২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হয় বাংলাদেশের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে টানা চতুর্থবারের মতো সরকার গঠনের সুযোগ লাভ করে। এ নির্বাচন ছিল বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় এবং রাজনৈতিক দিক দিয়ে নানা চ্যালেঞ্জ ও বিতর্কের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠিত হয়। নিচে এই নির্বাচনের প্রেক্ষাপট, ফলাফল, প্রতিক্রিয়া ও গুরুত্ব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
নির্বাচন পূর্ব প্রেক্ষাপট
দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অঙ্গন উত্তপ্ত হয়ে ওঠে ২০২৩ সালের মাঝামাঝি থেকেই। বিরোধী দল বিএনপি ও তাদের মিত্ররা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন দাবিতে আন্দোলন জোরদার করে। সরকার এই দাবি প্রত্যাখ্যান করে সংবিধান অনুযায়ী ক্ষমতাসীন সরকারের অধীনেই নির্বাচন আয়োজনের ঘোষণা দেয়। এ প্রেক্ষিতে বিএনপি এবং কয়েকটি দল নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেয়। তবে জাতীয় পার্টিসহ বেশ কিছু নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল নির্বাচনে অংশ নেয়।
নির্বাচন এবং ফলাফল
৭ জানুয়ারি ২০২৪, নির্বাচন কমিশনের তত্ত্বাবধানে সারাদেশে ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি ছিল তুলনামূলক কম – অনেক স্থানে ৩০-৪০% এর মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। বিএনপি এবং তাদের জোটের অনুপস্থিতিতে আওয়ামী লীগ প্রার্থীরা অধিকাংশ আসনে সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন আওয়ামী লীগ মনোনীত স্বতন্ত্র বা অন্যান্য দলীয় প্রার্থীদের সঙ্গে।
ফলাফল অনুযায়ী, আওয়ামী লীগ এককভাবে ২২৩টি আসনে জয়লাভ করে, যা সংসদে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ১৫১ সংখ্যাগরিষ্ঠতার অনেক বেশি। জাতীয় পার্টি ১১টি আসন পায়, আর অন্যান্য ছোট দল ও স্বতন্ত্ররা মিলে পায় বাকি আসন। নির্বাচনে অংশ নেওয়া অন্যান্য দলগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি, জাসদ, তরীকত ফেডারেশন প্রভৃতি আওয়ামী লীগের জোটসঙ্গী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেয় এবং সামান্য কিছু আসন লাভ করে।
শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সরকার গঠন
নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পর আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা চতুর্থবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। এ নিয়ে তিনি পাঁচবার দেশের প্রধানমন্ত্রী হলেন – যার মধ্যে টানা চারবার (২০০৯, ২০১৪, ২০১৮, এবং ২০২৪)। এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি অনন্য রেকর্ড।
নতুন সরকারের মন্ত্রিসভা গঠনেও কিছু চমক দেখা যায় – নতুন মুখের পাশাপাশি অভিজ্ঞ নেতাদের সমন্বয়ে একটি ‘পরিবর্তন ও ধারাবাহিকতার’ বার্তা বহন করে নতুন মন্ত্রিসভা। সরকার অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, প্রযুক্তি এবং দুর্নীতি দমনকে অগ্রাধিকার হিসেবে চিহ্নিত করে কর্মপরিকল্পনা ঘোষণা করে।
আন্তর্জাতিক ও দেশীয় প্রতিক্রিয়া
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতিক্রিয়া মিশ্র ছিল। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং, রাশিয়ার ভ্লাদিমির পুতিন এবং অনেক মধ্যপ্রাচ্যের দেশ নির্বাচন ফলাফলকে স্বাগত জানায় এবং শেখ হাসিনাকে অভিনন্দন জানান। তবে ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং যুক্তরাষ্ট্রসহ কয়েকটি দেশ নির্বাচনের স্বচ্ছতা ও অংশগ্রহণ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে এবং রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবেশের ওপর গুরুত্বারোপ করে।
নির্বাচন সম্পর্কিত বিতর্ক ও সমালোচনা
বিএনপি এবং অন্যান্য বিরোধী দল এই নির্বাচনকে ‘একতরফা’ ও ‘নির্বাচনের নামে প্রহসন’ বলে অভিহিত করে। নির্বাচনের দিন কিছু কেন্দ্রে অনিয়ম ও সহিংসতার অভিযোগও ওঠে, যদিও নির্বাচন কমিশন তা অস্বীকার করে। পর্যবেক্ষক সংগঠনগুলোর মধ্যে কিছু সংস্থা নির্বাচনকে মোটামুটি শান্তিপূর্ণ বললেও, অনেক আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক নির্বাচন প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণহীনতার কারণে প্রকৃত প্রতিনিধিত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলে।
উপসংহার
২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতা রক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলেও, এর প্রকৃত অন্তর্ভুক্তিমূলকতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই গেছে। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে গঠিত চতুর্থ দফার সরকারকে সামনে রয়েছে অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ, সুশাসন প্রতিষ্ঠা, তরুণদের কর্মসংস্থান, এবং রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে আস্থা পুনঃস্থাপনের দায়িত্ব। সরকার এসব চ্যালেঞ্জ কীভাবে মোকাবিলা করে, তার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করবে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ গণতান্ত্রিক পথচলা।