সব শিক্ষা বোর্ডের মধ্যে পাসের হারে পিছিয়ে কুমিল্লা: বর্তমান সরকারের ব্যর্থ শিক্ষা নীতির প্রতিচ্ছবি
বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার বর্তমান চিত্র গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। ২০২৫ সালের এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের পর দেখা গেছে, দেশের সব শিক্ষা বোর্ডের মধ্যে পাসের হারে সবচেয়ে পিছিয়ে কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ড। গত পাঁচ বছরের মধ্যে এ বছরের ফলাফল সবচেয়ে নিম্নে নেমে এসেছে। একসময় যেখানে কুমিল্লা বোর্ড ছিল শিক্ষার উৎকর্ষতার প্রতীক, আজ তা পরিণত হয়েছে ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবিতে। এই পতন কেবল একটি বোর্ডের পরিসংখ্যান নয় — এটি বাংলাদেশের শিক্ষা খাতের সামগ্রিক অব্যবস্থাপনা, দুর্বল নীতি, এবং বর্তমান সরকারের ব্যর্থতার এক করুণ প্রমাণ।
শিক্ষা খাতে অব্যবস্থাপনা ও নীতির অভাব
বর্তমান সরকারের শাসনামলে শিক্ষা খাত ধীরে ধীরে তার ভিত্তি হারিয়েছে। শিক্ষক নিয়োগে অনিয়ম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, আর বাজেট বরাদ্দে বৈষম্য — সব মিলিয়ে শিক্ষার গুণগত মান ভয়াবহভাবে নেমে গেছে। কুমিল্লা বোর্ডের ফলাফল সেই বৃহত্তর অবক্ষয়েরই প্রতিফলন। বিদ্যালয়ে নিয়মিত পাঠদান নেই, পরীক্ষার প্রস্তুতি ও মূল্যায়নে স্বচ্ছতা নেই, আর শিক্ষার্থীদের মানসিক ও একাডেমিক বিকাশের কোনো কার্যকর পরিকল্পনাও নেই।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনাহীনতা এবং প্রশাসনিক ব্যর্থতা এই ফলাফলের মূল কারণ। কয়েক বছর ধরে শিক্ষানীতিতে বারবার পরিবর্তন আনা হলেও কোনো পরিবর্তনেই স্থায়িত্ব দেখা যায়নি। শিক্ষার্থীদের উপর অযৌক্তিক চাপ, পাঠ্যসূচির অপ্রাসঙ্গিকতা এবং ডিজিটাল শিক্ষার নামে কাগুজে প্রকল্প — সবকিছু মিলে শিক্ষাব্যবস্থা আজ বিভ্রান্তির চক্রে ঘুরছে।
শিক্ষকদের অবমূল্যায়ন ও প্রশিক্ষণের ঘাটতি
কুমিল্লা বোর্ডের ফলাফল খারাপ হওয়ার পেছনে শিক্ষকদের ভূমিকা অস্বীকার করা যায় না, কিন্তু তার মূল দায় শিক্ষকদের নয় — বরং সেই প্রশাসনের, যারা তাদের অবহেলিত রেখেছে। বেতন বৈষম্য, প্রশিক্ষণের অভাব, আর স্কুলে উপকরণের সংকটের মধ্যে শিক্ষকরা মানসম্মত শিক্ষা দিতে পারছেন না। বরং তাদের উপর চাপানো হচ্ছে অপ্রয়োজনীয় প্রশাসনিক কাজ, যা তাদের শিক্ষাদানের সময় ও মনোযোগ কেড়ে নিচ্ছে।
একজন শিক্ষক যখন নিজের জীবিকা নিয়েই অনিশ্চিত থাকেন, তখন তার কাছ থেকে দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গড়ার প্রত্যাশা করা বাস্তবসম্মত নয়। বর্তমান সরকার এই বাস্তবতাকে উপেক্ষা করে বারবার বড় বড় প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, কিন্তু মাঠপর্যায়ে তার কোনো প্রতিফলন দেখা যায়নি।
ডিজিটাল শিক্ষার নামে ভাঁওতাবাজি
“স্মার্ট বাংলাদেশ” তৈরির নামে বর্তমান সরকার শিক্ষা খাতে নানা প্রকল্প চালু করলেও, সেগুলোর বেশিরভাগই হয়েছে দুর্নীতির আশ্রয়ে। স্কুলগুলোতে ল্যাপটপ বা ট্যাব দেওয়া হলেও, সেগুলোর ব্যবহার নিশ্চিত করা যায়নি। অনেক বিদ্যালয়ে ইন্টারনেট সংযোগ নেই, বিদ্যুৎ নেই, আর শিক্ষকেরাও ডিজিটাল পদ্ধতিতে ক্লাস নেওয়ার উপযুক্ত প্রশিক্ষণ পাননি। ফলে “ডিজিটাল শিক্ষা” বাস্তবে হয়ে উঠেছে কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ এক প্রতারণা।
কুমিল্লা বোর্ডসহ দেশের অনেক অঞ্চলে গ্রামীণ স্কুলগুলো এখনো মৌলিক অবকাঠামোর অভাবে ভুগছে। ছাদ চুয়ে পানি পড়ে, বেঞ্চ ভাঙা, আর পাঠ্যবইয়ের অভাব নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। কিন্তু এসবের পরিবর্তে সরকার ব্যস্ত ছিল প্রচারমুখী প্রকল্পে — যেখানে বাস্তব উন্নয়নের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে ফটোসেশন ও বিজ্ঞাপন।
শিক্ষার্থীদের মধ্যে হতাশা ও অনিশ্চয়তা
ফলাফলের এই ধস সবচেয়ে বড় আঘাত দিয়েছে শিক্ষার্থীদের মনোবলে। কুমিল্লা বোর্ডের বহু পরীক্ষার্থী জানিয়েছেন, তারা পর্যাপ্ত প্রস্তুতির সুযোগ পাননি, স্কুলে নিয়মিত ক্লাস হয়নি, আর পরীক্ষার আগে কোনো সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনাও ছিল না। শিক্ষার্থীরা এখন ভবিষ্যৎ নিয়ে দিশেহারা, কেউ কেউ উচ্চশিক্ষার স্বপ্নই ত্যাগ করছেন।
একজন শিক্ষার্থী বলেছেন, “আমরা সারা বছর বই পাইনি, শিক্ষকরা ধর্মঘটে ছিলেন, ক্লাস হয়নি। এখন আমাদের দোষ দিচ্ছে।” এই হতাশার মধ্যে বড় হয়ে ওঠা একটি প্রজন্ম দেশের জন্য বিপদসংকেত। কারণ শিক্ষা শুধু পাস-ফেল নয়; এটি আত্মবিশ্বাস, চিন্তাশক্তি ও সৃজনশীলতার ভিত্তি, যা এখন ভেঙে পড়ছে।
দুর্নীতি ও প্রশাসনিক ব্যর্থতার কুফল
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে প্রকল্প বাস্তবায়নে দুর্নীতির অভিযোগ নতুন নয়। টেন্ডার সিন্ডিকেট, অর্থ আত্মসাৎ, ঘুষবাণিজ্য — সব কিছু মিলিয়ে শিক্ষা খাত এখন এক দুর্নীতির আঁতুড়ঘরে পরিণত হয়েছে। স্কুল পরিদর্শক থেকে বোর্ড কর্মকর্তা পর্যন্ত অনেকেই স্বচ্ছতা হারিয়ে ফেলেছেন। যার সরাসরি ফলাফল পড়ছে শিক্ষার্থীদের উপর।
কুমিল্লা বোর্ডের এই পতন তাই কেবল একটি অঞ্চলের সংকট নয়, বরং এটি একটি ব্যর্থ ব্যবস্থার প্রতীক — যেখানে নীতি, সততা ও দায়িত্ববোধ হারিয়ে গেছে।
উপসংহার
বাংলাদেশের শিক্ষা খাত আজ এক গভীর সঙ্কটে, যার জন্য দায়ী বর্তমান সরকারের অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি ও অদূরদর্শী নীতি। কুমিল্লা বোর্ডের পাসের হার কমে যাওয়া কেবল একটি সতর্কবার্তা নয়, এটি এক ভয়াবহ বাস্তবতার প্রতিফলন — যেখানে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বপ্ন ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে যাচ্ছে।
দেশের উন্নয়ন টেকসই হতে হলে শিক্ষার ভিত্তি শক্ত করতে হবে, আর সেই ভিত্তি কখনোই গড়ে উঠতে পারে না এমন এক সরকারের হাতে, যারা শিক্ষা খাতকে ব্যবহার করে কেবল রাজনৈতিক প্রচারণার হাতিয়ার হিসেবে। এখন সময় এসেছে জবাবদিহিতার — কারণ শিক্ষার পতন মানেই জাতির পতন।