Menu
Back to timeline

বাংলাদেশে সংখ্যালঘুরা কি নিরাপদ? সহিংসতার ধারাবাহিক অভিযোগের মুখে বিএনপি সরকার

বাংলাদেশে সংখ্যালঘুরা কি নিরাপদ? সহিংসতার ধারাবাহিক অভিযোগের মুখে বিএনপি সরকার

ছয় মাসে ৪৪ জনের মৃত্যুর অভিযোগ, উপাসনালয় ও বসতবাড়িতে হামলা, শত শত অধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা এবং রংপুরে একই হিন্দু পরিবারের চার সদস্যের হত্যাকাণ্ড—সব মিলিয়ে ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আরও গভীর হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো, বৈষম্যহীন বাংলাদেশের প্রতিশ্রুতিকে বাস্তবে কতটা কার্যকর করা যায়।

২০২৬ সালেও বাংলাদেশের ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ কাটেনি। সরকার পরিবর্তনের পরও তাদের মধ্যে বিদ্যমান ভয় ও অনিশ্চয়তা দূর হয়েছে—এমন নিশ্চয়তা দেওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি বলে বিভিন্ন সংখ্যালঘু অধিকার সংগঠন দাবি করছে।

বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের (বিএইচবিসিইউসি) প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে দেশে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ২৫৭টি ঘটনা নথিভুক্ত করা হয়েছে। এসব ঘটনার মধ্যে ৪০টি ঘটনায় ৪৪ জনের মৃত্যুর তথ্য উল্লেখ করেছে সংগঠনটি।

তাদের প্রতিবেদনে উপাসনালয়, বসতবাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা, প্রাণনাশের হুমকি, হত্যাচেষ্টা, জমি দখলের অভিযোগ, অপহরণ এবং নারীর প্রতি সহিংসতার মতো ঘটনাও উঠে এসেছে। সংগঠনটির দাবি, সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবর ও নিজস্ব তথ্য সংগ্রহের ভিত্তিতে এসব পরিসংখ্যান তৈরি করা হয়েছে; প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে।

অন্যদিকে, হিউম্যান রাইটস কংগ্রেস ফর বাংলাদেশ মাইনরিটিজ (এইচআরসিবিএম) জানিয়েছে, জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত দেশের ৬৪টি জেলার মধ্যে ৬৩টিতে সংখ্যালঘুদের অধিকার লঙ্ঘনের ৮২৪টি অভিযোগ তারা নথিভুক্ত করেছে। এসব অভিযোগের মধ্যে জমি ও সম্পত্তি দখল, শারীরিক হামলা, হত্যাকাণ্ড, রহস্যজনক মৃত্যু, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে আক্রমণ এবং যৌন সহিংসতার ঘটনা রয়েছে।

তবে উল্লেখ করা জরুরি, এসব সংখ্যা সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর প্রকাশিত হিসাব; এগুলোকে স্বাধীনভাবে যাচাইকৃত জাতীয় পরিসংখ্যান হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। তবু অভিযোগগুলোর ব্যাপ্তি ও প্রকৃতি নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি রাখে।

জুনের পরও থামেনি উদ্বেগ

সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ শুধু বছরের প্রথম ছয় মাসেই সীমাবদ্ধ ছিল না।

বিএইচবিসিইউসির আগস্টে প্রকাশিত তথ্যে বলা হয়, জুলাই মাসে সংবাদপত্রে প্রকাশিত ঘটনাগুলোর ভিত্তিতে দেশজুড়ে অন্তত ৪১টি সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনা নথিভুক্ত করা হয়েছে। সংগঠনটির তালিকায় রয়েছে ছয়টি হত্যাকাণ্ড, দুটি ধর্ষণের ঘটনা, মন্দির ও প্রতিমা ভাঙচুর বা লুটপাটের ১০টি ঘটনা, আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ওপর পাঁচটি হামলা, বসতবাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা বা লুটপাটের ১০টি ঘটনা এবং জোরপূর্বক জমি দখলের দুটি অভিযোগ।

সংগঠনটি নিজেই এই হিসাবকে আংশিক বলে উল্লেখ করেছে।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তার পরিস্থিতি মূল্যায়ন করতে শুধু পুলিশ বা প্রশাসনের ‘সাম্প্রদায়িক ঘটনা’ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা মামলার সংখ্যার ওপর নির্ভর করলে চলবে না। কোনো হিন্দু পরিবারের বাড়িতে হামলা, কোনো আদিবাসী সম্প্রদায়ের জমি দখল কিংবা কোনো মন্দিরে ভাঙচুরের ঘটনা—এসবের প্রতিটিতেই ভুক্তভোগীদের নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা জরুরি।

কোনো ঘটনাকে শেষ পর্যন্ত প্রশাসনিকভাবে কোন শ্রেণিতে অন্তর্ভুক্ত করা হলো, তা দিয়ে ঘটনার গুরুত্ব বা ভুক্তভোগীর ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার নির্ধারিত হতে পারে না।

আগের অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ের হিসাবও বিতর্কের ঊর্ধ্বে নয়

বর্তমান পরিস্থিতির সূত্রপাত বিএনপি সরকারের সময়েই হয়েছে—এমন দাবি করা সঠিক হবে না। সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়ে বিতর্ক ও উদ্বেগ আগের অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও ছিল।

চলতি বছরের জানুয়ারিতে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকার পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য উদ্ধৃত করে জানিয়েছিল, ২০২৫ সালে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্যদের সংশ্লিষ্ট ৬৪৫টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছিল। এর মধ্যে পুলিশ মাত্র ৭১টি ঘটনায় সাম্প্রদায়িক উপাদান থাকার কথা উল্লেখ করে। বাকি ৫৭৪টি ঘটনাকে চুরি, জমি নিয়ে বিরোধ, প্রতিবেশীদের বিরোধ, ধর্ষণ, অস্বাভাবিক মৃত্যু ও অন্যান্য অপরাধসহ সাধারণ অপরাধের আওতায় শ্রেণিবদ্ধ করা হয়।

সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, এ পর্যালোচনা করা হয়েছিল এজাহার, সাধারণ ডায়েরি, অভিযোগপত্র ও তদন্তের অগ্রগতিসংক্রান্ত তথ্যের ভিত্তিতে।

এখানে দুটি বিষয় আলাদা করে দেখা জরুরি। কোনো সংখ্যালঘু নাগরিক অপরাধের শিকার হলেই সেই অপরাধ স্বয়ংক্রিয়ভাবে সাম্প্রদায়িক হয়ে যায় না। কিন্তু কোনো ঘটনাকে সাধারণ অপরাধ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করলেই ধর্মীয় বিদ্বেষ, ভয়ভীতি প্রদর্শন, জমি দখলের উদ্দেশ্য কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার সম্ভাবনা আপনা-আপনি নাকচ হয়ে যায় না।

অতএব, সরকারি পরিসংখ্যান ও সংখ্যালঘু অধিকার সংগঠনগুলোর তথ্যের মধ্যে যে পার্থক্য রয়েছে, তা রাজনৈতিক বক্তব্যের মাধ্যমে উড়িয়ে না দিয়ে স্বাধীন ও স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে পর্যালোচনা করা দরকার।

নতুন বিএনপি সরকারের সামনে এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা: সরকার কি অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করবে, নাকি আগের মতোই পাল্টাপাল্টি পরিসংখ্যান ও পরস্পরবিরোধী বক্তব্যের মধ্যে প্রকৃত সত্য আড়ালে থেকে যাবে?

রংপুরে একই পরিবারের চার সদস্যের মৃত্যু: উত্তরহীন প্রশ্নের ভার

সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়ে চলমান বিতর্কে রংপুরে একটি হিন্দু পরিবারের চার সদস্যের হত্যাকাণ্ড সবচেয়ে উদ্বেগজনক ঘটনাগুলোর একটি হয়ে উঠেছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২২ আগস্ট রংপুরের মাচুয়াপাড়ায় নিজ বাড়ি থেকে অবসরপ্রাপ্ত রংপুর জিলা স্কুলের শিক্ষক ৬৫ বছর বয়সী গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী ৫০ বছর বয়সী প্রীতিলতা চক্রবর্তী, তাঁদের মেয়ে আগমী চক্রবর্তী এবং ছেলে আয়ুষের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পুলিশ জানায়, চারজনকেই শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে।

এ ঘটনায় একই এলাকার দুই তরুণ সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাসকে আটক করে পরে গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশের প্রাথমিক বক্তব্য অনুযায়ী, সন্দেহভাজন ব্যক্তিরা বাড়ির ছাদে মাদক সেবন করছিলেন; গণপতি চক্রবর্তী তাঁদের বাধা দেওয়ার পর হত্যাকাণ্ড ঘটে থাকতে পারে। তদন্তের পরবর্তী পর্যায়ে জমিসংক্রান্ত বিরোধের সম্ভাবনাও বিবেচনায় নেওয়া হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে মামলার তদন্ত ঘিরে দ্রুতই নানা প্রশ্ন দেখা দেয়।

তদন্তের দায়িত্ব গোয়েন্দা শাখার কাছে হস্তান্তর করা হয়। পুলিশ ডিএনএ ও মাদক পরীক্ষাসহ বিভিন্ন ফরেনসিক পরীক্ষার উদ্যোগ নেয়। ময়নাতদন্তে শ্বাসরোধের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার কথা জানানো হয়। একই সঙ্গে প্রতিবেদনে বলা হয়, শরীরে রাসায়নিক পোড়ার চিহ্ন পাওয়া যায়নি এবং ধর্ষণের পক্ষে ফরেনসিক প্রমাণ মেলেনি।

পরে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, দুই সন্দেহভাজনের মাদক পরীক্ষার ফল নেতিবাচক আসে। অর্থাৎ পরীক্ষায় তাঁদের শরীরে মাদক গ্রহণের প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে জানানো হয়।

প্রদত্ত প্রতিবেদনে ২৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মামলাটির উদ্দেশ্য ও ঘটনার পূর্ণ বিবরণ নিশ্চিত হয়নি বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তদন্তকারীরা তখনও সন্দেহভাজনদের বক্তব্য ও ফরেনসিক তথ্য পর্যালোচনা করছিলেন বলে জানানো হয়।

এই তথ্যগুলো থেকে হত্যাকাণ্ডটি সাম্প্রদায়িক উদ্দেশ্যে সংঘটিত হয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। প্রমাণ ছাড়া কোনো হত্যাকাণ্ডকে সাম্প্রদায়িক বলে ঘোষণা করাও দায়িত্বশীল তদন্তের পরিপন্থী।

কিন্তু একই সঙ্গে এটিও সত্য যে, পুলিশের প্রাথমিক ব্যাখ্যা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে সেগুলোর স্বচ্ছ ও প্রমাণভিত্তিক জবাব দেওয়া জরুরি। চারটি প্রাণহানির ঘটনায় প্রকৃত উদ্দেশ্য, অপরাধের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের পরিচয় এবং ঘটনার পেছনের কারণ নির্ভরযোগ্যভাবে প্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত জনমনে উদ্বেগ থেকেই যাবে।

বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ এ ঘটনায় বিচার বিভাগীয় তদন্তের দাবি জানিয়েছে। সংগঠনটির নেতারা পুলিশের বক্তব্যের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন এবং ঘটনাটি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে ভয় তৈরি করেছে বলে দাবি করেছেন। ঢাকায় এক প্রতিবাদ কর্মসূচিতে সংখ্যালঘু নেতারা সংসদে এ বিষয়ে বক্তব্য এবং স্বাধীন তদন্তের আহ্বান জানান।

সরকারের করণীয় তাই স্পষ্ট: ঘটনার প্রকৃত তথ্য উদঘাটন, ফরেনসিক পরীক্ষার ফল যথাযথভাবে প্রকাশ, পুলিশের তদন্ত-অনুমানের পক্ষে থাকা প্রমাণ ব্যাখ্যা এবং দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ।

ন্যায়বিচারের স্বার্থে তদন্ত হতে হবে নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও প্রমাণনির্ভর। কোনো রাজনৈতিক বা সাম্প্রদায়িক পূর্বধারণা যেন তদন্তকে প্রভাবিত না করে, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।

তারেক রহমানের প্রতিশ্রুতির বাস্তব পরীক্ষা

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রকাশ্যে একটি বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার করেছেন।

১৬ জুলাই জাতিগত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকে তিনি বলেন, “আমার সরকার এবং আমি একটি বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়তে কাজ করছি।”

তিনি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়গুলোকে বাংলাদেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে উল্লেখ করেন এবং সব সম্প্রদায়ের মানুষের সমান অধিকার ও সুযোগ নিশ্চিত করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।

এর আগে তিনি আরও বলেছিলেন, তাঁর নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার উগ্রবাদ ও জঙ্গিবাদ সহ্য করবে না এবং ন্যায়বিচার ও সমতার ভিত্তিতে এমন একটি বাংলাদেশ গড়তে চায়, যেখানে কেউ বৈষম্যের শিকার হবে না।

এসব বক্তব্যকে শুধু রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি হিসেবে দেখলে চলবে না। সরকারের কার্যক্রম মূল্যায়নের জন্য এগুলোই হওয়া উচিত সুস্পষ্ট মানদণ্ড।

একটি বৈষম্যহীন বাংলাদেশ নিশ্চিত করতে হলে সংখ্যালঘুদের কেবল আশ্বাস দিলেই হবে না। তাদের বাড়িতে হামলা হলে নিরাপত্তা, উপাসনালয় ভাঙচুর হলে দ্রুত বিচার, সম্পত্তি দখলের অভিযোগ উঠলে কার্যকর প্রতিকার এবং পরিবারের সদস্যরা হত্যার শিকার হলে নিরপেক্ষ তদন্ত ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে।

সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা কোনো বিশেষ সুবিধা নয়; এটি নাগরিক হিসেবে তাঁদের মৌলিক অধিকার। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো ধর্ম, জাতিগত পরিচয় কিংবা রাজনৈতিক অবস্থান নির্বিশেষে প্রতিটি নাগরিকের জীবন, সম্পদ ও মর্যাদা রক্ষা করা।

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রশ্ন হওয়া উচিত পরিসংখ্যানের বাইরে

বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তার প্রশ্নটি কোনো একটি হত্যাকাণ্ড কিংবা কয়েকটি বিচ্ছিন্ন ঘটনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি রাষ্ট্রের আইন প্রয়োগ, নাগরিক অধিকার রক্ষা, বিচারব্যবস্থার কার্যকারিতা এবং সরকারের জবাবদিহির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।

আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ, বাণিজ্য, কূটনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতা এবং গণতান্ত্রিক পরিচয়কে শক্তিশালী করতে আগ্রহী কোনো দেশের জন্য সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষার প্রতিশ্রুতি ও তাঁদের বাস্তব অভিজ্ঞতার মধ্যে বড় ব্যবধান থাকা উদ্বেগজনক।

তবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ভূমিকা হওয়া উচিত অনুমাননির্ভর সিদ্ধান্তে পৌঁছানো নয়; বরং তথ্য, প্রমাণ ও স্বচ্ছ জবাবদিহির ভিত্তিতে পরিস্থিতি পর্যালোচনা করা।

বাংলাদেশ সরকারের কাছে কয়েকটি মৌলিক প্রশ্নের উত্তর চাওয়া যেতে পারে—

  • ২০২৬ সালে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার কতটি অভিযোগ নথিভুক্ত হয়েছে?

  • এসব ঘটনার কতটির তদন্ত সম্পন্ন হয়েছে এবং কতটি মামলায় অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়েছে?

  • কতটি মামলা বিচারাধীন এবং কতটি মামলায় দোষী সাব্যস্ত করার রায় এসেছে?

  • জমি ও সম্পত্তি জবরদখলের অভিযোগে কতটি ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীরা তাঁদের সম্পত্তি ফিরে পেয়েছেন?

  • ধর্মীয় উপাসনালয়ে হামলার ঘটনায় কতজন অভিযুক্তের বিরুদ্ধে কার্যকর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে?

  • সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ নিরাপত্তাহীনতার অভিযোগ জানালে তাঁদের সুরক্ষায় কী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে?

এসব প্রশ্নের উত্তর নিয়মিত ও নির্ভরযোগ্যভাবে প্রকাশ করা হলে পরিস্থিতি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া সম্ভব হবে। একই সঙ্গে সরকারের অগ্রগতি এবং ব্যর্থতা—দুটিই পরিমাপ করা যাবে।

প্রতিশ্রুতি নয়, কার্যকর পদক্ষেপই আস্থা ফিরিয়ে আনবে

বাংলাদেশের ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব কোনো একটি রাজনৈতিক দলের প্রতি আনুগত্যের ওপর নির্ভর করতে পারে না। এটি রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব এবং নাগরিকদের সমান অধিকার রক্ষার অপরিহার্য শর্ত।

সংখ্যালঘু অধিকার সংগঠনগুলোর প্রতিবেদন, সরকারি পরিসংখ্যান এবং পুলিশের তদন্তের মধ্যে যেখানে অমিল রয়েছে, সেখানে প্রয়োজন স্বাধীন যাচাই, স্বচ্ছ তদন্ত এবং নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রকাশ। অভিযোগকে অবহেলা করা যেমন অনুচিত, তেমনি প্রমাণ ছাড়া কোনো ব্যক্তি বা সম্প্রদায়কে দোষী সাব্যস্ত করাও গ্রহণযোগ্য নয়।

রংপুরের চার সদস্যের পরিবারের হত্যাকাণ্ডসহ প্রতিটি গুরুতর অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করা, ভুক্তভোগীদের পরিবারকে সহায়তা দেওয়া, দায়ীদের আইনের আওতায় আনা এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া সরকারের অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকারের সামনে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হলো—বৈষম্যহীন বাংলাদেশের প্রতিশ্রুতিকে বাস্তব নিরাপত্তা, সমান অধিকার ও দৃশ্যমান ন্যায়বিচারে রূপান্তর করা। কারণ একটি রাষ্ট্র কতটা গণতান্ত্রিক ও ন্যায়ভিত্তিক, তা শুধু তার ঘোষণায় নয়; সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা নাগরিকদের সঙ্গে তার আচরণেই সবচেয়ে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়।

More from the timeline

View all