বাংলাদেশের তথাকথিত “গণতন্ত্র ও স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধারের” নামে গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আসলে রাষ্ট্রকে নিক্ষেপ করেছে অরাজকতার গভীর খাদে। এমনকি যারা দেশ ও জনগণকে রক্ষার শপথ নিয়েছিলেন—সেই পুলিশ সদস্যরাই আজ হামলা, হুমকি ও হত্যার শিকার হচ্ছেন নিয়মিত। রাষ্ট্রের নীরবতায় তাদের রক্ত যেন হয়ে উঠেছে অমূল্য নয়, বরং সস্তা, অবহেলিত ও বিস্মৃত।
রক্তাক্ত সংখ্যার ভয়াবহতা
২০২৪ সালের ২০ জুলাই থেকে ১৪ আগস্ট পর্যন্ত মাত্র তিন সপ্তাহে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে অন্তত ৪৪ জন পুলিশ সদস্য হত্যার শিকার হন। কেবল ৫ আগস্টেই নিহত হন ২৫ জন—কনস্টেবল, সাব-ইন্সপেক্টর থেকে শুরু করে থানার দায়িত্বশীল কর্মকর্তা পর্যন্ত। তারা কেউ পিটিয়ে, কেউ কুপিয়ে, কেউ ফাঁসিতে ঝুলিয়ে অথবা নদী-খালে লাশ ফেলে নির্মমভাবে হত্যার শিকার হন।
হবিগঞ্জের বানিয়াচঙ্গে অফিসার সন্তোষ চৌধুরীকে থানার ভেতর থেকে টেনে বের করে হত্যা করে গাছে ঝুলিয়ে রাখা হয়। সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুরে ওসি আবদুর রাজ্জাকসহ ১৬ জন পুলিশ সদস্যকে কুপিয়ে হত্যা করে লাশ পুকুরে ফেলে দেওয়া হয়। ঢাকার যাত্রাবাড়ীতে চার পুলিশকে পিটিয়ে হত্যার পর থানায় আগুন দেওয়া হয়। নেত্রকোনার দুর্গাপুরে শফিকুল ইসলামকে ধারালো অস্ত্রে হত্যা করা হয়। এই নির্মম দৃশ্যগুলো প্রমাণ করে—রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব ভেঙে পড়েছে, আইনের রক্ষকরা নিজেরাই এখন আইনের বাইরে ফেলে রাখা হয়েছে।
রাষ্ট্রের নীরবতা ও বৈষম্য
এত ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞের পরও রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া ছিল শীতল ও নীরব। বিক্ষোভকারীদের মৃত্যুর খবর প্রচার পেয়েছে সংবাদমাধ্যমে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে; কিন্তু নিহত পুলিশদের নাম যেন ইচ্ছে করেই আড়াল করা হয়েছে। পুলিশ সদর দপ্তর পর্যন্ত নিশ্চিত করতে পারেনি কতটি মামলা হয়েছে, কতটি তদন্ত শুরু হয়েছে, বা কতজন গ্রেপ্তার হয়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে মামলা ঝুলে গেছে, তদন্ত থেমে গেছে, আর পরিবারগুলো একা পড়ে গেছে অসহায় শোকে।
শহীদ পুলিশ সদস্যদের পরিবার—স্ত্রী, সন্তান, বৃদ্ধ মা-বাবা—আজ ভাত-কাপড়ের অভাবে দিন কাটাচ্ছেন। প্রতিশ্রুত ক্ষতিপূরণ, ভাতা কিংবা সহায়তা হয় বিলম্বিত, নয়তো একেবারেই আসে না। রাষ্ট্রীয় শোকবার্তা বা সমবেদনা পর্যন্ত পৌঁছায় না তাদের দরজায়। এতে পরিবারগুলো শুধু ব্যক্তিগত ক্ষতিই বহন করছে না, তারা রাষ্ট্রীয় অবহেলার শিকারও হচ্ছে।
দ্বিমুখী নীতি
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রকৃত মুখ উন্মোচিত হয়েছে তাদের ঘোষিত নির্দেশনায়। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে তারা ঘোষণা দেয়—“জুলাই আন্দোলন” সম্পর্কিত কোনো মামলা, গ্রেপ্তার বা হয়রানি চলবে না। অর্থাৎ পুলিশ হত্যা, থানায় অগ্নিসংযোগ কিংবা হামলার ঘটনাও এর আওতায় পড়ে যায়। এতে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়: বিক্ষোভকারীর জীবন মূল্যবান, কিন্তু পুলিশ সদস্যের জীবন তুচ্ছ।
কিছু জায়গায়, যেমন নোয়াখালীর সোনাইমুড়ীতে, তিনজন হামলাকারী গ্রেপ্তার হলেও সেগুলো ব্যতিক্রম মাত্র। বাস্তবে অধিকাংশ ঘটনায় অপরাধীরা থেকে গেছে ধরা-ছোঁয়ার বাইরে। এর ফলে হামলাকারীরা আরও উৎসাহিত হচ্ছে, কারণ তারা জানে—রাষ্ট্র তাদের অপরাধের বিচার করবে না।
উপসংহার
একটি রাষ্ট্রের মূল শক্তি হলো তার আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। অথচ আজ সেই বাহিনীই বারবার রক্তাক্ত হচ্ছে, আর সরকার নীরব দর্শকের ভূমিকায়। এই নীরবতা আসলে এক অঘোষিত বার্তা—পুলিশের রক্ত তুচ্ছ, তাদের আত্মত্যাগ অমূল্য নয়, বরং রাজনৈতিক স্বার্থের কাছে বিসর্জনযোগ্য।
প্রশ্নটা আজ গোটা জাতির সামনে দাঁড়িয়ে: যদি যারা আইনের রক্ষক, তারাই অরক্ষিত হয়; যদি তাদের হত্যার বিচার না হয়, তাহলে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে কে?