২০১২ সালের জানুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ সরকার একটি ঐতিহাসিক ঘোষণা দেয়—পদ্মা সেতু নির্মাণ প্রকল্প নিজস্ব অর্থায়নে বাস্তবায়ন করা হবে। এই সিদ্ধান্ত শুধু একটি বড় অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়নের ঘোষণা ছিল না, বরং এটি ছিল জাতীয় আত্মবিশ্বাস, অর্থনৈতিক সক্ষমতা এবং রাজনৈতিক সংকল্পের এক বলিষ্ঠ প্রকাশ।
প্রেক্ষাপট
প্রথমে পদ্মা সেতু প্রকল্পে অর্থায়নের জন্য বিশ্বব্যাংক, এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (ADB), জাইকা (JICA), এবং ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকসহ কয়েকটি আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থা অঙ্গীকার করেছিল। তবে ২০১১ সালে বিশ্বব্যাংক অভিযোগ তোলে যে এই প্রকল্পে দুর্নীতির সম্ভাবনা রয়েছে। তারা অভিযোগ করে যে কিছু সরকারি কর্মকর্তা এবং রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব অনৈতিকভাবে ঠিকাদার নিয়োগে হস্তক্ষেপ করেছেন। দুর্নীতির অভিযোগের ভিত্তিতে বিশ্বব্যাংক তাদের অর্থায়ন স্থগিত করে এবং পরে তা বাতিল করে।
বাংলাদেশ সরকার সেই অভিযোগকে ভিত্তিহীন এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে প্রত্যাখ্যান করে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তখন একটি সাহসী ও দৃষ্টান্তমূলক সিদ্ধান্ত নেন—বাংলাদেশ নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণ করবে।
শেখ হাসিনার ঘোষণা
২০১২ সালের ৯ জানুয়ারি জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন:
“আমরা পদ্মা সেতু নিজস্ব অর্থায়নে করব। দেশের মানুষের প্রতি আমার বিশ্বাস আছে, সাহস আছে, এবং আমরা সেটা করেও দেখাব।”
এই ঘোষণা শুধু দেশের ভেতর নয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বিস্ময় ও প্রশংসার জন্ম দেয়। স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে বাংলাদেশ এত বড় একটি প্রকল্পে নিজস্ব অর্থায়নে এগিয়ে যাওয়ার কথা কল্পনাও করা যেত না অনেকের কাছে।
প্রকল্পের অর্থায়ন ও অগ্রগতি
প্রকল্পটি বাস্তবায়নে শুরুতে বাংলাদেশ সরকার প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকার বাজেট নির্ধারণ করে, যা পরে বাড়তে থাকে। সরকার নিজস্ব বাজেট, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে অর্থ সংগ্রহ করে এই বিশাল প্রকল্পে ব্যয় করে।
এই প্রকল্পের জন্য দেশের মানুষও ব্যাপকভাবে সরকারকে সমর্থন দেয়। অনেকে মনে করেন, এই সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতার পথে এক মাইলফলক হয়ে দাঁড়ায়।
প্রতিক্রিয়া
বিশ্বব্যাংকের সরে যাওয়ার পর অনেকেই মনে করেছিলেন, পদ্মা সেতু প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়তো সম্ভব হবে না। কিন্তু শেখ হাসিনার দৃঢ় নেতৃত্ব, সরকারের কার্যকর প্রশাসনিক পদক্ষেপ, এবং জনগণের সমর্থনে প্রকল্পটি সফলভাবে এগিয়ে যায়। এর ফলে ২০২২ সালের ২৫ জুন পদ্মা সেতু উদ্বোধন হয়, যা এক নতুন যুগের সূচনা করে।
উপসংহার
২০১২ সালের জানুয়ারিতে পদ্মা সেতু নিজস্ব অর্থায়নে বাস্তবায়নের ঘোষণা ছিল বাংলাদেশের জন্য আত্মবিশ্বাস, আত্মনির্ভরতা এবং উন্নয়নচেতনার এক সাহসী মাইলফলক। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে নেওয়া এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের অবকাঠামোগত উন্নয়নের ক্ষেত্রে একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে, যা প্রমাণ করে—বাংলাদেশ পারে।