Menu
Back to timeline

২০০৯ (আগস্ট) – ডিজিটাল বাংলাদেশ কর্মসূচি ঘোষণা।

২০০৯ (আগস্ট) – ডিজিটাল বাংলাদেশ কর্মসূচি ঘোষণা।

ডিজিটাল বাংলাদেশ—এই শব্দ দুটি ২০০৮ সালের নির্বাচনের সময় আওয়ামী লীগের প্রধান নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিগুলোর অন্যতম ছিল। নির্বাচনের আগে দলটির ইশতেহারে “রূপকল্প ২০২১” তুলে ধরা হয়, যার অন্যতম প্রধান স্তম্ভ ছিল “ডিজিটাল বাংলাদেশ” গড়ার ঘোষণা। সরকার গঠন করার পর ২০০৯ সালের আগস্ট মাসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে ডিজিটাল বাংলাদেশ কর্মসূচি ঘোষণা করে এবং তার বাস্তবায়ন শুরু হয়।

ডিজিটাল বাংলাদেশের ধারণা

ডিজিটাল বাংলাদেশ মানে শুধু কম্পিউটার বা ইন্টারনেট ব্যবহার নয়। এর গভীরে ছিল—তথ্যপ্রযুক্তিকে ব্যবহার করে সরকারি সেবা সহজলভ্য করা, দুর্নীতি হ্রাস করা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়ন, ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার এবং জনগণের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন। এই ধারণার মূল লক্ষ্য ছিল, ২০২১ সালের মধ্যে একটি দক্ষ, স্বচ্ছ, দায়বদ্ধ ও উন্নয়নমুখী সরকার ও সমাজ প্রতিষ্ঠা করা।

ডিজিটাল বাংলাদেশ চারটি স্তম্ভের উপর ভিত্তি করে গঠিত:

১. মানব সম্পদ উন্নয়ন
২. আইসিটি ব্যবহার করে মানুষের ক্ষমতায়ন
৩. আইসিটি নির্ভর সরকারি সেবা
৪. আইসিটি শিল্পের বিকাশ

আনুষ্ঠানিক ঘোষণা ও নীতিগত পদক্ষেপ

২০০৯ সালের আগস্টে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের আওতায় এটুআই (Access to Information) প্রকল্প পুর্নগঠন করে ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়নের রূপরেখা তৈরি করা হয়। এটি বাস্তবায়নে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ, ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয় এবং স্থানীয় সরকার বিভাগসহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তর একসাথে কাজ শুরু করে।

প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় ডিজিটাল বাংলাদেশ কার্যক্রম বাস্তবায়নের অন্যতম নীতিনির্ধারক হিসেবে ভূমিকা পালন করেন।

গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ ও বাস্তবায়ন

১. ই-গভর্নেন্স
সরকারি দপ্তরগুলোতে ফাইলিং, চিঠিপত্র, বাজেট, ট্যাক্সেশনসহ বিভিন্ন সেবা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে স্থানান্তর করা হয়। নাগরিকরা ঘরে বসেই বিভিন্ন সরকারি সেবা পেতে শুরু করে।

  1. ই-সেবা কেন্দ্র
    দেশব্যাপী ইউনিয়ন পর্যায়ে ৪,৫০০টিরও বেশি ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার (UDC) স্থাপন করা হয়। এখান থেকে নাগরিকরা জন্মনিবন্ধন, অনলাইন ফরম, ট্রেন/বাস/ফ্লাইট টিকিট, ব্যাংকিং, ভিসা আবেদনসহ নানা ডিজিটাল সেবা পেতে শুরু করে।

  2. ই-পেমেন্ট ও মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস
    ডিজিটাল লেনদেনকে উৎসাহিত করতে মোবাইল ব্যাংকিং চালু হয়। বিকাশ, নগদ, রকেট ইত্যাদি মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস জনপ্রিয় হয়।

  3. শিক্ষা খাতে ডিজিটালীকরণ
    ডিজিটাল পাঠ্যবই, মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম এবং অনলাইন প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা চালু হয়। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের জন্য তৈরি করা হয় “শিক্ষা পাঠ” ও “মুক্তপাঠ” এর মতো ই-লার্নিং প্ল্যাটফর্ম।

  4. ফ্রিল্যান্সিং ও আইটি শিল্পে কর্মসংস্থান
    সরকারের আইসিটি বিভাগ তরুণদের জন্য ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণ চালু করে। ফলে বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ফ্রিল্যান্সিং জনশক্তি গড়ে তোলে।

  5. জাতীয় তথ্য বাতায়ন ও ওয়েবসাইট
    সব সরকারি প্রতিষ্ঠান ও দপ্তরের জন্য ওয়েবসাইট চালু করা বাধ্যতামূলক করা হয়। বর্তমানে ২৫,০০০-এরও বেশি সরকারি সাইট রয়েছে।

ফলাফল ও প্রভাব

ডিজিটাল বাংলাদেশ কর্মসূচির ফলে ২০০৯ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারী বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ১৩ কোটিতে, এবং মোবাইল ফোন ব্যবহারকারী হয় ১৮ কোটির বেশি। সরকারি সেবা ডিজিটাল হওয়ায় দুর্নীতি কমে, সেবার গতি ও স্বচ্ছতা বাড়ে।

বিশ্বব্যাপী ডিজিটাল রেডিনেস ইনডেক্সে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য উন্নতি করে। এমনকি করোনাকালেও ডিজিটাল অবকাঠামোর কারণে সরকার শিক্ষা, টিকাদান ও ত্রাণ কার্যক্রম নির্বিঘ্নে চালাতে সক্ষম হয়।

উপসংহার

২০০৯ সালের আগস্টে ডিজিটাল বাংলাদেশ কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক ঘোষণা ছিল দেশের তথ্যপ্রযুক্তি বিপ্লবের সূচনা। এই কর্মসূচির সফল বাস্তবায়নের মাধ্যমেই বাংলাদেশ আজ “স্মার্ট বাংলাদেশ ২০৪১”-এর দিকে এগিয়ে চলেছে। এটি শুধু একটি উন্নয়ন কর্মসূচি নয়, বরং এক নতুন যুগের সূচক—যেখানে প্রযুক্তিই উন্নয়নের চালিকাশক্তি।

More from the timeline

View all