২০২০ সালের মার্চ মাসে বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অনন্য ও স্মরণীয় অধ্যায় রচিত হয় — শুরু হয় ‘মুজিব বর্ষ’ উদযাপন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে। বাংলাদেশ সরকার ২০২০ সালের ১৭ মার্চ থেকে ২০২১ সালের ১৬ মার্চ পর্যন্ত সময়টিকে ‘মুজিব বর্ষ’ হিসেবে ঘোষণা করে। এটি শুধু একটি জন্মদিন পালনের অনুষ্ঠান ছিল না, বরং ছিল জাতির ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংগ্রাম এবং বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে নতুন প্রজন্মের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়ার এক ঐতিহাসিক প্রয়াস।
মুজিব বর্ষ ঘোষণার প্রেক্ষাপট
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গিপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্থপতি এবং বাঙালি জাতির মুক্তির প্রতীক। তাঁর জন্মশতবার্ষিকীকে যথাযোগ্য মর্যাদায় উদযাপন করতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে একটি জাতীয় কমিটি গঠন করা হয়। এর প্রধান উপদেষ্টা ছিলেন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা এবং কার্যনির্বাহী কমিটির নেতৃত্ব দেন জাতির প্রখ্যাত ব্যক্তিত্বরা।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠান
২০২০ সালের ১৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন উপলক্ষে রাজধানী ঢাকার জাতীয় প্যারেড স্কয়ারে একটি বৃহৎ উদ্বোধনী অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। করোনাভাইরাস মহামারির কারণে মূল অনুষ্ঠান ভার্চুয়ালি সম্প্রচারিত হয় এবং বিদেশি অতিথিদের উপস্থিতি সীমিত রাখা হয়। তবে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসসহ বহু বিশ্বনেতা ভিডিও বার্তার মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধা জানান।
মুজিব বর্ষের কার্যক্রম
মুজিব বর্ষ উপলক্ষে সরকার এবং বেসরকারি পর্যায়ে বহু পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। উল্লেখযোগ্য কিছু কার্যক্রম নিচে তুলে ধরা হলো:
-
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বঙ্গবন্ধু কর্নার স্থাপন: দেশের হাজার হাজার স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে বঙ্গবন্ধুর জীবন ও আদর্শ তুলে ধরতে স্থাপন করা হয় ‘বঙ্গবন্ধু কর্নার’।
-
ডিজিটাল আর্ট ও ডকুমেন্টারি: বঙ্গবন্ধুর জীবনভিত্তিক অ্যানিমেশন, ডকুমেন্টারি ও তথ্যচিত্র নির্মাণ করা হয়, যাতে নতুন প্রজন্ম সহজে তাঁর সংগ্রামের ইতিহাস জানতে পারে।
-
মুজিব গ্রন্থমালা প্রকাশ: বঙ্গবন্ধুর উপর ভিত্তি করে নতুন ও সংকলিত বহু বই প্রকাশ করা হয় বাংলা একাডেমি ও অন্যান্য প্রকাশনা সংস্থা থেকে।
-
গৃহহীনদের জন্য ঘর নির্মাণ: বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন "গ্রাম হবে শহর" – এর প্রতিফলন ঘটিয়ে গৃহহীনদের জন্য লাখো ঘর নির্মাণ করে উপহার দেওয়া হয়, যা মানবিক দৃষ্টান্ত হয়ে ওঠে।
-
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ডিজিটাল ইউনিভার্সিটি ও আইটি প্রকল্প: প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা ও উন্নয়ন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয় মুজিব বর্ষ উপলক্ষে।
আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি
মুজিব বর্ষকে কেন্দ্র করে UNESCO (ইউনেস্কো) বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীকে আন্তর্জাতিকভাবে পালনের সিদ্ধান্ত নেয়। এটি ছিল বাংলাদেশের জন্য একটি বিরল সম্মান।
উপসংহার
মুজিব বর্ষ ছিল কেবল একটি স্মরণোৎসব নয়, বরং জাতির আত্মপরিচয়, গৌরব, আদর্শ এবং ভবিষ্যতের প্রেরণা অর্জনের এক মহাযাত্রা। বঙ্গবন্ধুর জীবন ও দর্শনকে সামনে রেখে এই বর্ষ উদযাপন নতুন প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধ ও গণতন্ত্রের চেতনায় উদ্বুদ্ধ করেছে। মুজিব বর্ষের মূল বার্তা ছিল — “তোমার আদর্শ, আমাদের প্রেরণা।”