Menu
Back to timeline

রাজনৈতিক অচলাবস্থা থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা: ১৯৭১-এর উত্তাল প্রেক্ষাপট

রাজনৈতিক অচলাবস্থা থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা: ১৯৭১-এর উত্তাল প্রেক্ষাপট

১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে Sheikh Mujibur Rahman-এর নেতৃত্বাধীন Awami League নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করলেও তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে রাজনৈতিক সংকট দ্রুত গভীরতর হয়। ক্ষমতা হস্তান্তরে গড়িমসি ও অস্পষ্টতার প্রেক্ষিতে বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলন শুরু হয়, যা কার্যত প্রশাসনিক কাঠামোকে অচল করে দেয়। মার্চের শুরুতেই ঢাকার রাজপথ পরিণত হয় গণআন্দোলনের কেন্দ্রে।

৭ মার্চের ভাষণ: এক ঐতিহাসিক মোড়

১৯৭১ সালের ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান Suhrawardy Udyan) বঙ্গবন্ধু ঐতিহাসিক ভাষণ প্রদান করেন। আনুষ্ঠানিক স্বাধীনতার ঘোষণা না দিলেও ভাষণটি ছিল প্রস্তুতি ও প্রতিরোধের আহ্বান—যা অনেক ইতিহাসবিদের মতে স্বাধীনতার অভিপ্রায়ের এক প্রকার ঘোষণাই। এতে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে সংকট এক চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে।

আলোচনা, সন্দেহ ও সামরিক প্রস্তুতি

অস্থিরতার মধ্যে পাকিস্তানের সামরিক শাসক প্রেসিডেন্ট Yahya Khan মার্চের মাঝামাঝি ঢাকায় এসে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আলোচনা শুরু করেন। ২৪ মার্চ পর্যন্ত বৈঠক চললেও রাজনৈতিক সমাধান মেলেনি। একই সময়ে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে অতিরিক্ত সেনা ও অস্ত্র পূর্বাঞ্চলে আনার খবর ছড়িয়ে পড়ে।

পরে প্রকাশিত বিভিন্ন স্মৃতিচারণ ও গ্রন্থ—যেমন পাকিস্তানি সামরিক কর্মকর্তা Siddiq Salik-এর Witness to Surrender—ইঙ্গিত দেয়, আলোচনার আড়ালেই সামরিক অভিযানের প্রস্তুতি চলছিল। ২৫ মার্চ রাতেই অভিযান শুরুর পরিকল্পনা চূড়ান্ত হয়।

অপারেশন সার্চলাইট

২৫ মার্চ মধ্যরাতের কিছু আগে পাকিস্তান সেনাবাহিনী “Operation Searchlight” নামে অভিযান শুরু করে। আনুষ্ঠানিকভাবে রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠার কথা বলা হলেও বাস্তবে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হন রাজনৈতিক কর্মী, ছাত্র, নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য এবং সাধারণ নাগরিক।

ঢাকার Rajarbagh Police Lines, Pilkhana-এ ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলসের সদরদপ্তর, এবং University of Dhaka ক্যাম্পাস—বিশেষ করে জগন্নাথ হল—আক্রমণের শিকার হয়। ট্যাংক ও ভারী অস্ত্র ব্যবহার করে প্রায় নিরস্ত্র মানুষের ওপর হামলা চালানো হয়। প্রাথমিক পর্যায়েই হাজার হাজার মানুষ নিহত হন বলে বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখ আছে।

২৬ মার্চ ভোররাতে ধানমন্ডির বাসভবন থেকে বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তার করে পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়া হয়। তবে গ্রেপ্তারের আগে তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠিয়ে দেন।

স্বাধীনতার ঘোষণা ও বেতার সম্প্রচার

বঙ্গবন্ধুর নামে জারি করা স্বাধীনতার ঘোষণা প্রথমে চট্টগ্রাম থেকে প্রচারিত হয়। Swadhin Bangla Betar Kendra-এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মীরা ২৬ মার্চ বার্তাটি প্রচার করেন। আওয়ামী লীগ নেতা M. A. Hannan এটি পাঠ করেন বলে ব্যাপকভাবে স্বীকৃত।

পরদিন ২৭ মার্চ, চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে মেজর Ziaur Rahman বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা পুনঃপ্রচার করেন। এই সম্প্রচার দেশ-বিদেশে প্রতিরোধের সূচনার বার্তা পৌঁছে দেয়।

আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া

অভিযান ও স্বাধীনতার ঘোষণার খবর দ্রুত আন্তর্জাতিক পরিসরে ছড়িয়ে পড়ে। BBC, Voice of America, The Daily Telegraph, The Guardian, The New York Times-সহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ঢাকার সামরিক অভিযান ও রাজনৈতিক বিচ্ছেদের খবর প্রকাশ করে। শিরোনামে উঠে আসে ‘গৃহযুদ্ধ’, ‘স্বাধীনতার ঘোষণা’ ও ‘সামরিক আইন’—যা ইঙ্গিত দেয়, সংকট আর কেবল রাজনৈতিক আলোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই।

দমন অভিযান থেকে মুক্তিযুদ্ধ

২৫–২৬ মার্চের ঘটনার পর দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রতিরোধ গড়ে ওঠে। ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস ও সশস্ত্র বাহিনীর বাঙালি সদস্যরা সংগঠিত প্রতিরোধ শুরু করেন। বিচ্ছিন্ন প্রতিরোধ দ্রুত রূপ নেয় সমন্বিত মুক্তিযুদ্ধে।

স্বাধীনতার ঘোষণা ছিল নয় মাসব্যাপী এক রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের সূচনা—যার পরিণতিতে ১৯৭১ সালের ডিসেম্বর মাসে বাংলাদেশ একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।

২৫ মার্চের রাত বাংলাদেশের ইতিহাসে এক গভীর বেদনাবহ ও তাৎপর্যপূর্ণ সন্ধিক্ষণ—যখন রাজনৈতিক অচলাবস্থা রূপ নেয় সশস্ত্র সংঘাতে, এবং স্বায়ত্তশাসনের দাবি পরিণত হয় পূর্ণ স্বাধীনতার যুদ্ধে।

More from the timeline

View all