বাংলাদেশে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে একের পর এক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা যেন দৈনন্দিন বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে। রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, চট্টগ্রাম— সর্বত্র আগুনে পুড়ছে মানুষের জীবন, ঘরবাড়ি ও শিল্প প্রতিষ্ঠান। প্রতিটি অগ্নিকাণ্ডের পর তদন্ত কমিটি গঠিত হয়, প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয় ভবিষ্যতে এমন দুর্ঘটনা আর হবে না— কিন্তু কিছুদিন পরই আবার একই দৃশ্য ফিরে আসে। এই পুনরাবৃত্তি কেবল একটিমাত্র বিষয়ই স্পষ্ট করে— দেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থা ভয়াবহভাবে দুর্বল, অব্যবস্থাপনা ও দায়হীনতার শিকার।
অবকাঠামো ও পরিকল্পনার ঘাটতি
বাংলাদেশের অধিকাংশ ভবন, বিশেষ করে পুরনো বাণিজ্যিক ও আবাসিক ভবনগুলো নির্মিত হয়েছে যথাযথ নিরাপত্তা বিধি মেনে নয়। ফায়ার সার্ভিসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাজধানীর ৯০ শতাংশ ভবনেই অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম হয় নেই, নয়তো কার্যকর নয়। ভবনের জরুরি নির্গমন পথগুলো বন্ধ রাখা হয় দোকান বা গুদাম হিসেবে, অনেক জায়গায় অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র মেয়াদোত্তীর্ণ অবস্থায় পড়ে থাকে। অথচ বিল্ডিং কোডে এসব বাধ্যতামূলক করা আছে, কিন্তু বাস্তবায়নে শূন্যতা।
পরিকল্পনার অভাব শুধু ভবনেই নয়, নগর ব্যবস্থাপনাতেও স্পষ্ট। সংকীর্ণ রাস্তা, ঘিঞ্জি জনবসতি, অপরিকল্পিত বৈদ্যুতিক তার— সব মিলিয়ে যে কোনো ছোট আগুন মুহূর্তেই ভয়াবহ রূপ নেয়। আগুন লাগলে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে দেরি হয়, পানি সংগ্রহে বাধা পড়ে, আর ততক্ষণে আগুন ছড়িয়ে পড়ে প্রাণহানিতে।
দুর্নীতি ও তদারকির অভাব
প্রতিটি বড় অগ্নিকাণ্ডের পরই দেখা যায় একই চিত্র— ভবনের অনুমোদনে অনিয়ম, পরিদর্শনে অবহেলা, আর মালিকদের প্রভাবশালী সম্পর্কের কারণে দায়মুক্তি। নিরাপত্তা সনদ বা ‘নো অবজেকশন সার্টিফিকেট’ (এনওসি) ছাড়াই অসংখ্য কারখানা, মার্কেট ও হোটেল চালু রয়েছে। ফায়ার সার্ভিসের অনুমোদন থাকলেও, তা প্রায়ই ঘুষের বিনিময়ে নেওয়া হয়, বাস্তব নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকে না।
সরকারি সংস্থাগুলোর সমন্বয়হীনতাও বড় সমস্যা। ফায়ার সার্ভিস, সিটি করপোরেশন, রাজউক, শিল্প মন্ত্রণালয়— কারও দায়িত্ব পরিষ্কার নয়। এক সংস্থা অন্যের উপর দায় চাপিয়ে দায়মুক্তি নেয়। ফলে আগুনের ঘটনায় দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা হয় না, কেবল কিছু ছোট কর্মচারী বরখাস্ত হয়ে ঘটনাটি চাপা পড়ে যায়।
মানুষের সচেতনতা ও প্রশিক্ষণের অভাব
অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা দুর্বল হওয়ার আরেকটি কারণ হলো জনগণের অজ্ঞতা ও প্রশিক্ষণের অভাব। অধিকাংশ কর্মক্ষেত্র ও আবাসিক এলাকায় কোনো অগ্নিনির্বাপণ মহড়া হয় না, এমনকি অনেকেই জানেন না আগুন লাগলে কীভাবে নিজেকে রক্ষা করবেন। ফায়ার সেফটি সংক্রান্ত শিক্ষা এখনো স্কুল বা কর্মক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক নয়। ফলে দুর্ঘটনার সময় আতঙ্ক ও বিশৃঙ্খলার কারণে প্রাণহানি আরও বেড়ে যায়।
রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব
সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হলো সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব। প্রতিটি অগ্নিকাণ্ডের পর প্রধানমন্ত্রী থেকে মন্ত্রী পর্যন্ত শোক ও তদন্তের ঘোষণা দেন, কিন্তু তার ফলাফল কখনো জনসমক্ষে আসে না। কোনো বড় শিল্প মালিক বা প্রভাবশালী ব্যক্তিকে এখনো কঠোর শাস্তি পেতে দেখা যায়নি। এই দায়হীন সংস্কৃতি মূলত অগ্নিকাণ্ডের পুনরাবৃত্তিকে উৎসাহিত করছে।
উপসংহার
বারবার অগ্নিকাণ্ড আজ স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, বাংলাদেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থা কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ। পরিকল্পনার অভাব, দুর্নীতি, অবহেলা ও দায়মুক্তির সংস্কৃতি মিলে এই দুর্যোগকে স্থায়ী রূপ দিয়েছে। আগুনে হারানো প্রতিটি প্রাণ আমাদের মনে করিয়ে দেয়— এটি কোনো প্রাকৃতিক দুর্ঘটনা নয়, বরং প্রশাসনিক ব্যর্থতা ও নীতিনির্ধারকদের উদাসীনতার ফল।
যদি এখনই কঠোর আইন প্রয়োগ, ভবন তদারকি, সচেতনতা বৃদ্ধি ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত না করা হয়, তবে “আগুনে পুড়ছে বাংলাদেশ” কথাটি রূপক নয়, বাস্তবেই এক জাতির নিরাপত্তাহীনতার প্রতীক হয়ে থাকবে।