Menu
Back to timeline

*২০০১-২০০৮* : বিরোধী দলের নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন

*২০০১-২০০৮* : বিরোধী দলের নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন

২০০১ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত সময়কালে শেখ হাসিনা বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতি ও জাতীয় সংসদে বিরোধী দলের নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এই সময়টি ছিল রাজনৈতিক অস্থিরতা, সহিংসতা, এবং গণতন্ত্রের জন্য চ্যালেঞ্জপূর্ণ একটি অধ্যায়। শেখ হাসিনা এই সময়কালে একদিকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও ষড়যন্ত্রের মুখে পড়েন, অপরদিকে দলকে ঐক্যবদ্ধ ও সংগঠিত রাখার কঠিন দায়িত্বও পালন করেন।

২০০১ সালের নির্বাচন ও পরবর্তী পরিস্থিতি

২০০১ সালের ১ অক্টোবর অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াত জোট বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে সরকার গঠন করে। আওয়ামী লীগ বিরোধী দলে পরিণত হয় এবং শেখ হাসিনা হন সংসদে বিরোধী দলের নেতা। নির্বাচনের পর থেকেই দেশজুড়ে শুরু হয় আওয়ামী লীগ ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপর সহিংস নির্যাতন। এই সময় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী এবং হিন্দু সম্প্রদায়ের অনেক মানুষ রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হন।

শেখ হাসিনা বারবার এসব সহিংসতার প্রতিবাদ করেন এবং সরকারকে জবাবদিহির আওতায় আনার জন্য সংসদ ও গণমাধ্যমে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। একইসঙ্গে, তিনি আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি তুলে ধরেন।

বিরোধী দলের নেতৃত্ব ও সংসদীয় আন্দোলন

এই সময় শেখ হাসিনা সংসদে বিরোধী দলের নেতার দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি, সংসদের বাইরেও দলীয় আন্দোলন-সংগ্রামের নেতৃত্ব দেন। বিএনপি-জামায়াত সরকারের দুর্নীতি, আইন-শৃঙ্খলার অবনতি, এবং প্রশাসনে দলীয়করণের বিরুদ্ধে তিনি সোচ্চার থাকেন। তাঁর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ বিভিন্ন সময় হরতাল, মিছিল, মানববন্ধনসহ নানা কর্মসূচি পালন করে।

এই সময় শেখ হাসিনার ওপর একাধিকবার প্রাণঘাতী হামলা চালানো হয়। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটে ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট। সেদিন বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসবিরোধী সমাবেশে গ্রেনেড হামলা চালানো হয়, যাতে দলের মহিলা বিষয়ক সম্পাদক আইভি রহমানসহ ২৪ জন নিহত হন এবং শতাধিক নেতাকর্মী আহত হন। শেখ হাসিনা অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যান। এই হামলার পর দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এবং আন্তর্জাতিক মহলেও বিষয়টি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়।

রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র ও মামলা

২০০১-২০০৮ সময়কালে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে একের পর এক রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা দায়ের করা হয়। তাঁর নামে দুর্নীতি, হত্যা, রাষ্ট্রদ্রোহসহ নানা অভিযোগে মামলা হয়। এসব মামলার উদ্দেশ্য ছিল তাঁকে রাজনীতি থেকে সরিয়ে দেওয়া এবং দলকে নেতৃত্বশূন্য করে ফেলা।

২০০৭ সালের জানুয়ারিতে দেশে জরুরি অবস্থা জারি হয় এবং ক্ষমতায় আসে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার। এই সরকার দুর্নীতিবিরোধী অভিযান চালাতে গিয়ে শেখ হাসিনাকে ২০০৭ সালের ১৬ জুলাই গ্রেপ্তার করে। তাঁর বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাগুলোকে আন্তর্জাতিক ও দেশীয় মানবাধিকার সংগঠনসমূহ রাজনৈতিক হয়রানি হিসেবে আখ্যা দেয়। শেখ হাসিনার মুক্তির দাবিতে দেশব্যাপী আন্দোলন গড়ে ওঠে এবং আন্তর্জাতিক চাপের মুখে ২০০৮ সালের ১১ জুন তাঁকে জামিনে মুক্তি দেওয়া হয়।

দল পুনর্গঠন ও নির্বাচনের প্রস্তুতি

শেখ হাসিনা জেল থেকে মুক্তি পাওয়ার পর দলের মধ্যে পুনরায় নেতৃত্ব দেন এবং ২০০৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি শুরু করেন। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের জন্য একটি সুসংগঠিত নির্বাচনী ইশতেহার তৈরি করা হয় যার মূল শ্লোগান ছিল “দিন বদলের সনদ”।

২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে মহাজোট ঐতিহাসিক বিজয় অর্জন করে। আওয়ামী লীগ এককভাবে ২৩০টি আসনে জয়লাভ করে, যা ছিল সেই সময় পর্যন্ত কোনো দলের সর্বোচ্চ সংখ্যাগরিষ্ঠতা। দীর্ঘ বিরোধী রাজনীতি, কারাবরণ, রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র মোকাবিলা শেষে শেখ হাসিনা পুনরায় দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

উপসংহার

২০০১ থেকে ২০০৮ সময়কাল ছিল শেখ হাসিনার জন্য রাজনৈতিক জীবনের এক কঠিন ও গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এই সময়ে তিনি শুধু বিরোধী দলের নেতা হিসেবেই দায়িত্ব পালন করেননি, বরং গণতন্ত্র, মানবাধিকার, এবং রাজনৈতিক সহনশীলতার পক্ষে শক্ত অবস্থান নিয়েছেন। তাঁর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে ২০০৮ সালের নির্বাচনে বিজয় অর্জন করে আবারও দেশের ক্ষমতায় ফিরে আসে। এই সময়কালে শেখ হাসিনার দৃঢ়তা, কৌশলগত নেতৃত্ব এবং গণমুখী চিন্তাধারা তাঁর রাজনীতিকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যায়।

More from the timeline

View all