“হাজারো শিশু মৃত, লক্ষাধিক সংক্রমিত—তবুও তারেক রহমান সরকারের শীতল উদাসীনতা এই প্রতিরোধযোগ্য রোগের প্রাদুর্ভাবকে এক প্রাতিষ্ঠানিক অপরাধে পরিণত করছে।”
বাংলাদেশে বর্তমানে ছড়িয়ে পড়া ভয়াবহ হামের (Measles) প্রাদুর্ভাব এক মানবিক বিপর্যয়ে রূপ নিয়েছে। শত শত শিশুর মৃত্যু এবং লক্ষাধিক সংক্রমণের মধ্যেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের প্রতিক্রিয়া যথেষ্ট নয়—এমন অভিযোগ ক্রমেই তীব্র হচ্ছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মার্চের মাঝামাঝি সময় থেকে শুরু হওয়া এই প্রাদুর্ভাবে এখন পর্যন্ত ৬০০-এর বেশি শিশু মারা গেছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে, যার মধ্যে প্রায় ৯০ জনের মৃত্যু নিশ্চিত এবং শতাধিক সন্দেহভাজন মৃত্যুর তথ্য রয়েছে। একই সময়ে ৮৩ হাজারের বেশি সন্দেহভাজন রোগী শনাক্ত হয়েছে বলে হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোর তথ্য জানাচ্ছে।
হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ এতটাই বেড়েছে যে অনেক স্থানে শয্যা সংকট দেখা দিয়েছে, এবং গুরুতর অবস্থায় অসংখ্য শিশুকে হাসপাতালের মেঝেতে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি কোনো স্বাভাবিক প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়—বরং এটি একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগের মানবসৃষ্ট সংকট, যার সূত্রপাত হয়েছিল পূর্ববর্তী প্রশাসনের সময়ে নেওয়া নীতিগত ভুল সিদ্ধান্তের মাধ্যমে এবং বর্তমানে কার্যকর ও জরুরি পদক্ষেপের অভাবে তা আরও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে।
সংকটের শুরু: টিকাদান ব্যবস্থার ভাঙন
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংকটের মূল কারণ হলো দেশের দীর্ঘদিনের সফল টিকাদান কর্মসূচির ভাঙন।
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে তৎকালীন স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় ইউনিসেফ-সমর্থিত সরবরাহ ব্যবস্থা বাদ দিয়ে “ওপেন টেন্ডার পদ্ধতি” চালু করা হয়। ইউনিসেফের কর্মকর্তারা তখনই সতর্ক করেছিলেন যে এই পরিবর্তনের ফলে টিকা সরবরাহে বিলম্ব হবে এবং বড় ধরনের প্রাদুর্ভাব দেখা দিতে পারে।
তবুও প্রশাসনিক জটিলতা ও সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের বিলম্বের কারণে টিকা সরবরাহ ব্যবস্থায় ঘাটতি দেখা দেয়। ফলে দেশজুড়ে শিশুদের নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রম ব্যাহত হয় এবং প্রতিরোধ ক্ষমতার বড় ফাঁক তৈরি হয়।
একই সময়ে প্রয়োজনীয় ভিটামিন-এ বিতরণ কর্মসূচিও ব্যাহত হয়, যা হাম রোগে মৃত্যুঝুঁকি কমাতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বর্তমান সরকারের প্রতিক্রিয়া ও সমালোচনা
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে দায়িত্ব নেওয়ার পর নতুন সরকার পরিস্থিতি মোকাবিলায় কিছু টিকাদান অভিযান শুরু করলেও সংকট এখনও নিয়ন্ত্রণে আসেনি।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিদিনই নতুন করে মৃত্যুর খবর আসছে। সম্প্রতি একদিনেই ছয়জন শিশুর মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। তবুও এখনো পূর্ণাঙ্গ জাতীয় স্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়নি, যা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে।
সরকার বলছে তারা জরুরি টিকাদান কর্মসূচি চালাচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় বাড়িয়েছে। তবে সমালোচকদের মতে, এই পদক্ষেপগুলো এখনও সংকটের মাত্রার তুলনায় অপর্যাপ্ত ও ধীরগতির।
ইমিউনাইজেশন ইতিহাসের পতন
বাংলাদেশ একসময় শিশু টিকাদানে বিশ্বের অন্যতম সফল দেশ হিসেবে পরিচিত ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেই অর্জন বড় ধাক্কা খেয়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, টিকা কাভারেজ কমে যাওয়ায় লাখো শিশু এখন ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। বিশেষ করে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুরাই সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে।
মানবিক সংকট গভীর হচ্ছে
এই প্রাদুর্ভাব শুধু একটি স্বাস্থ্য সমস্যা নয়, এটি এখন একটি গভীর মানবিক সংকটে পরিণত হয়েছে। গ্রামের দরিদ্র পরিবারগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, যেখানে চিকিৎসা সুবিধা সীমিত।
অসংখ্য মা-বাবা তাদের শিশুদের হারিয়ে শোকাহত, আর হাসপাতালগুলো প্রতিদিনই নতুন রোগীতে পূর্ণ হয়ে যাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের আহ্বান
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখনই জরুরি ভিত্তিতে—
- জাতীয় স্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা ঘোষণা
- দেশব্যাপী দ্রুত টিকাদান কর্মসূচি
- টিকা সরবরাহ ব্যবস্থার স্বচ্ছ পুনর্গঠন
- হাসপাতাল সক্ষমতা বৃদ্ধি
- পুষ্টি সহায়তা কর্মসূচি জোরদার করা
না হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।
শেষ কথা
এই সংকট কেবল একটি রোগের বিস্তার নয়—এটি প্রশাসনিক ব্যর্থতা, নীতি সিদ্ধান্তের ভুল এবং সময়মতো কার্যকর পদক্ষেপের অভাবের প্রতিফলন।
প্রতিটি সংখ্যা আসলে একটি শিশুর জীবন। আর প্রতিটি মৃত্যু একটি প্রশ্ন রেখে যাচ্ছে—আর কত শিশু মারা গেলে আমরা সত্যিই জাগব?
বাংলাদেশের শিশুদের জন্য এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি—কারণ সময় আর অপেক্ষা করছে না।