হাওয়া ভবন ও ১০ শতাংশের সাম্রাজ্য: কীভাবে তারেক রহমান রাষ্ট্রকে ব্যবসায় পরিণত করেছিলেন
আজকের বাংলাদেশ এক অস্বস্তিকর দৃশ্য প্রত্যক্ষ করছে। তারেক রহমানকে নতুন করে তুলে ধরা হচ্ছে, পুনর্বাসিত করা হচ্ছে, এমনভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে যেন তিনি ভবিষ্যতের নেতা—যেন ইতিহাস মুছে গেছে, যেন জাতির স্মৃতি লোপ পেয়েছে। ২০০১–২০০৬ সময়কালের অপরাধ, দুর্নীতি ও রাষ্ট্র দখলের ইতিহাসকে ইচ্ছাকৃতভাবে আড়াল করা হচ্ছে, হালকা করা হচ্ছে, কিংবা সুবিধামতো উপেক্ষা করা হচ্ছে।
এই বিস্মৃতি বিপজ্জনক।
কারণ ওই সময় তারেক রহমান যা করেছিলেন, তা ইতিহাসের কোনো প্রান্তটীকা নয়—তা ছিল বাংলাদেশের প্রাতিষ্ঠানিক ভাঙনের সবচেয়ে অন্ধকার অধ্যায়গুলোর একটি।
২০০১–২০০৬: কতটা ভয়ংকর ছিল তারেক রহমানের ক্ষমতা?
২০০১ থেকে ২০০৬—এই পাঁচ বছরে তারেক রহমান কোনো সাংবিধানিক পদে না থেকেও দেশের সবচেয়ে ক্ষমতাবান ব্যক্তি হয়ে ওঠেন। তিনি জনগণের ভোটে নির্বাচিত ছিলেন না, সংসদের কাছে জবাবদিহিও ছিলেন না। তবু কার্যত তিনিই ছিলেন রাষ্ট্রের সর্বময় কর্তৃত্ব।
এটি কোনো গণতান্ত্রিক নেতৃত্ব ছিল না।
এটি ছিল বংশানুক্রমিকভাবে রাষ্ট্র দখলের একটি নির্লজ্জ উদাহরণ।
এই দখলের প্রতীক ছিল হাওয়া ভবন—একটি সাধারণ বাড়ি, যা রূপ নিয়েছিল অবৈধ ক্ষমতার অসাধারণ কেন্দ্রে। হাওয়া ভবন কেবল সরকারকে প্রভাবিত করত না; তা কার্যত প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়কেও ছাপিয়ে গিয়েছিল। নীতি নির্ধারণ, প্রকল্প অনুমোদন, বদলি-পদোন্নতি, টেন্ডার, ব্যবসায়িক ছাড়—সবকিছুই ঠিক হতো সেখানে।
নির্বাচিত সরকার গৌণ হয়ে পড়েছিল।
সংবিধান অপ্রাসঙ্গিক হয়ে গিয়েছিল।
রাষ্ট্র চলত পর্দার আড়ালে, একজন অনির্বাচিত ব্যক্তির নির্দেশে।
হাওয়া ভবন: সমান্তরাল রাষ্ট্রের সদর দপ্তর
মন্ত্রীদের হাওয়া ভবনে গিয়ে লাইনে দাঁড়াতে হতো। আমলারা জানতেন—ফাইলে নিয়ম থাকলেও চলবে না, চাই অদৃশ্য অনুমোদন। ঠিকাদাররা বুঝে গিয়েছিল—এক পয়সার কাজও শুরু হবে না, যতক্ষণ না আনুগত্য ও কমিশন দেওয়া হয়।
ধীরে ধীরে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো অধস্তনে পরিণত হয়। মন্ত্রণালয়গুলো হারায় স্বাধীনতা, নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো হারায় বিশ্বাসযোগ্যতা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী হারায় নিরপেক্ষতা। যোগ্যতা, নিয়ম ও প্রক্রিয়ার জায়গা নেয় আনুগত্য, টাকা ও ভয়।
শাসনের লক্ষ্য আর জনগণ নয়—
শাসনের লক্ষ্য হয়ে ওঠে একটি সিন্ডিকেট।
এর জায়গায় গড়ে ওঠে দালাল, সন্ত্রাসী ও অপরাধী নেটওয়ার্কনির্ভর এক ব্যবস্থা। সিদ্ধান্ত নিলামে ওঠে। ক্ষমতা পণ্যে রূপ নেয়। ভয় ও সহিংসতা নিশ্চিত করে আনুগত্য।
হাওয়া ভবন রাষ্ট্রকে দুর্বল করেনি—
এটি প্রজাতন্ত্রকে ব্যক্তিগত ব্যবসায় রূপান্তর করেছিল।
আজ যারা তারেক রহমানকে নেতা হিসেবে তুলে ধরতে চান, তাদের একটি প্রশ্নের জবাব দিতেই হবে:
যিনি একসময় রাষ্ট্রকে নিজের ব্যবসায়িক সাম্রাজ্যে পরিণত করেছিলেন, তিনি কীভাবে জাতীয় নেতৃত্বের প্রতীক হতে পারেন?
১০ শতাংশের কমিশন সাম্রাজ্য: যখন দুর্নীতি হয়ে উঠল ব্যবস্থা
হাওয়া ভবনে চলা দুর্নীতি ছিল না এলোমেলো।
এটি ছিল একটি নির্দয়, নির্দিষ্ট সূত্রভিত্তিক ব্যবস্থা।
২০০১–২০০৬ বিএনপি শাসনামলে প্রতিটি সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে বাধ্যতামূলক ১০ শতাংশ কমিশন ছিল অলিখিত আইন। এটি কোনো গুজব নয়—এটি ছিল সর্বজনবিদিত, ভয়ভিত্তিকভাবে প্রয়োগ করা বাস্তবতা।
রাস্তা, সেতু, বিদ্যুৎকেন্দ্র, বন্দর, টেলিযোগাযোগ—কিছুই চলত না ঘুষ ছাড়া। ছোট প্রকল্প থেকে মেগা প্রকল্প—নিয়ম একটাই: আগে টাকা, তারপর কাজ। অস্বীকার মানে বাতিল, হয়রানি, কালো তালিকা, কিংবা তার চেয়েও ভয়াবহ কিছু।
ফলে প্রকল্প ব্যয় ইচ্ছাকৃতভাবে ফুলিয়ে ফাঁপানো হতো। নিম্নমানের অবকাঠামো তৈরি হতো। নাগরিকরা দু’বার দাম দিত—একবার করের মাধ্যমে, আরেকবার ভাঙা রাস্তা ও দুর্বল সেবার মাধ্যমে।
এই ব্যবস্থার কেন্দ্রে ছিলেন তারেক রহমান। দুর্নীতির এই একরূপতা ও নিয়মিততা তাকে একটি পরিচয় দিয়েছিল—
“মিস্টার টেন পারসেন্ট”।
এটি পরবর্তী কোনো স্লোগান নয়; এটি সেই সময়ের জীবিত অভিজ্ঞতা থেকে জন্ম নেওয়া নাম।
যখন দুর্নীতি এতটাই নিয়মে পরিণত হয়, তখন তা ব্যক্তিগত লোভ থাকে না—
তা হয়ে ওঠে নীতির বিকল্প।
ব্যাংক থেকে কালো টাকা: অর্থনীতি লুটের পূর্ণ চিত্র
১০ শতাংশ সংস্কৃতি শুধু উন্নয়ন প্রকল্পেই থামেনি; তা ছড়িয়ে পড়ে ব্যাংক, ব্যবসা, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীতে।
রাজনৈতিক চাপ দিয়ে অনুগতদের জন্য ঋণ অনুমোদন করানো হতো। জামানত ছাড়াই ঋণ, ঝুঁকি মূল্যায়ন উপেক্ষা—সবকিছু। জন্ম নেয় সুরক্ষিত ঋণখেলাপির শ্রেণি। সরকারি ব্যাংক ক্ষতিগ্রস্ত হয়, আর দলীয় ঘনিষ্ঠরা রাতারাতি কোটিপতি বনে যায়।
সরকারি চাকরি, বদলি, পদোন্নতি—সব বিক্রির পণ্যে পরিণত হয়। মেধা অপ্রয়োজনীয়, যোগ্যতা ঐচ্ছিক। পাবলিক সার্ভিস কমিশন থেকে নিয়ন্ত্রক সংস্থা—সবই দুর্নীতিতে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়।
এই ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখতে ব্যবহার করা হয় সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক। ভয় দেখানো, টেন্ডার দখল, চাঁদাবাজি—সবই ছিল কাঠামোগত হাতিয়ার। রাজনীতি ও সংগঠিত অপরাধের সীমারেখা মুছে যায়।
অবৈধ অর্থ বিদেশে পাচার হয়। আর এদিকে রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুট হতে হতে দেশ দুর্বল হয়। আর তারেক রহমান বিদেশে বিলাসী জীবনে স্থিত হন—নিজের কর্মকাণ্ডের পরিণতি থেকে দূরে।
দুর্নীতি বনাম রাষ্ট্রনায়কত্ব
রাষ্ট্রনায়ক জাতির সেবা করেন।
দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনীতিক রাষ্ট্রকে শোষণ করেন।
তারেক রহমানের রাজনৈতিক ইতিহাস দ্বিতীয় শ্রেণিতেই পড়ে।
আইনের মুখোমুখি হওয়ার বদলে তিনি অনুপস্থিতি বেছে নিয়েছেন। পলাতক থাকা কোনো আইনি কৌশল নয়—এটি নৈতিক ও রাজনৈতিক ব্যর্থতার স্বীকারোক্তি।
যিনি আইন মানতে দাঁড়ান না, তিনি আইনের শাসনের কথা বলতে পারেন না।
হাওয়া ভবনের উত্তরাধিকার মুছে যায় না।
কোনো পুনরায় ব্র্যান্ডিং তা মুছে ফেলতে পারে না।
বাংলাদেশের প্রয়োজন সততা ও জবাবদিহিভিত্তিক নেতৃত্ব—
রাষ্ট্রকে ব্যবসায় পরিণত করা সংস্কৃতির প্রত্যাবর্তন নয়।