২০১০ সালের জুলাই মাসে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে বহুল প্রতীক্ষিত পদ্মা সেতু প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন দেওয়া হয়। এটি ছিল দেশের অন্যতম বৃহৎ অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রকল্প এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে জাতীয় উন্নয়নে এক মাইলফলক পদক্ষেপ। এই প্রকল্প শুধু একটি সেতু নির্মাণের পরিকল্পনা ছিল না; এটি ছিল একটি সমন্বিত পরিবহন অবকাঠামো উন্নয়ন উদ্যোগ, যার উদ্দেশ্য ছিল দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে রাজধানী ঢাকার সরাসরি সড়ক ও রেল যোগাযোগ স্থাপন।
প্রকল্প অনুমোদন ও প্রেক্ষাপট
২০১০ সালের ২৯ জুলাই একনেক (জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি) সভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্পের চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়। প্রকল্পটির প্রস্তাবিত ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় ১০ হাজার ১৬১ কোটি টাকা। প্রকল্পটির আওতায় সেতুর দৈর্ঘ্য নির্ধারণ করা হয় ৬.১৫ কিলোমিটার এবং প্রস্থ ১৮.১০ মিটার। এটি ছিল একটি বহুমুখী সেতু যার ওপর দিয়ে সড়ক, রেল, গ্যাস পাইপলাইন এবং টেলিকম লাইন চালু রাখার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়।
পদ্মা সেতু প্রকল্প শুরুতে আন্তর্জাতিক অর্থায়নের ওপর নির্ভর করে পরিকল্পনা করা হয়েছিল। বিশ্বব্যাংকসহ এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (ADB), জাইকা (JICA) ও ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংক (IDB) এই প্রকল্পে অর্থায়নে আগ্রহ প্রকাশ করে এবং তারা শুরুতে প্রতিশ্রুতিও দেয়। তবে পরে বিশ্বব্যাংক দুর্নীতির অভিযোগ তোলে এবং ২০১২ সালে তারা প্রকল্প থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নেয়। যদিও ২০১০ সালের জুলাইতে যখন আনুষ্ঠানিক অনুমোদন দেওয়া হয়, তখন বিশ্বব্যাংক ছিল প্রধান অর্থায়নকারী সংস্থা এবং প্রায় ১.২ বিলিয়ন ডলার অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল।
প্রকল্পের উদ্দেশ্য ও সম্ভাব্য প্রভাব
এই প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য ছিল পদ্মা নদীর দুই পাড়—মুন্সিগঞ্জের মাওয়া ও শরীয়তপুরের জাজিরা—সংযুক্ত করা। ফলে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১টি জেলার সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপিত হতো, যা দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে এক বিশাল পরিবর্তন আনতে পারতো। দক্ষিণাঞ্চলের কৃষি, শিল্প এবং বাণিজ্যিক সম্ভাবনা সম্পূর্ণরূপে ব্যবহার করা সম্ভব হতো এবং ঢাকার উপর চাপ কমে যেত।
এই সেতু প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে দেশের জিডিপিতে প্রায় ১.২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি বাড়বে বলে আশা করা হয়েছিল। দক্ষিণাঞ্চলে এই প্রবৃদ্ধি হতে পারে ২ শতাংশের কাছাকাছি। এটি অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা অঞ্চলগুলোকে মূলধারায় নিয়ে আসবে বলে ধারণা করা হয়েছিল।
প্রকল্প বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ
প্রকল্প অনুমোদনের পর বড় চ্যালেঞ্জ আসে অর্থায়নের ক্ষেত্রে। বিশ্বব্যাংকের দুর্নীতির অভিযোগ, রাজনৈতিক চাপ, প্রশাসনিক জটিলতা এবং ভূমি অধিগ্রহণ নিয়ে বিরোধ প্রকল্প বাস্তবায়নকে বিলম্বিত করে। তবে শেখ হাসিনার সরকার এক সাহসী সিদ্ধান্ত নেয়—নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণের। এটি ছিল একটি ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত, যা বাংলাদেশের আত্মবিশ্বাস ও সক্ষমতার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে।
২০১৪ সালের শেষে এসে মূল নির্মাণ কাজ শুরু হয়। নির্মাণে নিয়োজিত ছিল চীনা প্রতিষ্ঠান চায়না মেজর ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি (MBEC)। দেশের অভ্যন্তরীণ সংস্থাগুলোকেও কাজে নিয়োজিত করা হয়। প্রকল্পের আওতায় সড়ক, রেললাইন, টোল প্লাজা, নিরাপত্তা ব্যবস্থা, নদীশাসন, ও পুনর্বাসনসহ নানা উপাদান অন্তর্ভুক্ত ছিল।
উপসংহার
২০১০ সালের জুলাই মাসে পদ্মা সেতু প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন কেবল একটি অবকাঠামোগত সিদ্ধান্ত ছিল না; এটি ছিল জাতীয় অগ্রযাত্রার পথে একটি সাহসী পদক্ষেপ। পরে যখন বাংলাদেশ নিজস্ব অর্থায়নে এই প্রকল্প বাস্তবায়নের ঘোষণা দেয়, তখন তা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশকে এক আত্মবিশ্বাসী ও সক্ষম রাষ্ট্র হিসেবে উপস্থাপন করে। এই অনুমোদনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় একটি স্বপ্নের বাস্তবায়নের যাত্রা, যার সফল পরিণতি ২০২২ সালে যখন পদ্মা সেতু খুলে দেওয়া হয়, তখন দেশবাসী গর্বের সঙ্গে এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তের স্বাক্ষর দেখে।