আজ জাতীয় বিজয় দিবস। সুদীর্ঘ নয় মাসের সশস্ত্র সংগ্রাম, ৩০ লক্ষ শহীদের আত্মত্যাগ ও অসংখ্য মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত বিজয়ের ৫৪তম বার্ষিকী আজ। এই দিনেই বিশ্ব মানচিত্রে অভ্যুদয় ঘটেছিল একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র—বাংলাদেশ-এর।
দীর্ঘ দুই দশকের পাকিস্তানি শোষণ ও বঞ্চনার অবসান ঘটিয়ে, এই দিনেই মুক্তিকামী বাঙালি জাতি বিজয় ছিনিয়ে আনে। ১৯৭১ সালের এই দিনে হানাদার পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী বীর বাঙালির প্রতিরোধের মুখে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়।
🔥 মুক্তিযুদ্ধের গৌরবে ৪ বছর পরিক্রমা: প্রাপ্তি ও প্রত্যাশা
স্বাধীনতার ৫৪ বছর পর আজ জাতি তার অর্জন ও প্রত্যাশার হিসেব মেলাচ্ছে। এই বিজয় বার্ষিকীতে আমরা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলি এই ভেবে যে, জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মত্যাগে অর্জিত বিজয়ের সম্মান রক্ষিত হয়েছে—যুদ্ধাপরাধীদের বিচার সম্পন্ন হয়েছে। জাতি আজ বিনম্র শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় স্মরণ করছে সেই লক্ষ লক্ষ শহীদদের, যাদের সুমহান আত্মদানের ফলেই আমরা পেয়েছি একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশ।
তবে, গত এক-দেড় বছর ধরে পরাজিত পাকিস্তানের দোসররা নতুন করে এবং সুপরিকল্পিতভাবে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও স্বাধীনতা সংগ্রামের গৌরবকে বিকৃত করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট-এর পর থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে মুক্তিযোদ্ধাদের অপমান করা হয়েছে। এমনকি রাষ্ট্রীয় মর্যাদাও দেওয়া হয়নি বীর মুক্তিযোদ্ধা মতিয়া চৌধুরীর মতো নেত্রীর শেষকৃত্যে।
মুক্তিযুদ্ধের বীরত্বের প্রতীকগুলো মুছে ফেলার অপপ্রয়াসে দেশের বহু ভাস্কর্য—যেমন আম্রকুঞ্জের ভাস্কর্য—ভাঙচুর ও ধ্বংস করা হয়েছে। তথাকথিত জুলাইপন্থি চরমপন্থি গোষ্ঠীর নেতারা এমনকি বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানকে ‘বিশ্বাসঘাতক’ আখ্যা দিতেও কুণ্ঠাবোধ করেনি। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণাকে উদ্দেশ্যমূলকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করা হচ্ছে এবং তাঁর পরিবারকে হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য চলছে সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্র। মনে হচ্ছে, সেই পুরানো হায়েনারা আবারও বাংলার মানচিত্রকে ছিন্নভিন্ন করার পাঁয়তারা করছে।
🌟 বিজয়: মাথা নত করার নয়, ছিনিয়ে আনার ইতিহাস
১৭৫৭ সালে পলাশীর আম্রকাননে বাংলার স্বাধীনতার যে সূর্য অস্তমিত হয়েছিল, তা আবারও উদিত হয় ১৯৭১ সালের এই ১৬ ডিসেম্বর। এই গৌরবোজ্জ্বল মুহূর্তে, তৎকালীন ৯১,৫৪৯ জন পাকিস্তানি সেনা প্রকাশ্য দিবালোকে আত্মসমর্পণ করে।
ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) যৌথ বাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা’র কাছে আত্মসমর্পণ দলিলে স্বাক্ষর করেন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট জেনারেল আমির আবদুল্লাহ খান নিয়াজি। এটি কোনো আলোচনা বা করুণার ফল ছিল না; এ ছিল রক্তের সাগরে সাঁতরে অর্জিত এক ঐতিহাসিক বিজয়, যা পরাজয়ের গ্লানি নিয়ে পাকিস্তানি বাহিনীকে মাথা নিচু করে আত্মসমর্পণে বাধ্য করেছিল। বিশ্ব দেখেছিল এক নতুন স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম।
আর এই বিজয়ের পথে জাতিকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন যিনি, তিনি হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তাঁর নাম চিরভাস্বর ও দেদীপ্যমান। জীবন চলার পথে আনন্দ বহুভাবে আসতে পারে, কিন্তু লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত মাতৃভূমির স্বাধীনতা এবং ভিনদেশি শোষকের হাত থেকে মুক্তি লাভের বিজয়ের আনন্দের কোনো তুলনা হয় না।
৫২ হাজার বর্গমাইলের এই ভূখণ্ডে সেদিন উঠেছিল এক glorious এবং বিজয়ী সূর্য। মুক্তিকামী বাঙালিরা শোষণ ও পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে সেই সূর্যকে ছিনিয়ে এনেছিল। সেই সূর্যের আলোয় রয়েছে লক্ষ শহীদের রক্তের দাগ, যা আমাদের জাতীয় পতাকার বিজয়ের লাল বৃত্ত। এর সাথে বাংলার সবুজ মিশে তৈরি হয়েছে আমাদের জাতীয় পতাকা। সেই বিজয়ের সূর্য ভবিষ্যৎ দেখতে পেয়েছিল, যার জন্য ৩০ লক্ষ মানুষ জীবন উৎসর্গ করেছিল। নয় মাসের সুতীব্র যন্ত্রণার পর জন্ম হয়েছিল একটি নতুন দেশ—স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ।
👨 progenitor: বঙ্গবন্ধু মানেই বাংলাদেশ
বাংলাদেশের স্বাধীনতার এই গৌরবময় মুহূর্ত এক দিনে আসেনি। এর পেছনে রয়েছে জাতির শত বছরের ঘাম ঝরানো সংগ্রাম ও আন্দোলনের ইতিহাস। আর এই সব সংগ্রামের মহানায়ক হিসেবে যাঁর নাম সর্বাগ্রে উচ্চারিত হবে, তিনি হলেন হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
বঙ্গবন্ধু মানেই বাংলাদেশ। বঙ্গবন্ধু মানেই স্বাধীনতা। বঙ্গবন্ধু মানেই আমাদের নতুন সত্তা। ৫২ হাজার বর্গমাইলের এই ভূখণ্ডের প্রতিটি ইঞ্চি জুড়ে তাঁর অস্তিত্ব বিদ্যমান।
ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলেও বাঙালি জাতি রক্ত দিয়েছে। শোষণ, নিপীড়ন, ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছে। প্রায় ২০০ বছরের এই সংগ্রামে বাঙালি জাতি সবচেয়ে বেশি রক্ত দিয়েছে। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান নামে একটি রাষ্ট্র গঠনেও বাঙালি জাতির প্রচেষ্টাই মুখ্য ছিল। কিন্তু মোহ ভাঙতে বেশি সময় লাগেনি। যে শোষণ ও বঞ্চনার কারণে ব্রিটিশদের বিতাড়িত করা হয়েছিল, কয়েক বছরের মধ্যেই পাকিস্তানিরা সেই একই ধারা শুরু করে।
শুরু হয় নতুন যুগের সংগ্রাম। পাকিস্তানিরা এ দেশের মানুষকে তাদের অধীনস্থ মনে করত। অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, এবং সর্বক্ষেত্রে বাঙালিকে বঞ্চিত করা হতে থাকে। এমনকি তারা নির্বাচনের ফলাফলকেও অস্বীকার করেছিল। ইতিহাস তখন ঘুরে দাঁড়ায়—৫২’র ভাষা আন্দোলন, ৬৬’র ঐতিহাসিক ৬ দফা আন্দোলন, ৬৯’র গণ-অভ্যুত্থান ইত্যাদি মাইলফলকের মাধ্যমে। শেষ আঘাত আসে ১৯৭০ সালের নির্বাচনের ফলাফলের মাধ্যমে।
এক নতুন অধ্যায় শুরু হয়। ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধু তাঁর বজ্রকণ্ঠে ঘোষণা করেন: "এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম"। এই ঘোষণা জাতির মনে নতুন উদ্দীপনা ও স্বাধীনতার তীব্র আকাঙ্ক্ষা জাগায়।
সেই ঐতিহাসিক দিনের পরিণতি—এই ১৬ ডিসেম্বর—রেসকোর্স ময়দানে প্রায় ৯০ হাজার পাকিস্তানি সৈনিকের পরাজয় ও আত্মসমর্পণ।