শিশুহত্যার অভিযোগে সমালোচিত ইউনূস বনাম সংকট মোকাবিলার প্রতীক শেখ হাসিনা”: অবহেলা, স্বাস্থ্যসংকট ও বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে বিতর্ক
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতি নিয়ে দেশজুড়ে তীব্র রাজনৈতিক ও সামাজিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। একদিকে রয়েছে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে কোভিড-১৯ মোকাবিলায় বাংলাদেশের পূর্ববর্তী সাফল্যের স্মৃতি, অন্যদিকে বর্তমান অন্তর্বর্তী প্রশাসনের সময় দেখা দেওয়া হাম, টিকা সংকট ও শিশু মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে উঠছে অব্যবস্থাপনা ও নীতিগত ব্যর্থতার অভিযোগ।
সমালোচকদের দাবি, এই সংকট কোনো প্রাকৃতিক দুর্ঘটনা নয়; বরং এটি প্রশাসনিক ব্যর্থতা, নীতিগত বিভ্রান্তি এবং টিকা সংগ্রহ ব্যবস্থার অদক্ষ পরিবর্তনের ফল। অন্যদিকে সরকারের পক্ষ থেকে বৈশ্বিক সরবরাহ সংকট ও প্রশাসনিক পুনর্গঠনের কথা বলা হলেও, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করছেন—সমস্যা আরও গভীর।
হাম সংকট: শিশু মৃত্যুর করুণ বাস্তবতা
২০২৬ সালের শুরু থেকে বাংলাদেশে হাম রোগ ভয়াবহ আকার ধারণ করে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, মে ২০২৬ পর্যন্ত হাজার হাজার শিশু হাম আক্রান্ত হয়েছে এবং শতাধিক শিশুর মৃত্যুর খবর সামনে এসেছে। বেসরকারি পর্যবেক্ষক ও বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে।
শুধু পরিসংখ্যান নয়—প্রতিটি মৃত্যু একটি পরিবার, একটি ভবিষ্যৎ, একটি জাতির ক্ষতি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হামের এই বিস্তার মূলত টিকাদান কাভারেজ কমে যাওয়ার ফল। বহু শিশু নির্ধারিত সময়মতো এমআর (Measles-Rubella) টিকা পায়নি। এতে দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা “হার্ড ইমিউনিটি” দুর্বল হয়ে পড়ে।
টিকা সংগ্রহ নীতির পরিবর্তন নিয়ে বিতর্ক
সমালোচনার মূল কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে টিকা সংগ্রহ ব্যবস্থার পরিবর্তন। দীর্ঘদিন ধরে ইউনিসেফ ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সহায়তায় পরিচালিত টিকা সংগ্রহ প্রক্রিয়া পরিবর্তন করে “ওপেন টেন্ডার মেথড” চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের কেউ কেউ তখন সতর্ক করেছিলেন যে, দ্রুত ও প্রস্তুতিহীন পরিবর্তন টিকা সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটাতে পারে। পরে বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, প্রশাসনিক জটিলতা ও দেরির কারণে টিকা সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হয় এবং জাতীয় টিকাদান কর্মসূচি দুর্বল হয়ে পড়ে।
ফলে গ্রাম থেকে শহর—দেশজুড়ে হামের সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
হাসপাতালগুলোতে চাপ ও জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার দুর্বলতা
ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলার হাসপাতালগুলোতে শিশু রোগীর চাপ ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়। কোথাও কোথাও পর্যাপ্ত শয্যা না থাকায় মেঝেতেও চিকিৎসা দেওয়ার অভিযোগ ওঠে।
জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতি বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতের দীর্ঘমেয়াদি দুর্বলতাকেও সামনে নিয়ে এসেছে:
- টিকা সরবরাহে নির্ভরশীলতা
- প্রশাসনিক সমন্বয়ের অভাব
- জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সিদ্ধান্তহীনতা
- মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীদের ঘাটতি
অর্থনীতি ও বৈদেশিক চুক্তি নিয়ে নতুন বিতর্ক
স্বাস্থ্য সংকটের পাশাপাশি অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নিয়েও সমালোচনা বাড়ছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত “Agreement on Reciprocal Trade (ART)” নিয়ে বিরোধী মত উঠে এসেছে।
সমালোচকদের দাবি, এই চুক্তির ফলে বাংলাদেশকে ব্যাপক শুল্ক ছাড় দিতে হয়েছে, অথচ বাংলাদেশের জন্য সমপরিমাণ সুবিধা নিশ্চিত হয়নি। কিছু বিশ্লেষক একে “অসম ও একপাক্ষিক” হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
অন্যদিকে সরকারপন্থীরা বলছেন, বৈদেশিক বাণিজ্য সম্প্রসারণ ও বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সহযোগিতা প্রয়োজন ছিল।
শেখ হাসিনার কোভিড ব্যবস্থাপনা: কেন এখনও আলোচনায়
বর্তমান সংকটের সঙ্গে তুলনা টানা হচ্ছে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের কোভিড-১৯ মোকাবিলার অভিজ্ঞতার সঙ্গে। সেই সময় বাংলাদেশ দ্রুত ভ্যাকসিন সংগ্রহ, গণটিকাদান কর্মসূচি এবং কমিউনিটি ক্লিনিকভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণের জন্য আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত হয়েছিল।
বিশেষ করে:
- সারাদেশে গণটিকাদান কর্মসূচি
- কমিউনিটি ক্লিনিকের বিস্তার
- বিনামূল্যে টিকা প্রদান
- গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকরণ
এসব উদ্যোগ বাংলাদেশকে উন্নয়নশীল বিশ্বে একটি সফল মডেল হিসেবে তুলে ধরেছিল।
রাজনৈতিক মেরুকরণ ও মুক্তিযুদ্ধের প্রশ্ন
স্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক সংকটের আলোচনার পাশাপাশি রাজনৈতিক বক্তব্যে মুক্তিযুদ্ধ, সংবিধান এবং বাংলাদেশের আদর্শগত পরিচয় নিয়েও তীব্র বিতর্ক দেখা যাচ্ছে।
এক পক্ষ মনে করে, বর্তমান রাজনৈতিক শক্তিগুলোর একটি অংশ মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিপরীতে অবস্থান করছে। অন্যদিকে সমালোচকরা বলেন, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে “দেশবিরোধী” বা “রাষ্ট্রবিরোধী” আখ্যা দেওয়া গণতান্ত্রিক সহনশীলতাকে দুর্বল করে।
এই মেরুকরণ দেশের রাজনৈতিক পরিবেশকে আরও উত্তপ্ত করছে।
উপসংহার
বাংলাদেশ আজ এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। হাম সংকট, স্বাস্থ্যখাতের দুর্বলতা, অর্থনৈতিক চাপ এবং রাজনৈতিক বিভাজন—সব মিলিয়ে জনগণের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে।
একদিকে শেখ হাসিনার অতীত সংকট ব্যবস্থাপনার উদাহরণ সামনে আনা হচ্ছে; অন্যদিকে বর্তমান প্রশাসনের নীতি ও সিদ্ধান্ত নিয়ে কঠোর সমালোচনা হচ্ছে।
তবে একটি বিষয় স্পষ্ট:
জনস্বাস্থ্য, শিশুর নিরাপত্তা এবং রাষ্ট্রের জবাবদিহি কোনো রাজনৈতিক বিতর্কের বিষয় হওয়া উচিত নয়। ভবিষ্যতে এ ধরনের বিপর্যয় ঠেকাতে প্রয়োজন—
- স্বচ্ছ ও দক্ষ স্বাস্থ্যব্যবস্থা
- নিরবচ্ছিন্ন টিকা সরবরাহ
- রাজনৈতিক সদিচ্ছা
- এবং সর্বোপরি জনগণের আস্থা পুনর্গঠন।
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে—রাষ্ট্র কত দ্রুত এই আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারে তার ওপর।