বিবিসি বাংলা প্রতিবেদন: দেড় বছরেও উদ্ধার হয়নি হাজারের বেশি লুট হওয়া অস্ত্র, নির্বাচনী নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ
বাংলাদেশে জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের সময় পুলিশের কাছ থেকে লুট হওয়া বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদ দেড় বছর পার হলেও পুরোপুরি উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। এখনো এক হাজারের বেশি আগ্নেয়াস্ত্র এবং দুই লক্ষাধিক গুলি নিখোঁজ রয়েছে, যা আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে গুরুতর নিরাপত্তা ঝুঁকির আশঙ্কা তৈরি করেছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনের আগে এসব অস্ত্র উদ্ধার করা না গেলে সুষ্ঠু ও নিরাপদ ভোটগ্রহণ বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
অস্ত্র উদ্ধারে অভিযান, কিন্তু অগ্রগতি সীমিত
গত ১৭ মাসে সেনাবাহিনী ও পুলিশের সমন্বয়ে একাধিক বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। এমনকি লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধারে তথ্য দিলে সর্বোচ্চ পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত পুরস্কার ঘোষণাও করেছে অন্তর্বর্তী সরকার।
তবে এসব উদ্যোগ সত্ত্বেও প্রত্যাশিত অগ্রগতি হয়নি। ধারণা করা হচ্ছে, অনেক অস্ত্র ইতোমধ্যে বিভিন্ন অপরাধী চক্রের হাতে চলে গেছে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের সভাপতি অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল এ এন এম মুনিরুজ্জামান বিবিসি বাংলাকে বলেন,
“গত দেড় বছরে সব লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধার হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তা করতে ব্যর্থ হয়েছে। নির্বাচনের আগে অস্ত্র উদ্ধার না হলে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন কঠিন হয়ে পড়বে।”
পুলিশ বাহিনীর দুর্বলতা ও জনঅসন্তোষ
জুলাই আন্দোলনের পর থেকে পুলিশ বাহিনী পুরোপুরি কার্যক্ষমতা ফিরে পায়নি। ফলে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে জনমনে অসন্তোষ বাড়ছে। নির্বাচন সামনে রেখে বিভিন্ন এলাকায় গুলিবর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ভোটারদের উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে।
নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ড. আবদুল আলীম বলেন,
“এই পরিস্থিতিতে সরকারকে স্পষ্টভাবে জানাতে হবে কীভাবে অস্ত্রের অপব্যবহার বন্ধ করা হবে এবং নিরাপদ নির্বাচন নিশ্চিত করা হবে। ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে তাদের ভোটকেন্দ্রে আনা কঠিন হবে।”
কত অস্ত্র লুট হয়েছিল, কত উদ্ধার হয়েছে
জুলাই আন্দোলনের সময় পুলিশের ভূমিকা নিয়ে জনরোষ চরমে পৌঁছায়। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ৫ আগস্ট দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রায় ৪৫০টির বেশি থানা ও পুলিশ ফাঁড়িতে হামলা ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। গণভবন থেকেও বিশেষ নিরাপত্তা বাহিনীর (এসএসএফ) অস্ত্র লুট হয়।
প্রাথমিকভাবে পুলিশের হিসাবে প্রায় ৫,৫০০ আগ্নেয়াস্ত্র এবং প্রায় ৬ লাখ ৫০ হাজার গুলি লুট হয়েছিল। তবে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান জানিয়েছেন, প্রকৃত সংখ্যা ছিল ৩,৬১৯টি অস্ত্র এবং ৪ লাখ ৫৬ হাজার ৪১৮ রাউন্ড গুলি।
এ পর্যন্ত উদ্ধার হয়েছে ২,২৫৯টি অস্ত্র, যা মোটের প্রায় ৬২ শতাংশ। এছাড়া প্রায় ২ লাখ ৩৭ হাজার গুলি উদ্ধার করা হয়েছে, যা মোট গুলির প্রায় ৫২ শতাংশ।
অপরাধী ও উগ্রপন্থীদের হাতে অস্ত্র যাওয়ার আশঙ্কা
লুট হওয়া অনেক অস্ত্র গত দেড় বছরে ডাকাতি, চাঁদাবাজি, ছিনতাই ও হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত হয়েছে বলে জানা গেছে। খুলনা ও চট্টগ্রামে অভিযান চালিয়ে পুলিশ লুট হওয়া অস্ত্রসহ অপরাধীদের গ্রেপ্তার করেছে। মুন্সীগঞ্জে এক নারী হত্যাকাণ্ডেও লুট হওয়া অস্ত্র ব্যবহারের প্রমাণ মিলেছে।
মেজর জেনারেল মুনিরুজ্জামান বলেন,
“অস্ত্র যদি অপরাধী বা উগ্রপন্থী গোষ্ঠীর হাতে পৌঁছে যায়, তাহলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য তা বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।”
সাবেক আইজিপি নুরুল হুদাও একই উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন,
“নিখোঁজ অস্ত্র সব সময় নিরাপত্তার জন্য বড় ঝুঁকি, কারণ এগুলো কার হাতে আছে তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।”
নির্বাচন ঘিরে বাড়ছে নিরাপত্তা শঙ্কা
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, এবারের সংসদ নির্বাচন অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। পুলিশ বাহিনীর দুর্বল অবস্থা এবং জনআস্থার সংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।
এদিকে নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত ৫৯টি দলের মধ্যে ৫১টি দল নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে, তবে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ থাকায় রাজনৈতিক উত্তেজনা আরও বেড়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতি নির্বাচনে সহিংসতার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
নির্বাচনী সহিংসতা ও ভোটার আতঙ্ক
ইতোমধ্যে কয়েকজন প্রার্থী হামলার শিকার হয়েছেন। ঢাকা-৮ আসনের সম্ভাব্য প্রার্থী শরিফ ওসমান হাদি গুলিতে নিহত হওয়ার ঘটনা জনমনে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
সরকার গুরুত্বপূর্ণ প্রার্থীদের নিরাপত্তা বাড়ানোর পাশাপাশি অনেককে অস্ত্রের লাইসেন্স দিয়েছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এতে নতুন ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
ভোটার উপস্থিতি নিয়ে অনিশ্চয়তা
মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস কালচার ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, অন্তর্বর্তী সরকারের ১৭ মাসে গুলিবর্ষণের ঘটনায় অন্তত ২২ জন নিহত ও ১৩৭ জন আহত হয়েছেন।
নির্বাচন বিশেষজ্ঞদের মতে, নিরাপত্তা নিয়ে জনগণের উদ্বেগ দূর করা না গেলে ভোটার উপস্থিতি মারাত্মকভাবে কমে যেতে পারে।
ড. আবদুল আলীম বলেন,
“মানুষ যদি নির্বাচনের সময় নিজেদের নিরাপদ মনে না করে, তাহলে তারা ভোটকেন্দ্রে যেতে আগ্রহী হবে কি না, সেটি বড় প্রশ্ন হয়ে থাকবে।”