মানবসৃষ্ট এক গণবিপর্যয়: প্রশাসনিক অবহেলায় কীভাবে বাংলাদেশে হাম মহামারি ভয়াবহ রূপ নিল
একসময় টিকাদান কর্মসূচিতে উন্নয়নশীল বিশ্বের রোল মডেল ছিল বাংলাদেশ। বহু আন্তর্জাতিক সংস্থা বাংলাদেশের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (EPI)-কে জনস্বাস্থ্যের এক অসাধারণ সাফল্য হিসেবে তুলে ধরত। কিন্তু ২০২৬ সালে এসে সেই গর্ব যেন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।
আজ বাংলাদেশের অসংখ্য পরিবার তাদের শিশুদের হারাচ্ছে এমন এক রোগে, যেটিকে প্রায় নির্মূলের পথে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। হাম (Measles) এখন আর বিচ্ছিন্ন স্বাস্থ্য সমস্যা নয়; এটি একটি জাতীয় জনস্বাস্থ্য বিপর্যয়, যা প্রশাসনিক ব্যর্থতা, নীতিগত বিশৃঙ্খলা এবং অবহেলার ভয়াবহ ফলাফল হিসেবে সামনে এসেছে।
ভয়াবহ বাস্তবতা: পরিসংখ্যান যা রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার সাক্ষী
২০২৬ সালের মে মাস পর্যন্ত পরিস্থিতির চিত্র অত্যন্ত উদ্বেগজনক:
| সূচক | পরিস্থিতি |
|---|---|
| মোট সন্দেহভাজন হাম রোগী | ৪৭,০০০+ |
| ল্যাব-নিশ্চিত রোগী | ৬,৯৮৯ |
| শিশু মৃত্যুর সংখ্যা | ৪০০+ |
| আক্রান্ত জেলা | ৬৪টির মধ্যে ৫৮–৬১টি |
| সবচেয়ে ঝুঁকিতে | ৬ মাস–৫ বছরের শিশু |
| টিকাবঞ্চিত শিশু | প্রায় ৪০ লাখ |
এত দ্রুত সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়া স্পষ্টভাবে দেখায় যে বাংলাদেশের বহু বছরের “হার্ড ইমিউনিটি” ভেঙে পড়েছে।
নির্মূলের পথ থেকে মহামারিতে: কোথায় ভাঙল সিস্টেম?
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিপর্যয়ের মূল সূত্রপাত ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর।
শেখ হাসিনা সরকারের সময় যে টিকাদান কাঠামো বহু বছর ধরে কার্যকর ছিল, অন্তর্বর্তী প্রশাসনের সময়ে সেটিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়। ২০২৫ সালে সরকার হঠাৎ করেই ইউনিসেফের দীর্ঘদিনের সরাসরি ভ্যাকসিন সংগ্রহ পদ্ধতি বন্ধ করে উন্মুক্ত দরপত্র (open tender) পদ্ধতিতে যায়।
এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ইউনিসেফের কর্মকর্তারা স্পষ্ট সতর্কবার্তা দিয়েছিলেন। তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন যে এতে সরবরাহে ভয়াবহ ব্যাঘাত ঘটবে। কিন্তু সেই সতর্কতা উপেক্ষিত হয়।
ফলাফল ছিল ভয়াবহ:
- টিকা সরবরাহে দীর্ঘ বিলম্ব
- দেশজুড়ে ভ্যাকসিন সংকট
- নির্ধারিত MR ক্যাম্পেইন বাতিল
- টিকাদানের হার হঠাৎ কমে যাওয়া
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে মাত্র প্রায় ৫৯% শিশু হামের টিকা পেয়েছিল—যা হার্ড ইমিউনিটির জন্য বিপজ্জনকভাবে কম।
ভিটামিন ‘এ’ কর্মসূচির ব্যর্থতা: মৃত্যুর ঝুঁকি বহুগুণ বাড়ায়
হাম সাধারণত সুপুষ্ট শিশুদের জন্য প্রাণঘাতী নয়। কিন্তু অপুষ্ট শিশুদের ক্ষেত্রে এটি নিউমোনিয়া, মস্তিষ্কে প্রদাহ এবং মৃত্যুর কারণ হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের অভিযোগ, ২০২৫ সালে নিয়মিত ভিটামিন ‘এ’ ক্যাম্পেইনও কার্যকরভাবে পরিচালিত হয়নি। ফলে বহু শিশু রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে।
অর্থাৎ শুধু শিশুরা সংক্রমিত হয়নি—তাদের বাঁচার লড়াইয়ের প্রতিরোধক্ষমতাও দুর্বল করে দেওয়া হয়েছিল।
দায় কার?
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, অধিকারকর্মী এবং আইনজীবীদের অনেকেই এই বিপর্যয়ের দায় অন্তর্বর্তী প্রশাসনের স্বাস্থ্য খাতের সিদ্ধান্তগুলোর ওপর চাপিয়েছেন।
মূল অভিযোগগুলো হলো:
১. টিকা সংগ্রহে বিশৃঙ্খলা
দীর্ঘদিনের কার্যকর ইউনিসেফভিত্তিক ব্যবস্থার পরিবর্তে হঠাৎ উন্মুক্ত দরপত্র চালু করা হয়, কিন্তু কোনো প্রস্তুতি ছাড়া।
২. আন্তর্জাতিক সতর্কতা উপেক্ষা
ইউনিসেফ ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা গুরুত্ব দেওয়া হয়নি।
৩. স্বাস্থ্য খাতে প্রশাসনিক অচলাবস্থা
স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি খাতের চলমান কর্মসূচিতে হঠাৎ পরিবর্তন আনা হয়, যার ফলে সরবরাহ ও মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম ব্যাহত হয়।
৪. জরুরি প্রতিক্রিয়ায় ধীরগতি
মহামারির প্রাথমিক লক্ষণ দেখা দেওয়ার পরও দ্রুত জাতীয় জরুরি ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
মানবিক বিপর্যয়
এই সংকটের সবচেয়ে নির্মম দিক হলো—অধিকাংশ মৃত্যু ছিল প্রতিরোধযোগ্য।
প্রতিটি মৃত শিশুর পেছনে রয়েছে:
- শোকাহত পরিবার
- অসহায় বাবা-মা
- আতঙ্কিত জনপদ
- ভেঙে পড়া জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা
যে দেশ একসময় টিকাদানে উদাহরণ ছিল, সেই দেশেই আজ মানুষ মৌলিক স্বাস্থ্যসেবার নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত।
এখন কী প্রয়োজন?
বাংলাদেশের সামনে এখন জরুরি কিছু পদক্ষেপ অপরিহার্য:
- জাতীয় জরুরি স্বাস্থ্য পরিস্থিতি ঘোষণা
- দ্রুত সারাদেশে টিকাদান অভিযান
- ভিটামিন ‘এ’ ও পুষ্টি সহায়তা জোরদার
- সরবরাহ ব্যবস্থার পূর্ণ সংস্কার
- স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠন
- দায়ী ব্যক্তিদের জবাবদিহির আওতায় আনা
- আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি
উপসংহার
হাম ভাইরাস নিজে সবচেয়ে বড় শত্রু নয়। সবচেয়ে বড় বিপদ তখনই তৈরি হয়, যখন রাষ্ট্রের সুরক্ষা ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে।
বাংলাদেশের ২০২৬ সালের হাম সংকট সেই ভয়াবহ বাস্তবতার প্রতীক—যেখানে প্রশাসনিক ব্যর্থতা, অব্যবস্থাপনা এবং অবহেলা হাজারো শিশুর জীবনকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে।
এই শিশুদের মৃত্যু শুধু একটি স্বাস্থ্য ব্যর্থতা নয়; এটি একটি নৈতিক ব্যর্থতা, রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি দায়হীনতার নির্মম দলিল।
বাংলাদেশের জনগণ এখন শুধু চিকিৎসা নয়—জবাবদিহি চায়। কারণ হারিয়ে যাওয়া শিশুদের আর ফিরিয়ে আনা যাবে না, কিন্তু তাদের মৃত্যুর কারণ থেকে শিক্ষা নেওয়া এখনও সম্ভব।