বাংলাদেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতি আজ এক অন্ধকার মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছে। সাম্প্রতিক ঘটনাবলি স্পষ্ট করে দিচ্ছে—অপহরণ আর বিচ্ছিন্ন কোনো অপরাধ নয়, এটি এখন একটি সংগঠিত, দেশব্যাপী লাভজনক ব্যবসায় রূপ নিয়েছে। বগুড়ায় এক উপসহকারী প্রকৌশলীকে দু’বার মুক্তিপণ দিতে বাধ্য করা থেকে শুরু করে ৮০ লাখ টাকা মুক্তিপণ না দেওয়ায় কেমব্রিয়ান কলেজের ছাত্র সুদীপ্ত রায়কে নির্মমভাবে হত্যা—এই ঘটনাগুলো সাধারণ নাগরিকদের জন্য এক দুঃস্বপ্নের বাস্তবতা তুলে ধরছে।
অপরাধের ভয়াবহ ঊর্ধ্বগতি: পরিসংখ্যান যা আতঙ্ক ছড়ায়
পরিসংখ্যানই সবচেয়ে বড় সাক্ষ্য।
২০২১ সালে দেশে অপহরণের মামলা ছিল ৪৪৫টি।
২০২৫ সালে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১,০০৫টিতে—মাত্র চার বছরে দ্বিগুণেরও বেশি।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য বলছে, রাজনৈতিক রূপান্তরের সময়েই এই অপরাধ সবচেয়ে দ্রুত বেড়েছে। ২০২৫ সালের জুলাই মাসে, ড. মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের সময়, এক মাসেই নথিভুক্ত হয় ১০৯টি অপহরণ মামলা। এরপরও পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হয়নি:
-
অক্টোবর ২০২৫: ১১০টি মামলা
-
নভেম্বর ২০২৫: ৯৩টি মামলা
-
ডিসেম্বর ২০২৫: ৮৭টি মামলা
এই ধারাবাহিকতা প্রমাণ করে—এটি কোনো সাময়িক সমস্যা নয়, এটি একটি গভীর কাঠামোগত ব্যর্থতা।
নিরাপত্তাহীনতার হটস্পট: ঢাকা, চট্টগ্রাম ও টেকনাফ
অপরাধের ভৌগোলিক বিস্তার আরও উদ্বেগজনক। কক্সবাজারের টেকনাফ ও উখিয়ার পাহাড়ি অঞ্চল, বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে, অপহরণকারীদের নিরাপদ আশ্রয়ে পরিণত হয়েছে। কিন্তু সংকট শুধু সীমান্তবর্তী বা প্রত্যন্ত এলাকায় সীমাবদ্ধ নয়।
দেশের অর্থনৈতিক কেন্দ্রগুলোই এখন সবচেয়ে অনিরাপদ:
-
ঢাকা বিভাগ ও মহানগর: ৪০৩টি মামলা
-
চট্টগ্রাম বিভাগ: ২০৩টি মামলা
দেশের বাণিজ্যিক প্রাণকেন্দ্রেই যদি নাগরিকেরা নিরাপদ না থাকেন, তবে তা আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার প্রায় সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ারই ইঙ্গিত দেয়।
জনম্যান্ডেটহীন সরকার, জবাবদিহিহীন শাসন
সমালোচকদের মতে, বর্তমান প্রশাসনের কোনো নির্বাচনী বৈধতা না থাকাই এই অব্যবস্থার মূল কারণ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক বলেন, অপহরণের শিকার পরিবারের অভিযোগ প্রায়ই প্রশাসনের কর্ণকুহরে মিলিয়ে যায়।
অনেক ক্ষেত্রে পুলিশ এসব ঘটনাকে ‘আর্থিক বিরোধ’ হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা করে। কিন্তু মামলার বিপুল সংখ্যা স্পষ্ট করে দেয়—এটি বিচ্ছিন্ন ব্যক্তিগত বিরোধ নয়, বরং আইনের শাসনের অনুপস্থিতির ফল।
যে সরকার ভোটারদের কাছে দায়বদ্ধ নয়, সেই সরকারের কাছে নাগরিক নিরাপত্তা স্বাভাবিকভাবেই গৌণ হয়ে পড়ে।
আইনের শূন্যতায় মানবিক বিপর্যয়
প্রতিটি সংখ্যার আড়ালে আছে ভেঙে পড়া পরিবার, অসহায় বাবা-মা, শোকাহত স্বজন। ২০২৫ সাল থেকে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে—অপহরণ আর ব্যক্তিগত শত্রুতার ফল নয়; এটি এখন পরিকল্পিত অর্থ আদায়, ভূমি দখল ও চাঁদাবাজির হাতিয়ার।
অন্তর্বর্তী সরকারের সমালোচকরা মনে করেন, বিদেশি সমর্থন ও অগণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার দিকেই মনোযোগ থাকায় উগ্র গোষ্ঠী ও অপরাধী সিন্ডিকেটগুলো কার্যত উন্মুক্ত মাঠ পেয়ে গেছে।
জুলাইয়ে যে ‘পরিবর্তন’-এর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, অপহৃতদের পরিবারগুলোর কাছে তার মানে দাঁড়িয়েছে—ভয়, চাঁদাবাজি, অনিশ্চয়তা এবং প্রিয়জন হারানোর যন্ত্রণা।
শেষ প্রশ্ন
অপরাধের এই লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি যখন থামছেই না, তখন প্রশ্ন একটাই—
আর কতদিন বাংলাদেশের নাগরিকরা এই আতঙ্কের পরিবেশে বেঁচে থাকতে বাধ্য হবে?