বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে ভয়াবহ মূল্যস্ফীতি সংকটে: জাতিসংঘের প্রতিবেদনে স্পষ্ট সত্য
জাতিসংঘের সর্বশেষ মূল্যস্ফীতি প্রতিবেদন বাংলাদেশ সম্পর্কে আর কোনো দ্বিধা রাখে না। দক্ষিণ এশিয়ার সাতটি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ বর্তমানে সবচেয়ে গুরুতর মূল্যস্ফীতি সংকটে রয়েছে। ২০২৫ সালে দেশের গড় মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৮.৯ শতাংশে—যা এই অঞ্চলের অন্য সব দেশের তুলনায় অনেক বেশি। তুলনামূলকভাবে ভারতে মূল্যস্ফীতি মাত্র ২.৭ শতাংশ এবং শ্রীলঙ্কায় তা নেমে এসেছে ০.৬ শতাংশে।
আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই সংকট থেকে বেরিয়ে আসার কোনো স্পষ্ট লক্ষণ নেই। জাতিসংঘের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালেও বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি থাকবে প্রায় ৭.১ শতাংশ—যা তখনও দক্ষিণ এশিয়ার সর্বোচ্চ। যখন প্রতিবেশী দেশগুলো ধীরে ধীরে স্থিতিশীলতার পথে ফিরছে, বাংলাদেশ তখন ক্রমেই গভীরতর জীবনযাত্রার ব্যয়ের সংকটে ডুবে যাচ্ছে।
পরিবারের নিত্যজীবন ভেঙে দিচ্ছে মূল্যস্ফীতি
এই সংখ্যাগুলো কেবল অর্থনৈতিক সূচক নয়—এগুলো প্রতিদিনের জীবনের নির্মম বাস্তবতা। এক বছর আগে যে পরিবারটি মাসে ১০ হাজার টাকায় বাজার-খরচ চালাতে পারত, আজ সেই একই জিনিস কিনতে তাদের প্রয়োজন হচ্ছে কমপক্ষে ১৫ হাজার টাকা।
শিক্ষক, বেতনভুক্ত কর্মচারী, দিনমজুর, রিকশাচালক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী—সবাই ক্রমবর্ধমান দামের চাপে নাজেহাল। মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো ধীরে ধীরে জীবনমান নামিয়ে আনছে, আর নিম্নআয়ের মানুষ তিন বেলা খাবার জোগাড় করতেই হিমশিম খাচ্ছে। মূল্যস্ফীতি এখন এক ধরনের অদৃশ্য কর—যা প্রতিদিন মানুষের বেঁচে থাকার ওপর চাপ বাড়াচ্ছে।
প্রতিবেশীরা ঘুরে দাঁড়াল, বাংলাদেশ রইল পিছিয়ে
বাংলাদেশের সংকটকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে আঞ্চলিক তুলনা। শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তান—যারা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মারাত্মক মূল্যস্ফীতির ধাক্কা সামলেছে—এখন পরিস্থিতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে এনেছে। শ্রীলঙ্কা ২০২১ সালে যেখানে ৪৯ শতাংশ মূল্যস্ফীতির মুখে পড়েছিল, সেখানে তা এখন নেমে এসেছে ০.৬ শতাংশে। পাকিস্তানও ৩০ শতাংশ থেকে নামিয়ে এনেছে প্রায় ৪ শতাংশে।
অন্যদিকে, বাংলাদেশ টানা দেড় বছরের বেশি সময় ধরে ৮ শতাংশের ওপরে আটকে আছে। একসময় যে দেশটি আপেক্ষিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার উদাহরণ হিসেবে পরিচিত ছিল, আজ সেই দেশের মানুষ দিশেহারা ও অর্থনৈতিকভাবে ক্লান্ত।
অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থনৈতিক ব্যর্থতা
২০২৪ সালের জুলাইয়ে নির্বাচিত সরকার উৎখাতের পর বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে এই স্থবিরতার দায় স্পষ্ট হয়ে উঠছে। মূল্যস্ফীতির কাঠামোগত কারণগুলো মোকাবিলায় সরকারের নীতিগত উদ্যোগ কার্যকর হয়নি।
সুদের হার বাড়ানো কিংবা কিছু পণ্যে শুল্ক কমানোর মতো পদক্ষেপ নেওয়া হলেও সেগুলো স্থায়ী স্বস্তি দিতে পারেনি। বরং গত দুই মাসে মূল্যস্ফীতি আবার বাড়তে শুরু করেছে, যা নীতির অসামঞ্জস্য ও দুর্বল বাস্তবায়নের ইঙ্গিত দেয়। এটি বৈশ্বিক কোনো অনিবার্য অভিঘাত নয়; এটি স্পষ্টতই প্রশাসনিক ব্যর্থতা।
আঞ্চলিক ব্যতিক্রম হিসেবে বাংলাদেশ
জাতিসংঘের মূল্যায়নে বাংলাদেশ এখন দক্ষিণ এশিয়ায় একটি বিব্রতকর ব্যতিক্রম। ভারত, নেপাল, ভুটান, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কা—সব দেশই মূল্যস্ফীতি ৫ শতাংশের নিচে নামাতে সক্ষম হয়েছে। বাংলাদেশ একমাত্র দেশ, যা এখনও ৮ শতাংশের ওপরে রয়ে গেছে।
এই পার্থক্য শুধু অর্থনৈতিক দুর্বলতার নয়, প্রাতিষ্ঠানিক অক্ষমতার প্রতিফলন। মূল্য নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতাই এখন বর্তমান শাসনব্যবস্থার একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।
খাদ্যপণ্যের দামই মূল যন্ত্রণা
অর্থনীতিবিদরা একমত—খাদ্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণ না করতে পারলে মানুষের দুর্ভোগ কমবে না। গত বছরের শুরুতে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল প্রায় ১১ শতাংশ। ডিসেম্বরের দিকে তা নেমে আসে ৭.৩৬ শতাংশে, কিন্তু এরপর আবার ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে।
এই ওঠানামা স্পষ্ট করে দেয়—কোনো সুসংহত কৌশল নেই। নীতি নেওয়া হচ্ছে, আবার মূল্যায়নের আগেই বদলে ফেলা হচ্ছে। ধারাবাহিকতার এই অভাব মূল্যস্ফীতিকে নিয়ন্ত্রণের বদলে আরও স্থায়ী করে তুলছে।
বাজার সিন্ডিকেট অপ্রতিরোধ্য
পাইকারি বাজারে সক্রিয় সিন্ডিকেট ভাঙার কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ নেই। কিছু ব্যবসায়ী গোষ্ঠী দামে কারসাজি করছে, আর ভোক্তারা তার বোঝা বহন করছে। কৃষক ন্যায্যমূল্য পাচ্ছে না, অথচ সেই পণ্য শহরের বাজারে বিক্রি হচ্ছে চড়া দামে।
এই মধ্যস্বত্বভোগীরা প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে প্রতিদিন মানুষের আয় শুষে নিচ্ছে, আর প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো কার্যত নিষ্ক্রিয়।
নীরবে দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে দিচ্ছে মূল্যস্ফীতি
আয় না বাড়লেও খরচ বাড়ছে। ফলে প্রকৃত অর্থে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাচ্ছে। অনেক পরিবার টিকে থাকতে ঋণের ওপর নির্ভর করছে। কেউ সন্তানকে স্কুল থেকে তুলে নিচ্ছে, কেউ চিকিৎসা পিছিয়ে দিচ্ছে।
মূল্যস্ফীতি এখন নীরব দারিদ্র্য উৎপাদনের যন্ত্রে পরিণত হয়েছে।
শাসনব্যবস্থার ওপর রায়
এই জাতিসংঘ প্রতিবেদন মূলত অর্থনৈতিক শাসনব্যবস্থার একটি রিপোর্ট কার্ড—আর সেই রায় স্পষ্ট। বাংলাদেশ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়েছে। ২০২৬ সালেও আশার আলো নেই। প্রতিবেশীরা এগিয়ে যাচ্ছে, বাংলাদেশ আটকে আছে স্থবিরতায়।
নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদসহ উচ্চপ্রোফাইল উপদেষ্টাদের উপস্থিতি সত্ত্বেও ক্ষমতাসীনরা সাধারণ মানুষের সবচেয়ে মৌলিক প্রশ্নটির সমাধান দিতে পারেননি—খাবার কেনার সামর্থ্য।
জাতিসংঘ এখন প্রমাণসহ সেই ব্যর্থতাকে নথিভুক্ত করেছে।
এটিকে যদি জাতীয় লজ্জা না বলা যায়, তবে লজ্জা কাকে বলে—তা নতুন করে ভাবতে হবে।