Menu
Back to timeline

*২০১৪-২০২৩* : এই সময়ে শেখ হাসিনার শাসনামলে গণতন্ত্রের অবনতি

*২০১৪-২০২৩* : এই সময়ে শেখ হাসিনার শাসনামলে গণতন্ত্রের অবনতি

২০১৪ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত শেখ হাসিনার শাসনামলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও গণতন্ত্রের অবস্থা নিয়ে দেশ-বিদেশে ব্যাপক আলোচনা হয়েছে। এই সময়কে অনেক বিশ্লেষক বাংলাদেশের গণতন্ত্রের জন্য সংকটপূর্ণ সময় হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। এ সময়ে গণতান্ত্রিক কাঠামো বহাল থাকলেও তার কার্যকারিতা, সুষ্ঠু নির্বাচন, বিরোধী দলের কার্যক্রম, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও নাগরিক অধিকার নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে।

১. ২০১৪ সালের বিতর্কিত নির্বাচন

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন ছিল এই সময়কার গণতন্ত্রের অবনতির প্রথম বড় উদাহরণ। প্রধান বিরোধী দল বিএনপি নির্বাচন বয়কট করায় ১৫৩টি আসনে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছাড়াই আওয়ামী লীগ ও তাদের মিত্ররা নির্বাচিত হন। এতে সংসদে কার্যকর বিরোধী দলের অনুপস্থিতি দেখা যায়। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরাও এই নির্বাচনকে ‘নির্বাচনের নামে প্রহসন’ বলে অভিহিত করেন।

২. বিরোধী দমন ও রাজনৈতিক নিপীড়ন

এই সময়ে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর বিরুদ্ধে ব্যাপক দমন-পীড়ন শুরু হয়। বিশেষ করে বিএনপি ও জামায়াতের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা, গ্রেফতার, গুম ও বিচার বহির্ভূত হত্যার অভিযোগ ওঠে। গুম-খুনের বিষয়টি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর নজরে আসে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ও হিউম্যান রাইটস ওয়াচ একাধিকবার এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে।

৩. ২০১৮ সালের নির্বাচন ও প্রক্রিয়াগত অসঙ্গতি

২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও বিরোধী জোট অংশগ্রহণ করে, তবে নির্বাচন পূর্ব প্রস্তুতি, ভোটগ্রহণ ও ফলাফলের স্বচ্ছতা নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়। ভোটের আগেই বিরোধী প্রার্থীদের গ্রেফতার, প্রচারে বাধা, এবং ভোটের দিনে সন্ত্রাস ও জালিয়াতির অভিযোগ ওঠে। নির্বাচন কমিশনের নির্লিপ্ত ভূমিকা ও রাষ্ট্রযন্ত্রের একতরফা ব্যবহার নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলে।

৪. আইন ও বিচার ব্যবস্থার রাজনৈতিক ব্যবহার

এই সময়ে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনসহ বিভিন্ন আইন ব্যবহৃত হয়েছে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রোধে। সাংবাদিক, লেখক, ব্লগার, এমনকি সাধারণ মানুষও ফেসবুক পোস্টের জন্য গ্রেফতার হয়েছে। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ক্ষমতাসীন দলের স্বার্থে বিচার ব্যবস্থার ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে, যা গণতন্ত্রের অন্যতম স্তম্ভকে দুর্বল করেছে।

৫. গণমাধ্যম ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা

গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এই সময়ে ব্যাপকভাবে সংকুচিত হয়েছে। টেলিভিশন, পত্রিকা ও অনলাইন মিডিয়া অধিকাংশই সরকারপন্থী হয়ে পড়ে। সমালোচনামূলক রিপোর্টের কারণে সাংবাদিকদের ওপর হামলা, হুমকি ও মামলা হয়েছে। অনেক স্বাধীন সাংবাদিক ও সম্পাদক পেশাগত নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে পড়েন। তথ্যপ্রযুক্তি আইন ও ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ব্যবহার করে অনেককে নিপীড়ন করা হয়েছে।

৬. নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে বিতর্ক

নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে ক্রমাগত প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে ২০১৮ সালের নির্বাচন ও পরবর্তী উপ-নির্বাচনগুলোতে নির্বাচন কমিশনের ব্যর্থতা ও পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মহলে সমালোচিত হয়েছে। সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন নিশ্চিত করতে নির্বাচন কমিশনের অক্ষমতা গণতান্ত্রিক পরিবেশকে আরও দুর্বল করেছে।

৭. সুশীল সমাজ ও নাগরিক সমাজের দমন

সরকার সমালোচক বুদ্ধিজীবী, এনজিও ও মানবাধিকার সংস্থাগুলোকেও কোণঠাসা করে তোলে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর কার্যক্রমেও প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হয়। এতে একটি বহুমাত্রিক ও প্রাণবন্ত গণতান্ত্রিক সমাজ গঠনের পথ সংকুচিত হয়।

উপসংহার

২০১৪ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত সময়কালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় থাকলেও গণতন্ত্রের মৌলিক উপাদানগুলো দুর্বল হয়েছে। নির্বাচন ব্যবস্থা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও বিরোধী দলের কার্যকর ভূমিকা ক্ষয়প্রাপ্ত হয়েছে। ফলে এই সময়কালকে অনেকেই "গণতন্ত্রের অবনতির দশক" হিসেবে অভিহিত করেন।

More from the timeline

View all