সিলেট অঞ্চল প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর, বিশেষ করে পাথর ও বালুর জন্য এ অঞ্চল দীর্ঘদিন ধরে পরিচিত। কিন্তু এই প্রাকৃতিক সম্পদ এখন বরাদ্দ ও সংরক্ষণের পরিবর্তে লুটপাটের শিকার হচ্ছে। নদী, পাহাড় ও খাস জমি থেকে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ পাথর ও বালু উত্তোলন করা হচ্ছে, যা পরিবেশের জন্য ভয়াবহ ক্ষতিকর। আশ্চর্যের বিষয় হলো—এ লুটপাট নিয়ে স্থানীয় রাজনীতিকদের মধ্যে কোনো দ্বন্দ্ব নেই; বরং এখানে চলছে এক ধরনের অলিখিত রাজনৈতিক ‘ঐকমত্য’।
প্রথমত, স্থানীয়ভাবে যেসব গর্ত খনন, অবৈধ ড্রেজার মেশিন ব্যবহার ও নদীর গতিপথ পরিবর্তন করা হচ্ছে, তা আইনত সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। তবু প্রশাসনের চোখের সামনে দিন-রাত এসব কার্যক্রম চলছে। এর পেছনে রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তি ও সিন্ডিকেট সক্রিয়। ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি বিরোধী দলের অনেক নেতাকর্মীও এই অবৈধ বালু-পাথর উত্তোলন ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। ফলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও কার্যত নীরব ভূমিকা পালন করছে।
দ্বিতীয়ত, এই ‘ঐকমত্য’-এর কারণে পরিবেশের ক্ষতি ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। নদীর তলদেশ থেকে বালু তোলা হওয়ায় ভাঙন বৃদ্ধি পাচ্ছে, কৃষিজমি ধ্বংস হচ্ছে এবং জীববৈচিত্র্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়ছে। পাহাড় কেটে পাথর তোলার ফলে ভূ-প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। তবু এই বিপর্যয় রোধে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না। কারণ, রাজনীতির মাঠে প্রতিপক্ষ হলেও লুটপাটের বেলায় সবাই এক প্ল্যাটফর্মে।
তৃতীয়ত, সাধারণ মানুষ এ লুটপাটের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী। কৃষক তার জমি হারাচ্ছে, জেলেরা মাছ পাচ্ছে না, আর গ্রামীণ মানুষ ভাঙন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের শিকার হচ্ছে। অথচ তাদের ক্ষতিপূরণ নেই, ন্যায়বিচার নেই। তারা জানে, যেখানেই অভিযোগ করুক না কেন, প্রভাবশালী মহলের ছায়ায় থাকা এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে টিকতে পারবে না।
চতুর্থত, প্রশাসনের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে। মাঝে মাঝে কাগুজে অভিযান চালালেও তা শুধুই দেখানোর জন্য। বড় মাছরা থেকে যায় অদৃশ্য, ধরা পড়ে কেবল নামমাত্র শ্রমিক বা ছোট মাপের ব্যবসায়ী। এভাবে লুটপাটের মূল কারিগররা থেকে যাচ্ছে ধরা-ছোঁয়ার বাইরে।
সবশেষে বলা যায়, সিলেটে বালু ও পাথর লুটপাট আর কেবল অবৈধ ব্যবসা নয়, এটি এখন রাজনৈতিক সমঝোতার প্রতীক হয়ে উঠেছে। ক্ষমতাসীন ও বিরোধী উভয় পক্ষই সরাসরি বা পরোক্ষভাবে এতে লাভবান হচ্ছে। তাই পরিবেশ, জনগণ ও দেশের স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হলেও এই ‘ঐকমত্য’ ভাঙছে না। যদি দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তবে সিলেটের প্রাকৃতিক ভারসাম্য ভয়াবহভাবে নষ্ট হবে এবং এর দায় বহন করতে হবে পুরো দেশকে।