২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোটের ঐতিহাসিক বিজয়ের পর ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে টানা তৃতীয়বারের মতো সরকার গঠিত হয়। এটি ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা, কারণ এই প্রথমবারের মতো কোনো সরকার পরপর তিন মেয়াদে নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসে। শেখ হাসিনা হয়ে ওঠেন বাংলাদেশের সবচেয়ে দীর্ঘসময় ক্ষমতায় থাকা নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী।
মন্ত্রিসভা গঠন ও বৈশিষ্ট্য
২০১৯ সালের ৭ জানুয়ারি রাষ্ট্রপতি মোঃ আবদুল হামিদ নতুন মন্ত্রিসভার সদস্যদের শপথবাক্য পাঠ করান। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে গঠিত চতুর্থ মন্ত্রিসভায় ছিল বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন। এতে নতুন মুখের সংখ্যা ছিল উল্লেখযোগ্য এবং অনেক অভিজ্ঞ নেতাকে সরিয়ে তরুণ ও কর্মক্ষম ব্যক্তিদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। মোট ৪৭ সদস্যের মন্ত্রিসভায় ছিল ২৪ জন মন্ত্রী, ১৯ জন প্রতিমন্ত্রী এবং ৩ জন উপমন্ত্রী।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই সরকার গঠনের সময় জাতীয় পার্টি বিরোধী দলের ভূমিকা গ্রহণ করে, যদিও তারা নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অংশীদার হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিল।
সরকারের অগ্রাধিকার
নতুন মেয়াদে শেখ হাসিনার সরকার যে অঙ্গীকার ও অগ্রাধিকারগুলো ঘোষণা করে, তার মধ্যে প্রধান ছিল:
-
দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স: শেখ হাসিনা দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান ঘোষণা করেন এবং প্রশাসনের প্রতিটি স্তরে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার উদ্যোগ গ্রহণ করেন।
-
উন্নয়নের ধারাবাহিকতা: অবকাঠামো, যোগাযোগ, বিদ্যুৎ, তথ্যপ্রযুক্তি ও স্বাস্থ্য খাতে পূর্ববর্তী সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড আরও গতিশীলভাবে চালিয়ে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়।
-
‘রূপকল্প ২০২১’ এবং ‘রূপকল্প ২০৪১’ বাস্তবায়ন: ডিজিটাল বাংলাদেশ নির্মাণ, মধ্যম আয়ের দেশে উত্তরণ এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে কাজ করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করা হয়।
-
মানবসম্পদ উন্নয়ন: শিক্ষা ও দক্ষতা বৃদ্ধির মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং যুব সমাজকে প্রযুক্তিগতভাবে দক্ষ করে গড়ে তোলার উপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া
আওয়ামী লীগের টানা তৃতীয় মেয়াদে সরকার গঠনের ঘটনাকে দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে একদিকে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রতীক হিসেবে দেখা হয়, আবার অন্যদিকে নির্বাচন ঘিরে বিরোধীদলের অভিযোগ ও বিতর্কও আলোচনায় আসে। অনেক আন্তর্জাতিক সংস্থা ও কিছু পশ্চিমা রাষ্ট্র নির্বাচনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুললেও, আঞ্চলিক দেশগুলো (যেমন ভারত, চীন) শেখ হাসিনার নেতৃত্বে গঠিত নতুন সরকারকে দ্রুত অভিনন্দন জানায়।
চ্যালেঞ্জসমূহ
নতুন সরকারের সামনে তখন কিছু বড় চ্যালেঞ্জ ছিল:
-
রাজনৈতিক বিরোধিতা মোকাবিলা: বিরোধী দলগুলোর নির্বাচন ও সংসদ নিয়ে অনাস্থার কারণে কার্যকর গণতন্ত্রের পরিবেশ সৃষ্টি করা কঠিন হয়ে পড়ে।
-
দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা: রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানসমূহে সুশাসন প্রতিষ্ঠা ছিল একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
-
বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি: দেশে ও বিদেশে বিনিয়োগ আনার পাশাপাশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি শেখ হাসিনা সরকারের অন্যতম লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়।
উপসংহার
২০১৯ সালের জানুয়ারিতে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে টানা তৃতীয়বার সরকার গঠন বাংলাদেশে রাজনৈতিক ধারাবাহিকতা ও স্থিতিশীলতার নতুন অধ্যায় সূচিত করে। অভিজ্ঞ নেতৃত্ব, স্পষ্ট ভিশন এবং গতিশীল প্রশাসনের মাধ্যমে এই সরকার দেশের উন্নয়নের গতি ত্বরান্বিত করার প্রত্যয়ে কাজ শুরু করে। শেখ হাসিনা এই সরকারকে ‘উন্নয়ন ও সুশাসনের সরকার’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার ঘোষণা দেন এবং সেই লক্ষ্যেই নতুন যাত্রা শুরু হয়।