Menu
Back to timeline

১৯৭১ – ১৯৭৫ – ২০২৪: একই ষড়যন্ত্রের সুতো ১৫ আগস্ট, ১৯৭৫—একটি অন্ধকার ও ভয়াবহ দিন

১৯৭১ – ১৯৭৫ – ২০২৪: একই ষড়যন্ত্রের সুতো ১৫ আগস্ট, ১৯৭৫—একটি অন্ধকার ও ভয়াবহ দিন

এই দিনে স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম কলঙ্কময় অধ্যায় লেখা হলো। একটি এমন নৃশংস অপরাধ যা পুরো জাতিকে স্তব্ধ করে দিয়েছে এবং বিশ্বের হৃদয়কে শোকের আঘাতে ভেঙে দিয়েছে। এই দিনে আমাদের প্রিয় নেতা—জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান—সহ তার পরিবারের সবাই নির্মমভাবে নিহত হন।

বঙ্গবন্ধু জীবন ও প্রাণ উজার করেছিলেন বাংলা জনগণের কল্যাণে। তাদের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে তিনি দাঁড়িয়েছিলেন নির্ভীক। এর বিনিময়ে ভোগ করতে হয়েছে কারাবাস, নির্যাতন, হয়রানি। তাঁকে ফাঁসির দড়িতেও ঝুলিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা হয়েছিল, যা কেবল জনগণের অপ্রতিরোধ্য আন্দোলনের কারণে রুখে দেওয়া সম্ভব হয়। এই অকৃত্রিম নায়ক শেষ পর্যন্ত হাজার বছরের শোষণ থেকে জাতিকে মুক্তি দিয়েছেন। বাঙালি পেয়েছে স্বাধীন দেশ, একটি অহংকারের পতাকা। অদ্ভুত নয়, তিনি ছিলেন “মিলেনিয়ামের শ্রেষ্ঠ বাঙালি” হিসেবে বিবিসি সমীক্ষায় নির্বাচিত।

বঙ্গবন্ধু এই যুদ্ধবিধ্বস্ত জাতিকে দৃঢ় নেতৃত্ব দিয়েছেন। তার নেতৃত্বে বাংলাদেশ পুনরুজ্জীবিত হতে শুরু করে। কিন্তু দেশের পুনর্গঠনের মুহূর্তে দেশী-বিদেশী ষড়যন্ত্রের আগুন জ্বলে ওঠে। ১৯৭১-এর পরাজিত শক্তিরা সুযোগ খুঁজছিল আঘাত করার। সেই সুযোগ আসে—এবং দেশের প্রিয় নেতা একটি ষড়যন্ত্রের শিকার হন।


বঙ্গবন্ধু হত্যা: একটি পরিকল্পিত হত্যাযজ্ঞ

এই মহান ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে সেনাবাহিনীর একটি অংশ রাতের অন্ধকারে ধানমন্ডি ৩২ এর বঙ্গবন্ধু বাসাকে ঘেরাও করে। ভোরের আগেই ইতিহাসের সবচেয়ে বর্বর হত্যাযজ্ঞের পর্দা ফাঁস হয়। তার কনিষ্ঠ সন্তানকেও রেহাই দেওয়া হয়নি।

১৫ আগস্ট বাঙালি জাতির জন্য শোকের দিন, অশ্রুর দিন। যেমন লিখেছেন কবি নির্মলেন্দু গুণ—
"এসে গেছে কান্নার দিন—কান্না করো, বাঙালি, কান্না করো।"
অর্ধশত বছর পরও সেই দিন আমাদের হৃদয়ে আঘাত হানে, চোখ ভরে অশ্রু। কোনো বাঙালি হৃদয় সেই নিষ্ঠুর দৃশ্য ভুলতে পারে না—জাতির পিতার রক্তমাখা অচল দেহ, রক্তভেজা ঘর, এবং পরিবারের সকল প্রিয়জনের মৃতদেহ।

তাদের একমাত্র “অপরাধ” ছিল—জাতির কল্যাণ কামনা করা। ১৯৭১-এর পরাজিত শক্তি এবং তাদের বিদেশি অনুগামীরা তা সহ্য করতে পারেননি।


আমার ব্যক্তিগত স্মৃতি

সেই স্বাধীনতা-উত্তেজনাপূর্ণ দিনগুলো আজও চোখে ভেসে ওঠে—স্বাধীনতার আনন্দ, পুনর্গঠনের সংকল্প। আমি তখন ঢাকার মেট্রোপলিটন ছাত্রলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক। জগন্নাথ কলেজে পড়াশোনা করলেও সময়ের বড় অংশ কাটত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ কার্যালয়ে।

১৯৭৫ সালের আগস্টে আমরা বঙ্গবন্ধুকে দীর্ঘ সময় পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বাগত জানানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। ১৪ আগস্ট আমি সারাদিন ক্যাম্পাস ও মেট্রোপলিটন অফিসের মধ্যে ঘুরে ঘুরে কাজ করছিলাম। রাতের খাবারের পর আমরা জুবো লীগ অফিসে গেলাম, তারপর ফজলুল হক হলে রুম ৩১৭ এ অবস্থান করি। ভোরে হলে ক্যান্টিন ম্যানেজারের কড়া নক-এর শব্দে জেগে উঠি—বিজ্ঞপ্তি আসে, বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবার নিহত।

রেডিও চালু করলে আমরা দুঃখজনক সত্যি জানি। ভীত, অশ্রুবিহীন আমরা হলে থেকে বের হয়ে গিয়েছিলাম, জানতাম শহরে ট্যাংক ও জঙ্গি সেনা টহল দিচ্ছে। আমরা দয়াগঞ্জের এক ছোট মুদ্রণালয়ে আশ্রয় নিই—সেখানে রাত কাটে নীরবতায়।


হত্যাযজ্ঞের রাজনৈতিক অর্থ

বঙ্গবন্ধু হত্যা কেবল একজন ব্যক্তির হত্যার ঘটনা ছিল না; এটি স্বাধীনতার চেতনা ও আদর্শকে ধ্বংস করার পরিকল্পিত প্রক্রিয়া। হত্যাকারীরা শুধু হত্যা করেননি, তারা রাষ্ট্রের ক্ষমতা দখল করে নিজেদেরকে আইনি সুরক্ষা দিয়েছেন, সংবিধান পরিবর্তন করে অপরাধকে বৈধতা দিয়েছেন।

লক্ষ্য ছিল কেবল মুজিবকে হত্যা করা নয়—জাতির স্বাধীনতার চেতনা হত্যা করা।


একই ষড়যন্ত্র আজও ২০২৪ সালে

১৯৭১ এবং ১৯৭৫-এর খুনিরা আজও সক্রিয়। তাদের লক্ষ্য একই—বঙ্গবন্ধুর আদর্শ, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও চেতনাকে ধ্বংস করা, বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও ১৯৭২ সালের সংবিধানকে অবমূল্যায়ন করা। তারা বঙ্গবন্ধুর মূর্তি ধ্বংস করছে, বাসা লুট করছে, গোপালগঞ্জের সমাধিসৌধের ওপর হামলা চালাচ্ছে। কিন্তু জনগণ রুখেছে তাদের পথ।

মানুষকে হত্যা করে তারা আদর্শকে হত্যা করতে চেয়েছিল—কিন্তু বাংলাদেশে তা কখনো সম্ভব হয়নি। বঙ্গবন্ধু আজও আমাদের জন্য অনুপ্রেরণার অব্যয়।


জাতির এক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত

আমরা আবারও প্রতিশ্রুতি দেব—প্রত্যেক ষড়যন্ত্রের জাল ছিঁড়ে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এগিয়ে নেব। ১৯৭১-এর পরাজিত শক্তিকে পরাজিত করে স্বাধীনতার সমস্ত অর্জন রক্ষা করব।

এই ১৫ আগস্টে, আমাদের প্রিয় জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমানের ৫০তম শাহাদাতবার্ষিকীতে, আমরা শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করি সেই মহান বাঙালিকে, যিনি আমাদের জাতিকে দিয়েছেন পরিচয়।

More from the timeline

View all