বিশ্ব তখন উত্তাল সময় পার করছিল। একদিকে বিভিন্ন দেশে স্বাধীনতা ও আত্মনিয়ন্ত্রণের আন্দোলন জোরদার হচ্ছিল, অন্যদিকে কোথাও কমিউনিস্ট বিপ্লব, কোথাও বা বিচ্ছিন্নতাবাদী সংঘাত রাষ্ট্রব্যবস্থাকে বদলে দিচ্ছিল।
কিন্তু এই প্রেক্ষাপটে বাঙালি জাতির স্বাধীনতার সংগ্রাম ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরণের—একটি অনন্য রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক যাত্রা।
অন্যান্য অনেক দেশের মতো সশস্ত্র বিদ্রোহ দিয়ে নয়, বরং সাংবিধানিক ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই বাংলাদেশের স্বাধীনতার পথ নির্মিত হয়। ১৯৭০ সালের ঐতিহাসিক পাকিস্তান জাতীয় নির্বাচনে বাঙালির প্রতিনিধিত্বকারী দল নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। সেই বিজয় শুধু একটি নির্বাচনী সাফল্য ছিল না—এটি ছিল বাঙালি জাতির স্বতঃস্ফূর্ত গণরায়ের প্রতিফলন।
এই ঐতিহাসিক আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন Sheikh Mujibur Rahman—যিনি পরবর্তীকালে “বঙ্গবন্ধু” নামে সমগ্র জাতির হৃদয়ে স্থান করে নেন।
দূরদর্শী নেতৃত্বের মাধ্যমে তিনি প্রথমে ভাষার অধিকার আদায়ের আন্দোলনকে এগিয়ে নেন। সেই আন্দোলন ধীরে ধীরে রূপ নেয় স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক সংগ্রামে। দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় ধরে জাতিকে রাজনৈতিকভাবে প্রস্তুত করার পর তিনি ঘোষণা করেন ঐতিহাসিক ছয় দফা কর্মসূচি—যা বাঙালির ‘মুক্তির সনদ’ হিসেবে পরিচিত।
তার নেতৃত্বে গণমানুষের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ ক্রমেই তীব্র হয়ে ওঠে। নানা ষড়যন্ত্র, মামলা, কারাবরণ ও দমন-পীড়ন সত্ত্বেও তার নেতৃত্বাধীন দল বিপুল গণসমর্থন অর্জন করে এবং নির্বাচনে ঐতিহাসিক বিজয় লাভ করে।
১৯৭১ সালের শুরুতেই পরিস্থিতি এক নতুন মোড় নেয়। প্রায় সত্তর মিলিয়ন বাঙালি এক অভিন্ন লক্ষ্যে ঐক্যবদ্ধ হয়ে ওঠে। মার্চের শুরুতে কার্যত দেশের রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ চলে আসে বঙ্গবন্ধুর হাতে। তার প্রতিটি নির্দেশনা জাতিকে পরিচালিত করছিল এবং একই সঙ্গে সম্ভাব্য সশস্ত্র সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত করছিল।
এরপর আসে সেই ঐতিহাসিক মোড়।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের গভীর রাতে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী পূর্ব পাকিস্তানের নিরস্ত্র জনগণের ওপর নির্মম গণহত্যা চালায়—যা ইতিহাসে এক বিভীষিকাময় অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত। এই বর্বরতার প্রতিক্রিয়ায় স্বাধীনতার ঘোষণা আসে, এবং শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ।
সেই মুহূর্ত থেকেই বাঙালি জাতি শোষণ-নিপীড়নের শৃঙ্খল ভেঙে মুক্তির পথে যাত্রা শুরু করে। দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে জন্ম নেয় একটি স্বাধীন রাষ্ট্র—বাংলাদেশ।
অতএব, মুক্তিযুদ্ধ ছিল আকস্মিক কোনো ঘটনা নয়; এটি ছিল দশকের পর দশক ধরে গড়ে ওঠা রাজনৈতিক সংগ্রামের চূড়ান্ত রূপ। এই সংগ্রামই বিশ্বমানচিত্রে বাঙালি জাতিকে প্রতিষ্ঠিত করে একটি আত্মত্যাগী, সংগ্রামী ও দৃঢ়চেতা জাতি হিসেবে।