Menu
Back to timeline

১০ এপ্রিল ১৯৭১: স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র ও বাংলাদেশের প্রথম সরকার

১০ এপ্রিল ১৯৭১: স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র ও বাংলাদেশের প্রথম সরকার

১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় দিন। এই দিনে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র (Proclamation of Independence) জারি করা হয় এবং এর ভিত্তিতে বাংলাদেশের প্রথম সরকার গঠিত হয়, যা পরবর্তীতে মুজিবনগর সরকার নামে পরিচিত হয়। এই সরকার গঠিত হয় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ২৬ মার্চের স্বাধীনতার ঘোষণা এবং ১৯৭০ সালের নির্বাচনে প্রাপ্ত গণরায়ের ভিত্তিতে। ১৭ এপ্রিল ১৯৭১ তারিখে এই সরকার শপথ গ্রহণ করে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করা হয় এবং তিনি সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক নিযুক্ত হন। তাঁর অনুপস্থিতিতে উপরাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন। তাজউদ্দীন আহমদ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং একই সঙ্গে প্রতিরক্ষা, তথ্য, বেতার ও যোগাযোগ, অর্থনীতি, পরিকল্পনা, শিক্ষা, স্থানীয় সরকার, স্বাস্থ্য, শ্রম, সমাজকল্যাণসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেন।

ক্যাপ্টেন এম. মনসুর আলী অর্থ, শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন এবং এ.এইচ.এম. কামরুজ্জামান স্বরাষ্ট্র, ত্রাণ ও পুনর্বাসন এবং কৃষি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেন।

১০ এপ্রিল ১৯৭১ তারিখে অধ্যাপক ইউসুফ আলী আনুষ্ঠানিকভাবে “স্বাধীন ও সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ”-এর ঘোষণা পাঠ করেন। এই ঘোষণাপত্রই ছিল বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সংবিধান, যা মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন রাষ্ট্র পরিচালনার ভিত্তি হিসেবে কাজ করে।


ঘোষণাপত্রের প্রেক্ষাপট

১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বর থেকে ১৯৭১ সালের ১৭ জানুয়ারি পর্যন্ত অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ১৬৯টি আসনের মধ্যে ১৬৭টি আসনে বিজয়ী হয়। জনগণের এই স্পষ্ট রায় সত্ত্বেও পাকিস্তানের তৎকালীন শাসক ইয়াহিয়া খান ৩ মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করেও তা অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করেন।

পরবর্তীতে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে এবং ২৫ মার্চ ১৯৭১ রাতে নিরস্ত্র বাঙালির ওপর বর্বর গণহত্যা শুরু করে। এই পরিস্থিতিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ২৬ মার্চ ১৯৭১ স্বাধীনতার ঘোষণা দেন এবং দেশবাসীকে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার আহ্বান জানান।


তাজউদ্দীন আহমদের কূটনৈতিক উদ্যোগ

বঙ্গবন্ধুর নির্দেশনা অনুযায়ী তাজউদ্দীন আহমদ গোপনে দেশত্যাগ করে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে পৌঁছান এবং ৩ এপ্রিল ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে বৈঠক করেন। এই বৈঠকে তিনি স্বাধীন বাংলাদেশের পক্ষে আন্তর্জাতিক সমর্থন ও সহায়তা কামনা করেন।

ভারত সরকার তাৎক্ষণিক স্বীকৃতি না দিলেও মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ, অস্ত্র, আশ্রয় এবং শরণার্থীদের সহায়তার প্রতিশ্রুতি দেয়। এই সহায়তা মুক্তিযুদ্ধের গতি ত্বরান্বিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।


স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের মূল বক্তব্য (সংক্ষেপে)

  • বাংলাদেশের জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিরাই সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেন
  • বঙ্গবন্ধুর ২৬ মার্চের স্বাধীনতার ঘোষণা অনুমোদন করা হয়
  • বাংলাদেশকে “সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ” হিসেবে ঘোষণা করা হয়
  • বঙ্গবন্ধুকে রাষ্ট্রপতি এবং সৈয়দ নজরুল ইসলামকে উপরাষ্ট্রপতি ঘোষণা করা হয়
  • রাষ্ট্রপতিকে নির্বাহী, আইন প্রণয়নসহ সকল ক্ষমতা প্রদান করা হয়
  • রাষ্ট্রপতির অনুপস্থিতিতে উপরাষ্ট্রপতি একই ক্ষমতা প্রয়োগ করবেন
  • এই ঘোষণাপত্র ২৬ মার্চ ১৯৭১ থেকে কার্যকর বলে গণ্য করা হয়

ঐতিহাসিক গুরুত্ব

এই ঘোষণাপত্র শুধু একটি রাজনৈতিক দলিল নয়—এটি ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতার আইনি ভিত্তি। এটি বিশ্ববাসীর কাছে প্রমাণ করে যে, বাঙালির মুক্তিযুদ্ধ ছিল একটি সংগঠিত, বৈধ ও ন্যায়সঙ্গত সংগ্রাম।

বিশ্ব ইতিহাসে খুব কম রাষ্ট্রই আনুষ্ঠানিক স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের মাধ্যমে জন্ম নিয়েছে—বাংলাদেশ সেই বিরল উদাহরণগুলোর একটি। এই দলিল আমাদের জাতির আত্মত্যাগ, সাহস এবং স্বাধীনতার অদম্য আকাঙ্ক্ষার প্রতীক।

More from the timeline

View all