ড. মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার রাষ্ট্রযন্ত্রকে এক ভয়ঙ্কর অস্ত্রে পরিণত করেছে। আদালত, পুলিশ, প্রশাসন—সবকিছুই এখন প্রতিশোধের বাহনে পরিণত হয়েছে। দেশের শহর থেকে গ্রাম, রাস্তাঘাট থেকে রাজনৈতিক কার্যালয়—প্রতিটি স্থান এখন আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের জন্য মৃত্যুকূপের মতো। প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ থেকে ২ কোটি আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মী আজ নিজ দেশে শরণার্থী, বাস্তুচ্যুত, ঘরছাড়া।
এটি কোনো আকস্মিক অরাজকতা নয়; এটি পরিকল্পিত, সংগঠিত ও পদ্ধতিগত নিপীড়ন। নির্বিচারে গ্রেফতার, মিথ্যা মামলা, হুমকি ও নির্যাতনের মাধ্যমে নাগরিক নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি স্তরকে ভয় ও সন্ত্রাসের যন্ত্রে পরিণত করা হয়েছে। গণতন্ত্র দমবন্ধ হয়ে পড়েছে, মতপ্রকাশ অপরাধে পরিণত হয়েছে, এবং “নিরপেক্ষতার” নামে সংবিধানকে পদদলিত করা হচ্ছে।
প্রতিটি বাস্তুচ্যুত নেতা, প্রতিটি নীরব কর্মী, প্রতিটি সিল করা কার্যালয় এই সত্যের সাক্ষ্য—এই শাসনব্যবস্থা বাংলাদেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দলটিকে মুছে ফেলতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
এক নজিরবিহীন মানবিক বিপর্যয়
১৫ থেকে ২০ মিলিয়ন মানুষের বাস্তুচ্যুতি—এই সংখ্যা শুধু অবিশ্বাস্য নয়, দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক ইতিহাসে অভূতপূর্ব। আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর ইউনুস নেতৃত্বাধীন প্রশাসনের হাতে যা ঘটছে, তা কেবল ক্ষমতা হস্তান্তর নয়; এটি এক সুসংগঠিত রাজনৈতিক নির্মূল অভিযান—একটি দল ও তার শিকড়কে সমূলে উৎপাটনের প্রচেষ্টা।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার সরকার পতনের পর অনেকে ভেবেছিলেন, হয়তো শান্তিপূর্ণ রূপান্তরের মাধ্যমে জাতীয় পুনর্মিলনের এক অধ্যায় শুরু হবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো—রাষ্ট্রীয় প্রতিশোধের এক অন্ধ ঝড় শুরু হলো। কয়েক দিনের মধ্যেই সারাদেশে আওয়ামী লীগ অফিসে হামলা, নেতাকর্মীদের ঘরে আগুন, গ্রেপ্তার অভিযান শুরু হয়ে যায়। বিচ্ছিন্ন প্রতিহিংসা দ্রুত রূপ নেয় রাষ্ট্রীয়ভাবে পরিচালিত নিপীড়নে।
বাড়িঘর জ্বালিয়ে মুছে ফেলার নীতি
সরকারের কৌশল ছিল স্পষ্ট—আওয়ামী লীগকে সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবন থেকে মুছে ফেলো। হাজার হাজার নেতা-কর্মীকে গ্রেফতার করা হয় ও মিথ্যা মামলায় জড়ানো হয়। থানাগুলো পরিণত হয় অঘোষিত আটককেন্দ্রে। আদালত, যা একসময় ছিল ন্যায়বিচারের প্রতীক, এখন প্রশাসনিক নির্যাতনের হাতিয়ার। জামিন অস্বীকৃত, শুনানি স্থগিত, আইনজীবীদের প্রবেশ নিষিদ্ধ—সবই ছিল একই পরিকল্পনার অংশ।
একইসাথে, বিএনপি-জামায়াত জোটের দুর্বৃত্তরা রাষ্ট্রীয় নীরবতার আশ্রয়ে পরিচালিত করছে ব্যাপক হামলা ও লুটপাট। অনেক জেলা ও উপজেলায় আওয়ামী লীগপন্থী গ্রামগুলো চিহ্নিত করে একে একে জ্বালিয়ে দেওয়া হচ্ছে। প্রশাসন ও পুলিশের নীরব সহযোগিতা এই সন্ত্রাসকে বৈধতা দিয়েছে।
একজন ময়মনসিংহের স্থানীয় নেতা বললেন, “আমাদের বাঁচার একমাত্র পথ ছিল পালানো। ঘর, ব্যবসা, জমি—সবকিছু হারালেও জীবন বাঁচাতে হলো।”
ঘরছাড়া নেতা, ছদ্মবেশে জীবন
যারা পালাতে পেরেছেন, তারা আজ গৃহহীন ও পরিচয়হীন। একসময় যারা সমাজে সম্মানিত নেতা ছিলেন, আজ তারা ছদ্মবেশে দিনমজুর। কেউ রিকশা চালাচ্ছেন শহরে, কেউ গ্রামের প্রান্তে ভুয়া নামে কাজ করছেন। পরিবার ছিন্নভিন্ন, সন্তান স্কুলছাড়া, স্ত্রীরা আশ্রয় নিয়েছেন দূর সম্পর্কের আত্মীয়ের ঘরে।
তবুও প্রতিরোধের আগুন নিভে যায়নি। অনেকেই রাতে গোপনে সংগঠনিক যোগাযোগ রক্ষা করছেন, আন্ডারগ্রাউন্ড বৈঠক করছেন, আবার কেউ শহরে গিয়ে তথ্য আদানপ্রদান করছেন। তাদের এই নীরব সাহসই প্রমাণ করে—আওয়ামী লীগকে মুছে ফেলা যায় না।
রাজনৈতিক পরিশুদ্ধির নামে নির্মূল অভিযান
এই অভিযান দুটি উদ্দেশ্যে পরিচালিত—শারীরিক নির্মূল ও রাজনৈতিক বিলোপ। নেতাকর্মীদের বাস্তুচ্যুতি মানে স্থানীয় নেটওয়ার্ক দুর্বল হওয়া, সংগঠন ভেঙে যাওয়া, প্রভাব হারানো। এর পাশাপাশি রাজনৈতিক পরিচয় মুছে ফেলে আওয়ামী লীগকে জাতীয় প্রেক্ষাপট থেকে অদৃশ্য করে দেওয়া হচ্ছে।
দিনকে দিন ভয় গ্রাস করছে সংগঠনের জায়গা; নীরবতা দখল করছে প্রতিবাদের স্থান। প্রতিদিনের নিষ্ক্রিয়তা শাসকদের কাছে নতুন বিজয়।
বিচারব্যবস্থার অস্ত্রীকরণ
স্বাধীন বিচারব্যবস্থা এখন পরিণত হয়েছে রাজনৈতিক নির্যাতনের মঞ্চে। আদালতগুলো জামিন প্রত্যাখ্যান করছে, শুনানি বিলম্বিত করছে, এবং প্রমাণ ছাড়াই রিমান্ডের আদেশ দিচ্ছে। যেসব বিচারক আওয়ামী লীগের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন, তাদের বদলি বা নীরব করা হয়েছে। নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত বিচারকরা প্রশাসনের রাজনৈতিক নির্দেশ কার্যকর করছেন।
এই বিকৃত ন্যায়বিচার এক ভয়াবহ বার্তা দিচ্ছে—আওয়ামী লীগকে সমর্থন মানে নিজের স্বাধীনতা, পরিবার, জীবন সবকিছু ঝুঁকিতে ফেলা।
মানবাধিকার লঙ্ঘনের আন্তর্জাতিক সংকট
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো ইতিমধ্যে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। নথিভুক্ত হয়েছে নির্বিচার গ্রেফতার, নিখোঁজ, নির্যাতন ও হত্যার শত শত ঘটনা। শিশুদের স্কুলে যাওয়া বন্ধ, নারীরা আশ্রয়হীন, গ্রামের পর গ্রাম জনশূন্য। জাতিসংঘ ঘোষিত মানবাধিকারের মূল চেতনা—মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণ—বাংলাদেশে পদদলিত হচ্ছে।
এক ভয়ের জাতি
ঢাকা, খুলনা, রাজশাহী—যেখানেই যান, দেখবেন ফাঁকা ঘর, পুড়ে যাওয়া পতাকা, নিখোঁজ প্রতিবেশী। চায়ের দোকানে রাজনৈতিক আলোচনা নেই, মসজিদে ফিসফাস কণ্ঠে আতঙ্ক।
এই নীরবতা শান্তি নয়—এটি ভয়। এটি সেই শব্দহীন চিৎকার, যা জানিয়ে দেয় একটি জাতি তার গণতান্ত্রিক আত্মা হারাচ্ছে।
১৫ থেকে ২০ মিলিয়ন আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীর বাস্তুচ্যুতি কোনো পরিসংখ্যান নয়—এটি এক জাতির দুঃখগাঁথা। এটি প্রতিশোধ, ভয় এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অমানবিক ব্যবহারের ফল। ইউনুস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার নিরপেক্ষতার দাবি করলেও বাস্তবতা স্পষ্ট—নিরপেক্ষতা কখনো পোড়া ঘর, বন্দী মানুষ ও নির্বাসিত নাগরিকদের চেহারা ধারণ করে না।
বিশ্ব এখন নীরব থাকতে পারে না। যতদিন এই কোটি মানুষ ঘরছাড়া ও কণ্ঠহীন থাকবে, ততদিন বাংলাদেশের গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার সম্ভব নয়—সে শুধু স্মৃতিতে বেঁচে থাকবে।