা হয়েছে, মুক্তিযুদ্ধ ও বেগম রোকেয়ার স্মৃতিস্তম্ভ ধ্বংস করা হয়েছে। রাষ্ট্রীয় নীরবতা এসব হামলাকে বৈধতা দিচ্ছে, আর সংখ্যালঘুরা দিন দিন অসহায় হয়ে পড়ছে।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ভূমিকা: শেষ আশার আলো
দেশের নাগরিকরা এখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দিকে চেয়ে আছে। জাতিসংঘ, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালসহ বৈশ্বিক সংস্থাগুলোর প্রতিবাদ থাকলেও বাস্তব পদক্ষেপ না থাকায় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হচ্ছে। কূটনৈতিক চাপ, মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায়ে নিষেধাজ্ঞা এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ এখন জরুরি। নাহলে মানবাধিকার ধ্বংস, মৌলবাদী উত্থান এবং ভয়কে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা বাংলাদেশ স্থায়ী বাস্তবতায় পরিণত হবে।
বাংলাদেশের আজকের বাস্তবতা ভয়াবহ—স্বাধীনতা নেই, নিরাপত্তা নেই, ন্যায় নেই। সত্য বলা অপরাধ, নীরব থাকা বেঁচে থাকার উপায়। গণতন্ত্রের স্বপ্ন আজ রক্ত ও অন্ধকারে ঢেকে গেছে।